বৈদিক যুগে জাতিভেদ প্রথা

বৈদিক যুগে জাতিভেদ প্রথা

পৃথিবীতে প্রায় সব দেশেই বর্ণভেদ বা জাতিভেদ প্রথা কোন না কোন রূপে প্রচলিত আছে । বর্ণভেদ বা জাতিভেদ বলতে বুঝায় সামাজিক ক্ষেত্রে মেলামেশার প্রসঙ্গে কিছু স্বাতন্ত্র্য । আর্যরা যখন ভারতে প্রথম আসে তখন তারা ছিল একজাতিভুক্ত মানুষ । কালক্রমে এদেশের আদি অধিবাসীদের সাথে আর্যদের স্বাতন্ত্র্য বোঝানোর জন্য বৃত্তি বা পেশা অনুসারে সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস ঘটতে শুরু করে । ক্রমে বৃত্তির সাথে সাথে বর্ণভেদ পুরুষানুক্রমিক হয়ে দাঁড়ায় এবং তা কঠোরভাবে পালিত হয় । বৈদিক যুগে ভারতে জাতিভেদ প্রথা আদৌ ছিল কিনা , বা থাকলেও তা কিসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হত , এই সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । 

বর্ণভেদ প্রথা :

র‍্যাপসন ( Rapson ) প্রমুখের মতে , ‘ বর্ণ ‘ শব্দের অর্থ হল রঙ ( colour ) । তাই ‘ বর্ণভেদ ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘ রঙসংক্রান্ত ভেদ বা পার্থক্য । অনার্যদের গায়ের রঙ ছিল কালো । এদের তারা বলত অনার্য বা দস্যু এবং মনে করত অনার্যদের স্থান আর্যদের নিচে । আর্যরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করার জন্য নিজেদের মধ্যে আহার , বিহার ও বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে কতকগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল , যা কালক্রমে জন্ম দিয়েছিল বর্ণভেদ প্রথার । 

কিন্তু সেনার্ট প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে , বৈদিক যুগে গোষ্ঠী স্বাতন্ত্র্য থেকেই বর্ণভেদ প্রথার উদ্ভব ঘটেছে । এঁদের মতে , বৈদিক আর্যদের এক একটি গোষ্ঠী একই ধরনের আচার অনুষ্ঠান , বিবাহ বন্ধন ও খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হত । এইরূপ বংশানুক্রমিক দলবদ্ধ হওয়া থেকেই ভিন্ন ভিন্ন জাতির সৃষ্টি হয়েছে এবং কালক্রমে জন্ম দিয়েছে জাতিভেদ বা বর্ণভেদ প্রথার । 

বৈদিক যুগের প্রথমদিকে সমাজে শ্রেণীভেদ ছিল কিনা তা সঠিকভাবে জানা যায় না । বৈদিক যুগে রচিত ‘ পুরুষসুক্ত ’ গ্রন্থের একটি শ্লোকে প্রথম শ্রেণীভেদের কথা পাওয়া যায় । ঐ শ্লোকে বলা হয়েছে ‘ আদি পুরুষের মুখমণ্ডল থেকে ব্রাহ্মণ , বাহুদ্বয় থেকে রাজা , ঊরুদেশ বা জঙ্ঘা থেকে বৈশ্য এবং পদদ্বয় থেকে শূদ্রের উৎপত্তি হয়েছে । অর্থাৎ ঐ সময়ে আর্য সমাজে বাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও শূদ্র — এই চারটি শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল । কিন্তু ঐতিহাসিকেরা শ্লোকের এই বর্ণনাকে সমাজের সঠিক চিত্র বলে মনে করেন না ।

ত্রিবৃত্তি :

আর্যরা যখন ভারতে আসে , তখন তাদের মধ্যে কোনরূপ জাতিভেদ ছিল না । তবে সাধারণভাবে যোদ্ধা বা অভিজাত , পুরোহিত ও সাধারণ মানুষ — এই তিনটি সামাজিক বিন্যাস ছিল । তবে এদের মধ্যে আচার , বৃত্তি বা বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনে কোনরকম বাধা নিষেধ ছিল না । এমনকি এই বিন্যাস বংশানুক্রমিকও ছিল না । 

ঐতিহাসিক রোমিলা থাপারের  মতে , এই তিনটি শ্রেণীকে নিয়েই আর্যদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল ; তাঁর ভাষায় : These three divisions merely facilitated social and economic organisation . ” পেশা পরিবর্তনে তখন যে কোন বাধা ছিল না ; তার প্রমাণ একটি স্তোত্র থেকে প্রমাণিত হয় । ঐ স্তোত্রে বলা হয়েছে , “ আমি কবি , আমার বাবা চিকিৎসক এবং আমার মা গম ভাঙেন । 

চতুবর্ণ :

পরবর্তী কালে নানা কারণে বর্ণভেদ বা জাতিভেদ প্রথার আগমন ঘটেছিল । 

প্রথমত , অনার্যদের সংস্পর্শে আসার ফলে আর্যদের মধ্যে একটি বর্ণগত প্রতিক্রিয়া শুরু হয় । অনার্যরা কৃষ্ণবর্ণ খর্বকায় এবং হীন — এই ধারণার বশবর্তী হয়ে আর্যরা নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে সমাজে বর্ণভেদ প্রথা চালু করে । 

দ্বিতীয়ত , পেশাগত প্রয়োজনে এই সামাজিক ‘ ভেদ ’ আরও ব্যাপকতা লাভ করে । প্রথম পর্যায়ে আর্যরা বসতি স্থাপনের সাথে সাথে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজ নিজেরাই করত । কিন্তু অনার্যদের সাথে সংঘর্ষ বাড়ার ফলে একই ব্যক্তির পক্ষে দৈনন্দিন সব কাজ করা সম্ভব ছিল না । 

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় , একজন আর্যর পক্ষে সারাদিন যুদ্ধ করে আর ব্যবসা বাণিজ্য করা বা কৃষিকাজ করা সম্ভব ছিল না । এই অবস্থায় আর্য সমাজে এল শ্রম বিভাজন । এক এক ব্যক্তি এক একটি বিশেষ কাজে নিয়োজিত থাকল এবং সেই কাজে পারদর্শিতা লাভ করল । এটাই ধীরে ধীরে বংশানুক্রমিক হয়ে উঠল । 

যাঁরা বিদ্যাচর্চা বা পূজার্চনা নিয়ে থাকতেন , তাঁরা পরিচিত হলেন ‘ ব্রাহ্মণ ‘ নামে । যাঁরা যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজকার্যে নিয়োজিত হলেন , তাঁদের পরিচয় হল ‘ ক্ষত্রিয় ‘ নামে । এবং যাঁরা কৃষিকার্য , ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতি পেশা গ্রহণ করলেন , তাঁরা পরিচিত হলেন ‘ বৈশ্য ‘ নামে । এছাড়া এই তিন শ্রেণীর সেবাকার্যে যাঁরা নিযুক্ত হতেন তাঁদের পরিচয় হল ‘ শূদ্র ‘ নামে । 

প্রথম তিনটি শ্রেণীর মানুষেরা ছিলেন আর্য । কিন্তু শুদ্র বা দাস ( servant ) শ্রেণীভুক্ত হল কেবল অনার্যরা । প্রথম তিন শ্রেণীকে বলা হত ‘ দ্বিজ ‘ , অর্থাৎ দু’বার জন্ম হত । শূদ্রদের দ্বিজত্বের অধিকার ছিল না । দ্বিজ মাত্রই বেদ অধ্যয়ন বা মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারতেন , কিন্তু শূদ্ররা তা পারতেন না ।

উপবর্ণ :

কালক্রমে এই বর্ণভেদ প্রথার আরও বিবর্তন ঘটে । মনু সংহিতায়  বলা হয়েছে , আদিতে আর্য সমাজে চার বর্ণে বিভক্ত হলেও পরে বহু বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে । একথা সত্য , পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে জাতিভেদ প্রথায় অনেক কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে । কিন্তু সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপরিলিখিত চার বর্ণের সংমিশ্রণে বহু ‘ মিশ্র বর্ণের ’ উদ্ভব ঘটেছে ।

মৌর্য যুগে জাতিভেদের উদ্ভব 

বৈদিক যুগের মতই মৌর্যযুগেও সমাজ বর্ণাশ্রম প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল । আগের মতই , ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও শূদ্র — এই চারটি বর্ণ ছিল প্রধান । এছাড়া অনেক নীচ বর্ণের মানুষ ছিল । বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক ছিল । ফলে সমাজে মিশ্র বর্ণের সৃষ্টি হয়েছিল । ব্রাহ্মণরা সমাজে বিশেষ ক্ষমতা ও অধিকার ভোগ করতেন । 

গ্রীক লেখক মেগাস্থেনিস তাঁর ‘ ইণ্ডিকা ‘ গ্রন্থে ভারতের জনসমষ্টিকে সাতটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন । এই সাতটি শ্রেণী হল — দার্শনিক , কৃষক , পশুপালক , কারিগর , সেনানী পরিদর্শক ও সভাসদ । মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাগ্রে ছিলেন দার্শনিকগণ , দ্বিতীয় স্তরে ছিল কৃষকগণ । 

মেগাস্থেনিস লিখেছেন , এই শ্রেণী বৈষম্য ছিল খুবই কঠোর । বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিবাহ হত না । এক শ্রেণীর মানুষ অন্য শ্রেণীর জীবিকা গ্রহণ করতে পারত না । মেগাস্থেনিসের এই সাত শ্রেণীর সাথে ভারতের বর্ণাশ্রম প্রথা ও চার বর্ণের ধারণার কোন মিল নেই । তিনি মূলত পেশা ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগের কথা উল্লেখ করেছেন । 

মৌর্য যুগে প্রচলিত বর্ণভেদের পাশাপাশি জাতিভেদ প্রথাও উদ্ভূত হয়েছিল । এক্ষেত্রে জন্মকৌলিন্যের পরিবর্তে অর্থকৌলিন্য গুরুত্ব পেয়েছিল । ফলে বৈশ্যদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায় । শূদ্ররা আগের মতই অবহেলিত ছিল । তখন ব্রাহ্মণরা যেমন ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের জীবিকা নিতে পারতেন , শূদ্ররাও তেমনি অন্য বর্ণের জীবিকা নিতে পারত । ফলে বাণিজ্য ও কারুশিল্পে নিযুক্ত সামান্য সংখ্যক শূদ্রের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল । গণরাজ্যগুলিতে ব্রাহ্মণদের পরিবর্তে ক্ষত্রিয়দের প্রাধান্য স্বীকৃত ছিল । তবে এখানেও শূদ্ররা ছিল নির্যাতিত শ্রেণী ।

আরো পড়ুন : মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা

মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

মৌর্য পরবর্তী যুগে জাতিভেদ প্রথা 

মৌর্য পরবর্তী যুগে ভারতে প্রবেশ করে ব্যাকট্রীয় শক , পাৰ্থীয় , কুষাণ প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী । এই নবাগত জাতিগুলি ভারতে বসবাস শুরু করলে ভারতের জাতিভেদ প্রথায় সঙ্কট সৃষ্টি হয় । সমাজের রক্ষণশীল গোষ্ঠী জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথাকে রক্ষা করার জন্য উদ্যোগী হয় । প্রবর্তিত হয় কঠোর নিয়মকানুন । প্রচলিত হয় মনুর বিধান । 

কিন্তু কালক্রমে নতুন জাতিগুলির সাথে ভারতীয়দের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে । ক্রমশ নতুন জাতিগুলি ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করতে থাকে । তবে মনুর মতে এরা ছিল ব্রাত্য ক্ষত্রিয় । এই সময়েও সমাজে ব্রাহ্মণরাই সর্বাপেক্ষা সম্মানীয় ও সুবিধাভোগী ছিল । তাদের অন্য বৃত্তি গ্রহণের স্বাধীনতা থাকলেও কৃষিকাজ করা নিষিদ্ধ ছিল । মিলিন্দ প্রশ্ন অনুযায়ী কৃষি ও বাণিজ্য ছিল বৈশ্যের প্রধান জীবিকা । যথারীতি শূদ্রদের আসন ছিল সবার নিচে ।

গুপ্ত যুগে জাতিভেদ প্রথা 

সামাজিক ভেদাভেদের কঠোরতা হ্রাস করে গুপ্ত রাজারা সামাজিক সংহতি স্থাপনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন । এই সময়ে সমাজে শ্রেণীভেদ থাকলেও বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন ও এক পংক্তিতে আহারের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় । তৎকালীন স্মৃতি শাস্ত্রে অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহ স্বীকৃত ছিল । এমনকি গণিকা কন্যার সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপনের দৃষ্টান্ত দেখা যায় । গুপ্তযুগে শূদ্রদের অবস্থার উন্নতি ঘটেছিল । এককথায় , কোনরকম ধর্মীয় গোঁড়ামি গুপ্ত রাজাদের উদারতাকে হ্রাস করতে পারেনি ।

দক্ষিণ ভারতে বর্ণভেদ প্রথা 

সাতবাহন শাসনকাল থেকে দক্ষিণ ভারতে আর্য সভ্যতার প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে । ফলে দক্ষিণ ভারতেও উত্তর ভারতের মত জাতিভেদ ও বর্ণভেদের কঠোরতা বৃদ্ধি পায় । সাধারণভাবে দক্ষিণ ভারতের সমাজকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ । 

জীবিকার ভিত্তিতে ব্রাহ্মণদের আবার চারটি ভাগে ভাগ করা যায় । এগুলি হল — সামন্ত , সরকারি কর্মী , কৃষক ও শ্রমিক । উত্তর ভারতের মত দক্ষিণে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না । তবে সেখানেও প্রচুর শূদ্র ছিল ও তারাই ছিল সমাজের সব থেকে অবহেলিত শ্রেণী । 

ব্রাহ্মণ শ্রেণী প্রবল প্রতিপত্তি ও মর্যাদার অধিকারী ছিল । তারা প্রচুর জমি জায়গা ভোগ করত , যদিও রাষ্ট্রকে কোন কর দিতে বাধ্য ছিল না । প্রশাসনের উপরেও তাদের যথেষ্ট কর্তৃত্ব ছিল । সমাজে বর্ণভেদের কঠোরতা অক্ষুণ্ণ রেখে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য । উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণরা ছিল অনেক বেশি বিচক্ষণ ও কর্মোদ্যোগী । তারা অনেকেই বাণিজ্য কর্মে লিপ্ত থেকে অর্থ উপার্জন করত ।

আরো পড়ুন : সাতবাহন রাজাদের কৃতিত্ব

গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান

error: Content is protected !!