বৈদিক যুগের ধর্মীয় জীবন

বৈদিক যুগের ধর্মীয় জীবন

ভারতীয় সমাজ মূলত ধর্মাশ্রয়ী । আমাদের আচার আচরণ , রীতিনীতি , প্রকৃতি প্রতিটির ক্ষেত্রেই ধর্ম ভাবনার সুস্পষ্ট প্রভাব বিদ্যমান । বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগের সমাজ ভাবনাও এর ব্যতিক্রম ছিল না । স্বভাবতই এই দুই যুগের ধর্মীয় জীবনের আলোচনার দ্বারা ঐ সময়কার জীবন যাপন পদ্ধতির বহু পরিচয় পাওয়া যায় । 

ঋক বৈদিক যুগের ধর্ম  

ঋক বৈদিক যুগে আর্যরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করত । তারা বিশ্বাস করত যে প্রকৃতির এই নানা বহিঃপ্রকাশ যেমন , ঝড় , বৃষ্টি , ভূমিকম্প , অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি দৈব শক্তির ইচ্ছানুযায়ী সম্ভব হচ্ছে । তাই প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য যাগযজ্ঞ করত । 

আর্যদের উপাস্য দেবতাদের মধ্যে ইন্দ্র , বরুণ , অগ্নি , সোম প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য । ঋক বৈদিক যুগে পুরুষ দেবতাদের প্রাধান্য লক্ষণীয় । প্রাক বৈদিক যুগের স্ত্রী দেবতাদের প্রাধান্য বৈদিক যুগে ভীষণভাবে হ্রাস পায় । ঋকবেদে বহু দেবতার উল্লেখ থাকলেও পণ্ডিতদের বিশ্বাস আর্যরা মূলত ছিল একেশ্বরবাদী । কারণ বেদের স্তোত্রগুলির অন্তর্নিহিত ভাব এক ঈশ্বরের অস্তিত্বকেই সমর্থন করে । অবশ্য বহু পণ্ডিত এই যুক্তি মানতে চান না ।

আরো পড়ুন : হরপ্পা সভ্যতা ও ঋক বৈদিক সভ্যতার সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য

ঋক বৈদিক যুগের দেবদেবী : 

ঋক বৈদিক যুগের সূচনাকালে আর্যদের কাছে ‘ দ্যো ‘ ছিলেন আকাশের দেবতা বা পিতা । ‘ পৃথিবী ’ ছিলেন প্রাধান্য দেবী বা বিশ্ব মাতা । খাদ্য , জল ও বাসস্থান দিয়ে এঁরা জীবজগৎকে রক্ষা করছেন — এই ছিল আর্যদের বিশ্বাস । কালক্রমে এঁদের প্রভাব কমতে শুরু করে । তখন ইন্দ্র , অগ্নি , বরুণ প্রভৃতি প্রধান দেবতার আসন লাভ করেন । 

ইন্দ্র ছিলেন ঋক বৈদিক আর্যদের প্রধান উপাস্য দেবতা । তিনি ছিলেন বজ্র ও বৃষ্টির দেবতা । তিনি বজ্র দ্বারা অসুর বা অনার্যদের পরাজিত করতেন এবং বৃষ্টিপাতের দ্বারা শস্য উৎপাদন করতেন । কোন কোন পণ্ডিতের ধারণা ইন্দ্ৰ আসলে ছিলেন আর্যদের কোন শক্তিশালী গোষ্ঠীর নেতা । ঋকবেদে তাঁকে ‘ পুরন্দর ’ ( অর্থাৎ যে পুর বা নগর ধ্বংস করে ) বলে বর্ণনা করা হয়েছে । তাঁর আর এক নাম ছিল ‘ বৃত্রঘ্ন ‘ বা বাঁধ ধ্বংসকারী । এই ক্ষমতার জন্যই আর্যরা এঁর উপর দেবত্ব আরোপ করেছে বলে অনুমান করা হয় । 

ইন্দ্রের পরেই ছিল ‘ অগ্নি‘র স্থান । অগ্নিকে দেবতা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী দেবতা বলে গণ্য করা হত । বিশ্বাস ছিল , যজ্ঞের সময় অগ্নিতে যেসব দ্রব্যাদি উৎসর্গ করা হত , তা ভস্মীভূত হয়ে ধূম্রকারে শূন্যে দেবতাদের কাছে পৌঁছে যেত । 

বরুণ ছিলেন পাপপুণ্যের ধারক এবং বাহক । পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে তা ঐ দেবতার প্রকাশ বলেই আর্যরা বিশ্বাস করত । এছাড়া সূর্য ছিলেন আলোর দেবতা , যম ছিলেন মৃত্যুর দেবতা , সাবিত্রী ছিলেন সূর্যমণ্ডলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং সোম ছিলেন গাছপালার দেবতা । ঋকবেদে রুদ্র ও বিষ্ণুর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ।

যজ্ঞানুষ্ঠান :

ঋক বৈদিক যুগে ধর্মীয় আচারের প্রধান অঙ্গ ছিল প্রার্থনা , বলিদান এবং যাগ যজ্ঞ । সভ্যতার প্রথমদিকে আর্যরা গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে বা ব্যক্তিগত ভাবে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানাত । দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বলিদান ছিল একটি বহুল প্রচলিত রীতি । এছাড়া আর্যরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য যাগযজ্ঞেরও আয়োজন করত । এখানে অগ্নিতে ঘৃত ও বিভিন্ন দ্রব্যাদি আহুতি দেওয়া হত । এই যজ্ঞানুষ্ঠানের ব্যয়ভার অনেক সময় গোষ্ঠীপতি বা রাজারা বহন করতেন । যজ্ঞ পরিচালনা করতেন ব্রাহ্মণেরা ।

পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্ম 

পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যদের ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন ঘটেছিল । এই যুগে ইন্দ্র , বরুণ প্রভৃতি দেবতার প্রাধান্য অনেক হ্রাস পেয়েছিল । পরিবর্তে ‘ প্রজাপতি ব্রহ্মা ‘ -কে সৃষ্টিকর্তা রূপে কল্পনা করে তাঁকেই সমস্ত কিছুর আধার বলে মনে করা হত । 

তাছাড়া সিন্ধু সভ্যতার যুগে পূজিত ‘ শিব ‘ পরবর্তী বৈদিক যুগে বিশেষ প্রাধান্য লাভ করেছিল । এই যুগে বিষ্ণু মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি পান । মানুষের সব যন্ত্রণার মুক্তি একমাত্র ‘ বিষ্ণুর ‘ শ্রীচরণ লাভেই সম্ভব এই বিশ্বাস দৃঢ় ছিল । 

পরবর্তী বৈদিক যুগে ধর্মাচরণ পদ্ধতিও অনেক পরিবর্তিত হয়েছিল । এই যুগে যাগযজ্ঞের ছিলেন না । ফলে এই যুগে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য অনেক বেড়ে গিয়েছিল । এইসব অনুষ্ঠান থেকে ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতদের অনেক আয় হত । 

জন্মান্তরবাদ :

পরবর্তী বৈদিক যুগে ধর্ম ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল দার্শনিক তত্ত্বের উদ্ভব । এই যুগে মানুষ কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতে শুরু করে । কর্মফল থেকেই মানুষের সুখ দুঃখের সৃষ্টি এবং এর প্রভাবেই পুনর্জন্ম ঘটে । এই নিরবিচ্ছিন্ন পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি লাভের উপায় হিসেবে মানুষ সন্ন্যাস ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয় । আধ্যাত্মবাদের পাশাপাশি জড়বাদের তত্ত্বও এই যুগে উদ্ভাবিত হয়েছিল । 

আরো পড়ুন : সভা ও সমিতি কাকে বলে

ভারতে আর্যদের আগমন

ভারতবর্ষ নামকরণের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা

error: Content is protected !!