বজ্রযান ধর্ম টীকা

বজ্রযান ধর্ম টীকা

পাল রাজারা নিজেদের ‘ পরম সৌগত ‘ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন । তাঁরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের ‘ মহাযান ’ সম্প্রদায়ভুক্ত । কিন্তু পাল যুগে বাংলাদেশে যে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচলিত ছিল , তাকে বিশুদ্ধ মহাযান বলা যায় না । মহাযান মর্তবাদে নতুন দার্শনিক তত্ত্ব সন্নিবিষ্ট করে সে যুগে বৌদ্ধ ধর্মে এক স্বতন্ত্র চরিত্র লাভ করেছিল । একে বলা হয় তন্ত্রযান বা বজ্রযান । এই ধর্ম  আন্দোলনের নেতারা সিদ্ধাচার্য নামে অভিহিত হতেন ।

তান্ত্রিক ধর্ম 

বজ্রযান ছিল রহস্যময় বৌদ্ধ ধর্মের একটি দিক । অনেক আগে থেকেই এমন কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন যাঁর সংযত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন না । এঁরা যাদু বিদ্যারও চর্চা করতেন । বজ্রযান দর্শন এঁদের মধ্যেই দানা বেঁধেছিল এবং পাল যুগে তা ব্যাপক প্রসারলাভ করেছিল । এই ধর্মসম্প্রদায়ের প্রধানাদেবী ছিলেন বুদ্ধদেব ও বোধিসত্ত্বদের পত্নীরা । 

এঁদের মতে , দেবদেবীর অনুগ্রহ ভিক্ষা করে লাভ নেই । কঠিন সাধনার মধ্য দিয়ে দেবদেবীদের অনুগ্রহ প্রদানে বাধ্য করতে হবে । যে গ্রন্থে এই সাধনার পদ্ধতি লিখিত আছে , তাকে বলা হত ‘ তন্ত্র ‘। তাই বজ্রযানকে ‘ তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম ’ বলেও আখ্যায়িত করা হয় । তারাগণ ছাড়াও ডাকিনী , যোগিনী , পিশাচী প্রভৃতি তুচ্ছ দেবদেবীর অস্তিত্ব ছিল । অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাকে বশীভূত করাই ছিল বজ্রযানের উদ্দেশ্য । মদ্যপান , মাংসাহার , পশুহত্যা , এমনকি নরহত্যাও এই ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল না ।

কালচক্র 

বজ্রযান আবার ‘ সহজযান ’ ও ‘ কালচক্রযান ‘ এই দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল । ‘ সহজযান ’ দর্শন বজ্রযান থেকেও ছিল সূক্ষ্মতর এবং এর রহস্যময়তা ছিল আরও গভীর । সহজযানে কোন দেবদেবীর অস্তিত্ব ছিল না । এঁদের মতে , মাটিতে পাথরের দেবদেবীর কাছে মাথা নোয়ানোর কোন মূল্য নেই । জপ-তপ বা তীর্থে গমন এঁদের কাছে ছিল অর্থহীন । এঁদের মতে , সবাই বুদ্ধত্ব লাভের অধিকারী এবং এই বুদ্ধত্ব দেহের মধ্যেই বিরাজমান । দেহবাদই একমাত্র সত্য । পুরুষ এবং প্রকৃতির মিলনে বোধিচিত্তে যে মহাসুখ অনুভুত হয় , তাই একমাত্র সত্য । 

সহজযানীদের বাণী হল ধ্যানে মোক্ষ নাই , সহজ ছাড়া নির্বাণ নাই , কায়সাধন ( দেহবাদ ) ভিন্ন পথ নাই । তাঁরা বলতেন শূন্য নিরঞ্জনই মহাসুখ । সেখানে পাপপুণ্য কিছুই নাই । সহজে মন নিশ্চল করে যে সাম্য ভাবনা লাভ করেছে সেই সিদ্ধ । তাঁদের ভাষায় , বৈরাগ্যের থেকে বড় পাপ নেই , সুখের চেয়ে বড় পুণ্য নেই ।

গুরুবাদ 

সহজযান দর্শনে গুরুর বিশিষ্ট ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে । এঁরা বিশ্বাস করতেন একমাত্র যোগ্য গুরুই একজন শিষ্যকে সঠিক পথে চালিত করে মোক্ষ লাভ করাতে পারেন । এঁরা বিশ্বাস করতেন প্রতিটি মানুষের একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক প্রবণতা আছে । এর নাম ‘ কুল ‘ । এই কুলের সংখ্যা পাঁচ , যথা — ডোম্বী , নটী , রজকী , চণ্ডালী এবং ব্রাহ্মণী । এই পাঁচটি কুল হল শক্তির পাঁচটি দিক । শিষ্যের মধ্যে কোন ‘ কুল ’ বর্তমান , তা যথার্থ বিচার করে তাকে সেই বিশেষ শক্তির অনুসরণের নির্দেশ দেওয়াই গুরুর কাজ । সহজযানে যোগের বিশেষ ভূমিকা আছে ।

এঁরা বিশ্বাস করতেন যে মস্তিষ্কের উচ্চতম প্রদেশে মহাসুখের অবস্থান । দেহের মধ্যস্থিত বত্রিশ নাড়ীর মধ্য দিয়ে শক্তি সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছায় । এই নাড়ীগুলির নাম হল ললনা , রসনা , কৃষ্ণা , সামান্যা , অবধূতী প্রভৃতি । কালচক্রযানেও অনুষ্ঠানের কোন স্থান ছিল না । এতেও যোগ সাধনকে গুরুত্ব দেওয়া হত । তবে এঁরা সাধনার জন্য তিথি ও ক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন । 

আরো পড়ুন : বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব

বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের কারণ

বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

চারটি বৌদ্ধ সংগীতি আলোচনা করো

error: Content is protected !!