বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রচারিত হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম দেশে বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করলেও দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই এই ধর্মমতের বিলুপ্তি ঘটেছিল । বৌদ্ধধর্মের এই দ্রুত অবলুপ্তির কারণ উল্লেখ করা যায় । 

রাজ অনুগ্রহের অভাব 

রাজানুগ্রহ লাভ করার ফলে বৌদ্ধ ধর্মে দ্রুত বিস্তার লাভে সক্ষম হয়েছিল । বিম্বিসার , অশোক , কণিষ্ক প্রমুখ নৃপতি এই ধর্মকে জনপ্রিয় করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু কণিষ্কের পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্ম রাজানুগ্রহ লাভে বঞ্চিত হয় , ফলে জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে । 

তবে কোন কোন পণ্ডিত এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । এঁদের মতে , গুপ্ত পরবর্তী যুগে যদি বৌদ্ধ ধর্মের পশ্চাতে রাজ সমর্থন না থাকত , থাকলে পাল যুগে তক্ষশীলা মহাবিহার কিভাবে নির্মিত হয়েছিল , বা অতীশ দীপঙ্কর কিভাবে ধর্ম সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিব্বত যেতে পেরেছিলেন ।

অনুষ্ঠানের প্রাধান্য 

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কুসংস্কারের প্রতিবাদ স্বরূপ বৌদ্ধ ধর্মের সৃষ্টি হয়েছিল । কিন্তু কালক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে বহু কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল । বুদ্ধের মূর্তি পূজা করা , মন্দিরে বুদ্ধ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা বা তারাকে বুদ্ধের স্ত্রী রূপে কল্পনা করা হলে হিন্দু ধর্মের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভেদ কমে যায় । এমনকি ধ্যানরত বুদ্ধকে শিবরূপে কল্পনা করা হয় । এর ফলে বৌদ্ধ ধর্ম ধীরে ধীরে তার স্বাতন্ত্র্য হারাতে থাকে এবং বৌদ্ধগণ হিন্দু ধর্মমুখী হতে থাকেন ।

আরো পড়ুন : গৌতম বুদ্ধের জীবনী ও বাণী

হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণ 

বৌদ্ধ ধর্মের ক্রমবিলুপ্তির জন্য অনেকে খ্রীষ্টীয় প্রথম শতকের প্রথম দশকে আগত হিন্দু ধর্ম সংস্কারক শংকরাচার্যকুমারিল ভট্টের প্রচারকে দায়ী করেন । 

শংকরাচার্য বেদান্ত ও অদ্বৈতদর্শন প্রচার করেন । তাঁর প্রচারের ফলে হিন্দু ধর্ম কুসংস্কার মুক্ত হয় এবং এর পুনর্জাগরণ ঘটে । তিনি সমগ্র ভারত পরিভ্রমণ করে অদ্বৈতবাদ প্রচার করেন । শোনা যায় , তিনি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের তর্ক যুদ্ধে বারবার পরাস্ত করে তাঁদের হিন্দুধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতেন । তাঁর কর্ষণে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধ হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে । শংকরাচার্যের মৃত্যুর পর বাচস্পতি মিশ্র তাঁর আদর্শ প্রচার করেন । 

অবশ্য শংকরাচার্য হিন্দুধর্মের সংস্কার সাধন করে তাকে জনপ্রিয় করে তুললেও , তিনি বৌদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে আদৌ কোন আলোচনায় অংশ নিতেন কিনা এই বিষয়ে মতভেদ আছে ।

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ 

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে , মতানৈক্য ও পরস্পর বিরোধী সম্প্রদায়ের উদ্ভব এই ধর্মের অবনতিকে ত্বরান্বিত করে । বৈশালীতে আহুত ধর্ম সম্মেলনে এই বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অতঃপর ‘ হীনযান ‘ ও ‘ মহাযান ‘ এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন । হীনযানগণ ‘ থেরবাদী ‘ বা ‘ স্থবিরবাদী ’ এবং মহাযানগণ ‘ আচার্যবাদী ‘ বা ‘ সংমিক ’ নামে পরিচিত হন । এই বিভেদ বৌদ্ধ ধর্মের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে । 

বৌদ্ধ সংঘের অনাচার 

কালক্রমে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে ও বৌদ্ধ সংঘগুলিতে নানাপ্রকার অনাচার প্রবেশ করলে ধর্মমত তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে । সংঘগুলিতে বহু অবাঞ্ছিত ব্যক্তির আগমন ঘটে এবং অর্থের প্রাচুর্যের ফলে ভিক্ষুরা আরামপ্রিয় ও বিলাসী হয়ে পড়েন । পরন্তু মঠে সন্ন্যাসিনীদের প্রবেশাধিকার থাকার ফলে ভিক্ষুদের নৈতিক অধঃপতন শুরু হয় । 

পাল যুগে বৌদ্ধ ধর্মে তন্ত্রমন্ত্রের প্রাধান্য বাড়ে । কালযান , সহজযান প্রভূত মতবাদ বৌদ্ধ ধর্মের যুক্তিবাদী চরিত্রকে নষ্ট করে দেয় । বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মনে নীতিবোধ হ্রাস পায় , তপস্যার প্রতি আকর্ষণ কমতে থাকে । পক্ষান্তরে , বৃদ্ধি পায় অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডের আকর্ষণ । অষ্টাঙ্গিক মার্গের সাধনার স্থান দখল করে আচার সর্বস্ব তন্ত্রমন্ত্র । এককথায় , বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিতকেই এরা আঘাত করে । ফলে ধর্ম ক্রমশঃ অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে ।

অভ্যন্তরীণ আক্রমণ 

অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত আক্রমণ বৌদ্ধ ধর্মের পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল । বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘ দিব্যাবদান ’ থেকে জানা যায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক পুষ্যমিত্র শুঙ্গ বৌদ্ধদের নানাভাবে উৎপীড়িত করেছিলেন । তিনি নাকি প্রতিজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছিন্নমুণ্ডের জন্য একশত করে মুদ্রা পুরস্কার স্বরূপ দিতে রাজী ছিলেন । 

হিউয়েন সাঙ এর রচনা থেকে জানা যায় , গৌড়রাজ শশাঙ্কও চরম বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন । তিনিও বহু বৌদ্ধকে হত্যা করেন এবং বোধগয়ার পবিত্র বোধি বৃক্ষটি কেটে ফেলেন ।

বৈদেশিক আক্রমণ 

বহিরাগত আক্রমণকারীদের আঘাত বৌদ্ধ ধর্মের পতন ত্বরান্বিত করে । হুন নেতা মিহিরকুলও বৌদ্ধদের বহু মঠ ধ্বংস করেন এবং অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুককে হত্যা করেন । তাঁর ভাষায় : He ( Mihirkula ) caused the demolition of 1600 stupas and monasteries and put to death nine kotis ‘ ( crores ) of lay adherents of Buddhism . ” 

সর্বোপরি মুসলমান আক্রমণকারীগণ বৌদ্ধ ধর্মের উপর চরম আঘাত হানেন । বৌদ্ধমঠ গুলির বিপুল ঐশ্বর্য লাভের আশায় ঐগুলি মুসলমান লুঠেরাদের আক্রমণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় । এদের আক্রমণে বহু মঠ ধ্বংস হয় এবং বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু নিহত হন ।  এই সময় বহু বৌদ্ধ নেপাল ও তিব্বতে আশ্রয় গ্রহণ করেন । এইভাবে একাধিক কারণে বৌদ্ধ ধর্ম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় ।  

আরো পড়ুন : বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্মের মধ্যে পার্থক্য

চারটি বৌদ্ধ সংগীতি আলোচনা করো

হীনযান ও মহাযান এর পার্থক্য

error: Content is protected !!