প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান

প্রাচীন ভারতে নারীর সামাজিক অবস্থান

বৈদিক যুগে নারীদের স্থান 

ঋগবৈদিক যুগের সমাজ ব্যবস্থায় নারীগণ যথেষ্ট মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন । পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুত্রের জন্মকামনাই স্বাভাবিক ঘটনা হলেও কন্যা সন্তান অবহেলিত হত না । স্ত্রী শিক্ষার সুযোগ ছিল ব্যাপক । বৈদিক যুগের নারী ঘোষা , অপালা , বিশ্ববারা প্রমুখ ছিলেন উচ্চশিক্ষিতা । 

সমাজে বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল না । সাধারণভাবে পিতা মাতা কর্তৃক বিবাহ স্থির হলেও স্বনির্বাচনকেও মূল্য দেওয়া হত । বহুবিবাহের প্রচলন তেমন ছিল না । স্বামীর মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই এর সাথে বিধবা স্ত্রীর পুনর্বিবাহের রেওয়াজ ছিল । সতীদাহ প্রথা মূলত অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । মেয়েরা বহির্জগতে পুরুষের উপর নির্ভরশীল থাকলেও গৃহের অভ্যন্তরে তাদের স্থান পুরুষের তুলনায় কোন অংশে হীন ছিল না । স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন । পর্দা প্রথা প্রায় ছিল না । 

পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পেয়েছিল । পূর্বে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডে স্ত্রী জাতির অংশগ্রহণের অধিকার ছিল । কিন্তু এই যুগে উভয় ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে । অবশ্য শিক্ষা গ্রহণের অধিকার অব্যাহত ছিল । 

মহাকাব্যে নারীর স্থান 

রামায়ণ ও মহাভারত — এই মহাকাব্য দুটিতে চিত্রিত নারী চরিত্রগুলি থেকে অনুমিত হয় যে , তেজস্বিতা , চারিত্রিক দৃঢ়তা , নম্রতা , সত্যবাদিতা , পাতিব্ৰত্য ইত্যাদি গুণ নারীদের সহজাত ছিল অথবা এগুলির বিপরীতধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নারীগণ নিন্দিত হতেন । 

বৌদ্ধ ধর্মে নারীর স্থান 

খ্রীষ্টপূর্বকালে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির গুরুত্ব যথার্থ উপলব্ধি করেন গৌতম বুদ্ধ । বিবাহিতা বা অবিবাহিতা নারীদের প্রতি সামান্যতম অত্যাচারকে তিনি পাপাচারের সমতুল্য বলে ঘোষণা করেন । বৃজি প্রজাতন্ত্রের জন্য রচিত নিয়মাবলীর পঞ্চম ধারায় তিনি নারীদের মর্যাদা রক্ষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত করেন । বুদ্ধদেব বৌদ্ধ সংঘে নারীদের প্রবেশাধিকার দান করেছিলেন । তবে তাদের জন্য স্বতন্ত্র সংঘ স্থাপন ছিল বাধ্যতামূলক । সংঘের নারীদের জন্য বুদ্ধদের কতকগুলি আচরণবিধিও স্থির করে দেন । বারবণিতা আম্রপালিকেও তিনি সম্মানের আসন দেন । বৌদ্ধ ধর্মে এইভাবে সমগ্র নারী সমাজকেই সম্মানের আসন দান করা হয়েছিল ।

আরো পড়ুন : গৌতম বুদ্ধের জীবনী ও বাণী

গৌতম বুদ্ধের ধর্মমত

মৌর্য যুগে নারীর অবস্থান

মৌর্য ও মৌর্যোত্তর যুগে নারীর অবস্থা সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের গ্রীক রচনা , অর্থশাস্ত্র , অশোকের লেখ , স্মৃতি শাস্ত্র ইত্যাদির উপর নির্ভর করতে হয় । মেগাস্থেনিস চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নারী রক্ষা বাহিনীর কথা বলেছেন । অর্থশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী নারীরা গুপ্তচর বৃত্তিতে নিয়োজিত হতেন । এ থেকে মনে হয় যে , সামরিক বা রাজনৈতিক কাজে নারীগণ অংশ নিতেন । মেগাস্থেনিসের বর্ণনা অনুযায়ী বিবাহ নিজ জাতির মধ্যেই সম্পন্ন হত । বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল । অভিজাত পরিবারে পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল , শিক্ষার প্রচলনও ছিল । 

অশোকের একটি লেখায় উল্লিখিত রানী কারুবাকীর ধর্মীয় দানের বর্ণনা থেকে বা সংঘমিত্রা কর্তৃক ধর্মপ্রচারে অংশগ্রহণ করা থেকে বোঝা যায় যে নারীগণ ধর্মকার্যেও বিশিষ্ট ভূমিকা নিতে পারতেন । তবে স্মৃতিশাস্ত্রগুলি অনুসরণ করে নারীদের উপর নানা বিধি নিষেধও চাপানো হয়েছিল ।

গুপ্ত যুগে নারীর অবস্থান

গুপ্তযুগেও উচ্চবংশীয়া নারীরা রাজনৈতিক কাজকর্মে অংশ নিতেন । দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতী গুপ্তা ছিলেন এর উদাহরণ । উচ্চশ্রেণীর নারীদের শিক্ষালাভের যথেষ্ট অবকাশ ছিল । বাৎস্যায়ন আদর্শ পত্নীর যে চিত্র এঁকেছেন সেই অনুযায়ী তাকে সুশিক্ষিতা হতে হত , আয়ব্যয়ের হিসেব রাখতে হত । 

গুপ্তযুগে নারীর বিবাহের বয়স সম্পর্কে বলা যায় যে , এই সময় প্রাপ্তবয়স্কা হলে যেমন তার বিবাহ দেওয়া হত , অপ্রাপ্ত বয়স্কাদেরও বিবাহের দৃষ্টান্ত রয়েছে । বিবাহিতা বা অবিবাহিতা নারীর সতীত্বকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত । নারদ ও পরাশর স্মৃতিতে বিধবাদের পুনরায় বিবাহের অধিকার দেওয়া হয়েছে । অবশ্য মনু বা যাজ্ঞবল্ক্য এই অধিকার স্বীকার করেননি । পুরুষের বহু বিবাহ প্রচলিত ছিল ।

নারী শিক্ষার ব্যবস্থা 

প্রাচীন ভারতের বহু মহিলা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতা হতেন । দুই শ্রেণীর অধ্যয়নরতা নারীর কথা জানা যায় । যথা ব্রহ্মবাদিনীসদ্যোদবাহ । প্রথম শ্রেণীভুক্ত নারীগণ আজীবন বেদ অধ্যয়ন করতেন । দ্বিতীয় শ্রেণী বেদ চর্চা করতেন বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত । বেদের বিভিন্ন শাখায় অধ্যয়নরতা নারীদের উল্লেখ করেছেন পাণিনি । কাত্যায়ন অধ্যাপিকা বোঝাতে ‘ উপাধ্যায়া ’ বা ‘ উপধ্যায়ী ‘ কথাটি ব্যবহার করেছেন । 

জৈন গ্রন্থ অনুযায়ী কৌশাম্বীর রাজকন্যা জয়ন্তী আজীবন অবিবাহিতা থেকে দর্শন চর্চায় রত ছিলেন । গুপ্তযুগে রচিত অমরকোষে আচার্যার উল্লেখ আছে — যাঁরা বেদ মন্ত্র শিক্ষা দিতেন । তামিল ভাষায় একজন মহিলা কবি চোল রাজাদের যুদ্ধ জয়কে অবলম্বন করে উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনা করেছিলেন । মহিলাদের রচিত সংস্কৃত কাব্য ও নাটকের কিছু কিছু অংশও পাওয়া গেছে ।

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার 

অধিকাংশ শাস্ত্রে নারীর সম্পত্তি বা স্ত্রী ধনের উল্লেখ পাওয়া যায় । মূলত অলঙ্কারই স্ত্রীধন হিসেবে গণ্য হত । অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী ২০০০ পণ পর্যন্ত বিবাহিতা রমণী নিজের অধিকারে রাখতে পারত । স্বামী জরুরী প্রয়োজনে স্ত্রীর এই সম্পত্তি গ্রহণ করতে পারত বা সম্পত্তির যথেচ্ছ দানকার্যে স্ত্রীকে বাধা দিতে পারত । কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যু হলে তার স্ত্রীধনের অধিকারী হত তার কন্যারা । তবে পৈত্রিক বা পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার স্বীকৃত ছিল না ।

মূল্যায়ন 

প্রাচীন ভারতের পুরুষ শাসিত সমাজে স্বভাবতই নারীর স্বাধীনতা ছিল নামে মাত্র । মনু বলেছেন , একজন নারী শৈশবে পিতার , যৌবনে স্বামীর ও বার্ধক্যে পুত্রের অধীন থাকবে । অবশ্য মনু স্মৃতিতে একথাও হয়েছে যে পিতা , ভ্রাতা ও স্বামীর উচিত নারীজাতির সম্মান রক্ষা করা । যেখানে নারীর সম্মান রক্ষিত হয় , সেখানে দেবতারাও প্রীত হন । নারীকে অসম্মান করা হলে , সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যর্থ হয়ে যায় । কিন্তু এইসব বিধান সত্ত্বেও নারীর সামাজিক মর্যাদা মোটেই উচ্চপর্যায়ের ছিল না । কারণ বিভিন্ন স্মৃতিতেই বলা হয়েছে যে , নারী লোভ দমনে অক্ষম , কোন গোপন কথা তাকে বলা চলে না । 

মনুস্মৃতি অনুযায়ী ইন্দ্রিয়াসক্ত , মাতাল বা রুগ্ন স্বামীকেও স্ত্রী অসম্মান করতে পারবে না । যদি সে তা করে তবে তাকে তিন মাসের জন্য পরিত্যাগ করা যাবে । তাছাড়া বন্ধ্যা স্ত্রীকে অষ্টম বর্ষে , মৃত বৎসা স্ত্রীকে দশম বর্ষে ও কেবলমাত্র কন্যাজন্মদায়িনী স্ত্রীকে একাদশ বর্ষে ত্যাগ করা বিধিসম্মত ছিল । স্বামী গৃহ ত্যাগিনীকে বন্দী করা বা শারীরিক নির্যাতনের নিয়মও ছিল । এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরেও নারী জ্বলন্ত চিতায় প্রাণ বিসর্জন দিয়ে স্বামীর অনুগমন করবে— সমাজ এরূপই আশা করত । শিক্ষার ক্ষেত্রেও ক্রমেই তার অধিকারকে সঙ্কুচিত করা হয়েছিল । 

এককালে যে নারী বৈদিক স্তোত্র রচনা করেছিল , পরবর্তীকালে তার বেদ পাঠের অধিকারও হরণ করে পুরুষ তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত নিদর্শন স্থাপন করেছিল ।

আরো পড়ুন : প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের কারণ

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন

error: Content is protected !!