সরল ফল কাকে বলে

সরল ফল কাকে বলে

একটি ফুলের এক বা একাধিক যুক্তগর্ভপত্রী ( syncarpous ) ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন ফলকে  সরল বা একক ফল ( Simple fruit ) বলে । 

সরল ফলের প্রকারভেদ 

ফলত্বকের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে সরল ফলকে প্রধান দু’ভাগে ভাগ করা যায়— 

নীরস ফল ( Dry fruit ) : নীরস ফলের ফলত্বক শুষ্ক , ঝিল্লিময় এবং চামড়ার মতো বা কাষ্ঠল হয় । এইরুপ ফলের বিদারণের ( Dehiscence ) পদ্ধতি অনুসারে তাদের আবার তিনটি উপবিভাগে ভাগ করা যায় – 1. অবিদারী , 2. বিদারী এবং 3. ভেদক । 

1. অবিদারী ফল ( Indehiscent fruit ) : এই প্রকারের ফলের ফলত্বক কখনোই বিদীর্ণ হয় না এবং এতে কেবলমাত্র একটি বীজ থাকে । অবিদারী ফল আবার চার প্রকারের হয় , যেমন – 

( i ) অ্যাকিন ( Achene ) — ফলটি একটি বীজ সমন্বিত ছোটো দানার আকৃতি বিশিষ্ট হয় । এইরূপ ফল একগর্ভপত্রী , অধিগৰ্ভ ও একপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এই ফলে ফলত্বক ও বীজত্বক পরস্পর থেকে পৃথক থাকে । উদাহরণ – কালোজিরা , ছাগলবটি , সন্ধ্যামণি ইত্যাদি । 

( ii ) ক্যারিওসিস ( Caryopsis ) — এই ফল অ্যাকিনের অনুরূপ , তবে এইক্ষেত্রে ফলত্বকও বীজত্বক সম্পূর্ণরূপে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে । উদাহরণ – ধান , গম , ভুট্টা ইত্যাদি । 

( iii ) সিপসেলা ( Cypsella ) – এই ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( দুটি গর্ভপত্র ) , অধোগর্ভ ও একপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এইক্ষেত্রে ফলত্বক বীজত্বকের সঙ্গে যুক্ত থাকে না । উদাহরণ – সূর্যমুখী ও গাঁদা ।

( iv ) নাট ( Nut ) – ফলটি যুক্তগর্ভপত্রী ( একাধিক গর্ভপত্র ) ও অধিগর্ভ ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এইরূপ ফলে সাধারণত একটি বীজ থাকে এবং এর ফলত্বক চামড়ার মতো কাষ্ঠল হয় । উদাহরণ – ওক , কাজুবাদাম , লিচু ইদ্যাদি । 

2. বিদারী ফল ( Dehiscent fruit ) : এই জাতীয় ফল পরিণত হলে তার ফলত্বক বিদীর্ণ হয় এবং বীজগুলি আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে । এর প্রকারভেদ নিম্নরূপ-

( i ) লেগিউম বা পড ( Legume or pod ) — এটি একগর্ভপত্রী , অধিগর্ভ ও একপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । ডিম্বাশয়ের মধ্যে কয়েকটি ডিম্বক সারিবদ্ধভাবে প্রান্তীয় অমরাবিন্যাসে বিন্যস্ত থাকে । এইরুপ ফলে পৃষ্ঠীয় সন্ধি ও অঙ্কীয় সন্ধি থাকে এবং ফল পরিণত হলে তার উভয় সন্ধি বরাবর ফলত্বকের বিদারণ ঘটে । উদাহরণ — মটর , শিম , বক ইত্যাদি ।

( ii ) ফলিকল ( Follicle ) — এই প্রকারের ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( দুটি গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ ও একপ্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । ফল পরিণত হলে তা কেবলমাত্র অঙ্কীয় সন্ধি বরাবর বিদীর্ণ হয় । উদাহরণ — আকন্দ ।

( iii ) সিলিকুয়া ( Siliqua ) — এই ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( দুইটি গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ ও দুই প্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে সৃষ্টি হয় । ডিম্বাশয়টি প্রথমে একপ্রকোষ্ঠ যুক্ত থাকে এবং পরে অপ্রকৃত প্রাচীর বা রেপলাম ( Replum ) দিয়ে দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত হয় । পরিণত ফল নীচের দিক থেকে উপরদিকে লম্বালম্বিভাবে বিদারিত হয়ে দুটি ভাগে বিভক্ত হয় এবং বীজগুলি রেপলামের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে । উদাহরণ — মুলো , সরিষা ইত্যাদি । 

( iv ) ক্যাপসুল ( Capsule ) — এই প্রকারের ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( একাধিক গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ ও একাধিক প্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । পরিণত ফলের ফলত্বক গর্ভপত্রের সংযোগস্থানে বরাবর বহু অংশে বিদীর্ণ হয় । উদাহরণ — ঢ্যাঁড়শ , ধুতরো ইত্যাদি । 

3. ভেদক ফল ( Scizocarpic fruit ) : পরিণত অবস্থায় এইরূপ ফলের ফলত্বক বহু খণ্ডাংশে বিদীর্ণ হয় এবং প্রতিটি খন্ডাংশে একটি করে বীজ থাকে । এদের প্রকারভেদ নিম্নরূপ –

( i ) লোমেনটাম ( Lomentum ) – এই ফল একগর্ভপত্রী ও অধিগর্ভ ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । পরিণত ফলের ফলত্বক অনুপ্রস্থে কয়েকটি খণ্ডে বিদীর্ণ হয় এবং এক একটি বিদীর্ণ অংশ ফল থেকে আলাদা আলাদা ভাবে খসে পড়ে । এইরুপ প্রতিটি খণ্ডে একটি করে বীজ থাকে । উদাহরণ — বাবলা , লজ্জাবতী ইত্যাদি ।

( ii ) ক্রিমোকার্প ( Cremocarp ) — এই ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( দুটি গর্ভপত্র ) . অধোগর্ভ ও দ্বিপ্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এর প্রতিটি প্রকোষ্ঠে একটি বীজ থাকে । পরিণত ফল উপর থেকে নীচের দিকে লম্বালম্বিভাবে বিদীর্ণ হয়ে দুটি খণ্ডে পৃথক হয় । এই খণ্ড দুটিকে মেরিকার্প ( Mericarp ) বলে । এটি একটি দ্বিবাহুযুক্ত অক্ষের দু – পার্শ্বে যুক্ত থাকে । একে কার্পোফোর ( Carpophore ) বলে । প্রকৃতপক্ষে কার্পোফোর হল পুষ্পাক্ষের বর্ধিত দ্বিখণ্ডিত অংশ । উদাহরণ — ধনে , মৌরি ইত্যাদি । 

( iii ) কারসেরিউল ( Carcerule ) – এই ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( দুটি গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ ও চারিটি প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । পরিণত ফলের ফলত্বক চারটি খণ্ডে বিদীর্ণ হয় এবং এদের প্রতিটি খণ্ডে একটি করে বীজ থাকে । উদাহরণ — তুলসী , রক্তদ্রোন ইত্যাদি । 

( iv ) রেগমা ( Regma ) — এই ফল যুক্তগর্ভপত্রী ( তিনটি বা পাঁচটি গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ ও তিনটি বা পাঁচটি প্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । পরিণত ফল ডিম্বাশয়ের প্রকোষ্ঠ সংখ্যার সমান সংখ্যক খণ্ডে বিদীর্ণ হয় এবং প্রতিটিতে একটি করে বীজ থাকে । উদাহরণ রেড়ি , জিরানিয়াম ( Geranium ) ইত্যাদি । 

( v ) সামারা ( Samara ) — এটি যুক্তগর্ভপত্রী ( একাধিক গর্ভপত্র ) , অধিগর্ভ এবং একাধিক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এর ফলত্বক প্রসারিত হয়ে পক্ষের আকার ধারণ করে । উদাহরণ— মাধবীলতা , খাম আলু ইত্যাদি । 

( vi ) সামারয়েড ( Samaroid ) — এটি সামারা জাতীয় ফল । তবে এই ক্ষেত্রে ফলের পক্ষগুলি ফলত্বক থেকে গঠিত না হয়ে স্থায়ী বতি থেকে উৎপন্ন হয় । উদাহরণ – শাল ।

B. সরস ফল ( Fleshy fruit ) : এই জাতীয় ফলের ফলত্বক পুরু ও রসাল হয় এবং পরিণত অবস্থাতেও এদের ফলত্বক বিদীর্ণ হয় না । ফলের প্রকারভেদ নিম্নরূপ – 

1. ড্রুপ ( Drupe ) – এই ফল একগর্ভপত্রী , অধিগৰ্ভ ও সাধারণত একপ্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে সৃষ্ট হয় । সাধারণত এই ফল একবীজ যুক্ত হয় এবং এর ফলত্বকটি তিনটি অংশে বিভক্ত থাকে । এর অন্তফলত্বক কঠিন ও কাষ্ঠল হয় । উদাহরণ — আম । কোনো কোনো ড্রপের মধ্যফলত্বক তন্তুময় হয় । একে তন্তুময় ড্রুপ বলে । উদাহরণ — সুপারি ( তত্তুময় অংশ নীরস ) । আবার কোনো কোনো ট্রুপ তিন প্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে সৃষ্ট হয় এবং এর প্রতি প্রকোষ্ঠে একটি করে বীজ থাকে । উদাহরণ — তাল । 

2. পোম ( Pome ) — এই ফলে যুক্তগর্ভপত্রী ( একাধিক গর্ভপত্রবিশিষ্ট ) , অধোগর্ভ ও একাধিক প্রকোষ্ঠযুক্ত ডিম্বাশয় থেকে সৃষ্ট হয় । সমগ্র ফলটি রসাল পুষ্পাক্ষ দিয়ে ঢাকা থাকে । রসাল পুষ্পাক্ষ এবং বহিঃফলত্বক দিয়ে এর ভোজ্য অংশ গঠিত হয় । এই ফলের মধ্যফলত্বকটি কাগজের মতো পাতলা হয় । উদাহরণ— আপেল , নাশপাতি ইত্যাদি । 

3. বেরি ( Berry ) — এই ফল একগর্ভপত্রী বা যুক্তগর্ভপত্রী ( একাধিক গর্ভপত্রবিশিষ্ট ) অধিগর্ভ বা অধোগর্ভ ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এইরুপ ফল সাধারণত বহুবীজ যুক্ত ও রসাল হয় । পরিণত ফলে বীজগুলি অর্মরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্যফলত্বক ও অন্তফলত্বক দিয়ে গঠিত শাঁসে ছড়ানো থাকে । এইরুপ ফলের বহিঃফলত্বক একটি পাতলা আবরণীব সৃষ্টি করে । উদাহরণ— টম্যাটো , পেয়ারা , বেগুন ইত্যাদি ।

4. পেপো ( Pepo ) — এই ফল বেরির মতো যুক্তগর্ভপত্রী ( কয়েকটি গর্ভপত্র বিশিষ্ট ) ও অধোগর্ভ ডিম্বাশয় থেকে গঠিত হয় । পরিণত ফলের বহিঃফলত্বক সামান্য স্থূল হয় , তবে বীজ সমূহ অমরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না । উদাহরণ —– কুমড়া , শশা ইত্যাদি । 

5. হেসপেরিডিয়াম ( Hesperidium ) — ফলটি যুক্তগর্ভপত্রী ( বহু গর্ভপত্র বিশিষ্ট ) , অধিগর্ভ ও অক্ষীয় অমরাবিন্যাস যুক্ত এবং বহু প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে উৎপন্ন হয় । এইরুপ ফলের বহিঃফলত্বক এবং মধ্যফলত্বক যুক্ত হয়ে একটি চামড়ার আবরণ গঠন করে । অন্তঃফলত্বক থেকে নির্গত এককোশী রসাল রোম হল এই প্রকার ফলের ভোজ্য অংশ । উদাহরণ — লেবু , কমলালেবু ইত্যাদি । 

6. অ্যাম্ফিসারকা ( Amphisarca ) — ফলটি যুক্তগর্ভপত্রী , অধিগর্ভ ও বহু প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে গঠিত হয় । এইরূপ ফলের বহিঃফলত্বক কাষ্ঠল হয় এবং অন্তঃফলত্বক ও অমরার কিছু অংশ দিয়ে ফলের ভোজ্য অংশ গঠিত হয় । উদাহরণ — বেল , কয়েতবেল । 

7. বালাউস্টা ( Balausta ) — ফলটি যুক্তগর্ভপত্রী , অধিগর্ভ ও বহু প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট ডিম্বাশয় থেকে গঠিত হয় । ফলের বহিঃফলত্বক চামড়ার মতো দৃঢ় হয় । পুরু মধ্যফলত্বকটি বহিঃফলত্বকের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং অন্তঃফলত্বকটি পাতলা কাগজের মতো হয় । বীজের রসাল বীজত্বক অংশই হল এই ফলের ভোজ্য অংশ । উদাহরণ – বেদানা ও ডালিম ।

আরো পড়ুন : প্রকৃত ফল কাকে বলে

একটি আদর্শ ফলের গঠন

পার্থেনোকার্পিক ফল কাকে বলে

ফল কাকে বলে

error: Content is protected !!