মন্তেসরি শিক্ষা পদ্ধতি

মন্তেসরি শিক্ষা পদ্ধতি

মন্তেসরির শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শিক্ষণ পদ্ধতি । বিশেষ করে তিনি শিক্ষণ পদ্ধতিতে নানা দিক থেকে নতুনত্ব এনেছেন । তাঁর শিক্ষণ পদ্ধতি প্রধানতঃ তিনটি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত । ( ১ ) ইন্দ্রিয় পরিমার্জনের নীতি , ( ২ ) আত্মপ্রচেষ্টার নীতি এবং ( ৩ ) সক্রিয়তার নীতি

ইন্দ্রিয় পরিমার্জনের নীতি :

ইন্দ্রিয়ের পরিমার্জনার ( sense training ) উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই আমরা বহির্জগৎ থেকে জ্ঞান আহরণ করি । তিনি মনে করতেন , মানসিক অনগ্রসরতার ( Mental deficiency ) জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী হল ইন্দ্রিয় । ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতার দরুন অনগ্রসরতা দেখা দেয় । তাই শিশুকে শিক্ষা দিতে হলে প্রথমে তার ইন্দ্রিয়ের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে । এই কারণে তিনি বিভিন্ন ধরনের ডিডাকটিক  যন্ত্র তৈরি করেন , যার মাধ্যমে শিশুরা সহজেই বিভিন্ন ধরনের উদ্দীপকের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে ।  

আত্মপ্রচেষ্টার নীতি :

তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের মত শিশুর আত্মপ্রচেষ্টার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । শিক্ষার্থী নিজের চেষ্টায় যা শিখবে , তাই হবে প্রকৃত শিক্ষা । তিনি মনে করতেন , শিক্ষার্থীরা যখন নিজে কোন জিনিস শিখবে , তখন তাতে তারা আনন্দ পাবে এবং শিক্ষা তাদের কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে । তাঁর ডিডাকটিক যন্ত্রে শিক্ষার্থীদের ভুল ও ত্রুটি দূর করার জন্য আচরণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে । এতে করে সব রকম মানসিক ক্ষমতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীকে সহজে শিক্ষাদান করা যায় । এইধরনের শিক্ষা পদ্ধতিকে তিনি স্বয়ং শিক্ষা ( Auto education ) বলেছেন ।  

সক্রিয়তার নীতি :

শিক্ষার্থীদের স্বয়ংশিক্ষার সুযোগ দিতে হলে তাকে অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে । পরিপূর্ণভাবে করতে হলে শিশুকে কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে । তিনি এই স্বাধীনতাকে শিক্ষার একমাত্র যোগ্য মাধ্যম ( Medium ) হিসাবে গ্রহণ করেছেন । তিনি বলেছেন— “ The school must permit the free , natural manifestation of the child , if he is to be studied in a scientific manner.The method of observation is established upon one fundamental base — the liberty of the pupils in their spontaneous manifestations , necessitates independence of action on the part of the child . ”  

শিক্ষা পদ্ধতির প্রয়োগ  

মন্তেসরির শিক্ষণ পদ্ধতি এই তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত । সার্থকভাবে শিক্ষা পরিচালনা করতে হলে প্রথমতঃ শিক্ষার্থীর ইন্দ্রিয়ের পরিমার্জন করতে হবে ( Principle of sense training ) । ইন্দ্রিয়ের পরিমার্জন করে তাকে জ্ঞান আহরণের জন্য প্রস্তুত করতে হবে । শিক্ষার্থীকে অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে কাজ করার ( Principle of  liberty ) এবং এই স্বাধীনতার মধ্যে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্যে ( Didactic apparatus ) নিজেরাই শিখবে ( Auto – education ) ।  

মন্তেসরি এই পদ্ধতির শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা করেননি , তিনি শিক্ষাদানের পদ্ধতিও প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন । তিনি ছ’বছর পর্যন্ত শিশুদের শিক্ষার জন্য নিম্নলিখিত তিন ধরনের অনুশীলন পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন— 

[ এক ] তিনি শিক্ষার্থীদের জীবন যাপনের উপযোগী শিক্ষা দেওয়ার জন্য কিছু সাধারণ কাজের অনুশীলনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন । কাপড় কাচা , ঘর পরিষ্কার করা , ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দাঁত মাজা , নখ কাটা , আসবাবপত্র পরিষ্কার করা , জুতো পরিষ্কার করা ইত্যাদির মত কাজ শিশুদের শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে মন্তেসরি পদ্ধতিতে । 

মন্তেসরি মনে করতেন পরনির্ভরশীলতা স্বাধীনতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । তাই তাকে পরবর্তী স্তরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হলে প্রথমে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে এবং এই কারণেই তিনি এই ধরনের ছোটখাটো দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । এছাড়া , শিশুদের দেহের পেশী সঞ্চালনের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামেরও কিছু ব্যবস্থা করেছিলেন । এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি বিভিন্ন রকমের যান্ত্রিক কৌশলের সাহায্য নেন । হাতের কাজ , হাঁটা ইত্যাদির মাধ্যমে এই শিক্ষাদানের ব্যবস্থা মন্তেসরি করেন ।  

এইসব কাজের মাধ্যমে দু’রকম ফল পাওয়া যায় । এক দিকে শিশুর সুসামঞ্জস্য দৈহিক বিকাশ হয় এবং অন্যদিকে জীবনের প্রত্যক্ষ কাজের সঙ্গে তাদের পরিচিতি ঘটে এবং সেই অনুযায়ী তারা প্রশিক্ষণ লাভ করে । 

[ দুই ] মন্তেসরি তাঁর পদ্ধতিতে শিখন , চিন্তন , বিচারকরণ ইত্যাদির চেয়ে ইন্দ্রিয়ের প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব বেশী দিয়েছেন । এই কারণে তিনি বিভিন্ন ধরনের ডিডাটিক যন্ত্রের Didactic apparatus ) আবিষ্কার করেন । এইসব যন্ত্রের দ্বারা শিক্ষার্থীর ইন্দ্রিয়ানুভূতির বিকাশ হয় এবং শিক্ষার্থীর শিখন উপযোগী দৈহিক ও মানসিক প্রস্তুতি আসে ।  

এই ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে আছে কাঠের বিভিন্ন অনুশীলন আকারের টুকরো , কাগজ , আসবাবপত্র , বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা , পেন্সিল , বিভিন্ন রঙের উল , বাক্স , ঘণ্টা , ঘনক , রঙ , বিভিন্ন তাপমাত্রার জল ইত্যাদি । এইসব বস্তুর সাহায্যে শিশুদের আকার , ওজন , স্পর্শ , শ্রবণ এবং রঙ প্রভৃতির প্রত্যক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা গঠনের সহায়তা করা হয় । 

স্পর্শেন্দ্রিয়ের অনুভূতিকে জাগ্রত করার জন্য শিশুদের বিভিন্ন তাপমাত্রার জল পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় । অনেক সময় শিরীষ কাগজও স্পর্শ করতে দেওয়া হয় । আকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কাঠের চোঙ ( Cylinder ) এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠের টুকরো ব্যবহার করা হয় । শব্দানুভূতি জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন বাক্সে বিভিন্ন পরিমাণ পাথরের নুড়ি রেখে শব্দ উৎপাদন করা হয় । ওজন সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ওজনের জিনিস তুলনামূলকভাবে পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় । রঙের অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন রং এর কাঠ এবং উল পরীক্ষা করতে দেওয়া হয় ।  

এইসব ডিডাকটিক যন্ত্রের সাহায্যে শিক্ষাদানের পদ্ধতি মনোবিদ্যা সম্মত । শিক্ষাক্ষেত্রে তিনটি মনোবিদ্যাসম্মত মূল নীতির উপর এই পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত । অনুষঙ্গ( Association ) ,প্রত্যাভিজ্ঞা ( Recognition ) এবং পুনরুদ্রেক ( Recall ) — এই তিন পর্যায়ে মানসিক প্রক্রিয়া সংগঠিত হয় । 

[ তিন ] ইন্দ্রিয়ের প্রশিক্ষণের পর আসে লেখা পড়া ও গণিত শিক্ষা । মন্তেসরি পদ্ধতিতে পড়ার ( Reading ) আগে লেখা ( Writing ) শেখানো হয় । এই শিক্ষার ক্ষেত্রে মন্তেসরি শিক্ষা সঞ্চালনের তত্ত্ব ( Transfer of training ) কে বিশেষভাবে কাজে লাগিয়েছেন । সাধারণ প্রস্তুতিমূলক সঞ্চালনকে ( Movement ) ধীরে ধীরে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হয় এই পদ্ধতিতে । তিনি বিশ্বাস করতেন , ” preparatory movements could be converted and reduced to a mechanism by means of repeated exercises not in the work itself , but in that which prepares for it . ”  

লেখা শিক্ষার বিভিন্ন স্তর :

হাতের লেখা শেখানোর তিনি তিনটি স্তরের উল্লেখ করেছেন –

( ১ ) প্রথমে বিভিন্ন বর্ণের আকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া ( Recognition of form of different alphabets ) । শিক্ষার্থীকে এই আকার সম্পর্কে পরিচিত করার জন্য শিরীষ কাগজে বিভিন্ন বর্ণ কেটে বোর্ডের মধ্যে আঠা দিয়ে আটকানো হয় এবং তাদের হাতের দ্বারা স্পর্শ করে অনুভব করতে দেওয়া হয় । এরপর ধীরে ধীরে পেন্সিলের ব্যবহার করে সেই স্পর্শানুভূতিকে সঞ্চলিত করা হয় ; 

( ২ ) শিক্ষার্থীরা যখন এইভাবে বর্ণগুলির উপর হাত দিয়ে স্পর্শ করে অভ্যাস করতে থাকে , তখন শিক্ষিকা সেগুলির উচ্চারণ তাদের শোনান । শিশুদেরও ঐ শব্দ পুনরাবৃত্তি করতে বলা হয় । এমনিভাবে পড়ারও প্রস্তুতি হতে থাকে । 

( ৩ ) পরবর্তী পর্যায়ে শিশুদের বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পেন্সিলের উপর আয়ত্ত আনার চেষ্টা করা হয় । এইজন্য একটি পাতলা চারকোণা লোহার ফ্রেম ব্যবহার করা হয় । ঐ ফ্রেমটি কাগজের উপর রেখে পেন্সিল দিয়ে ওর ভেতরের এবং বাইরের ধার বরাবর লাইন টানতে বলা হয় । 

পড়া শিক্ষা :

‘ পড়া ’ শেখানোর ব্যাপারে মন্তেসরি বলেছেন— লেখার সময় যে প্রস্তুতি আসবে , তার সঞ্চালনের মাধ্যমে শিশুরা পড়তে শিখবে । পড়া শেখানোর জন্য মন্তেসরি কার্ড ব্যবহার করেছেন । এক একটি কার্ডে বিভিন্ন শব্দ লেখা থাকে । শব্দগুলি সাধারণতঃ শিশুর পরিচিত বস্তুর নাম । সে শব্দগুলি বারবার পুনরাবৃত্তি করে এবং যখন ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে , তখন কার্ডটিকে ঠিক সেই বস্তুর নিচে তাকে রাখতে বলা হয় , যার নাম ওতে লেখা আছে । বাক্য শেখানোর ক্ষেত্রেও ঐ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় ।

গণিত শিক্ষা :

গণিত শিক্ষা মন্তেসরির মতে , লেখা এবং পড়া শিক্ষার পর হবে । তবে গণিত শেখানোর জন্য তিনি নতুন কিছু পদ্ধতির কথা বলেননি । প্রত্যক্ষ বস্তুর সাহায্যে গণনা শিক্ষা এবং অন্যান্য গণিতের কৌশল শেখানোর জন্য “ লং স্টেয়ার ” ( Long stair ) ব্যবহার করেছেন । এছাড়াও , মন্তেসরি পদ্ধতিতে নানা রকম হাতের কাজ এবং চারিত্রিক গুণ বিকাশের উপযোগী বিভিন্ন রকমের পাঠেরও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । 

আরো পড়ুন : মন্তেসরি শিক্ষা পদ্ধতি

মন্তেসরির মতে শিক্ষার লক্ষ্য

কিন্ডারগার্টেন এবং মন্টেসরি পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য

মন্টেসরি এডুকেশন

মন্তেশ্বরী শিক্ষা পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য

error: Content is protected !!