জন ডিউই এর শিক্ষা পদ্ধতি

জন ডিউই এর শিক্ষা পদ্ধতি

ডিউই শিক্ষাকে মনোবিদ্যা সম্মত করারও পক্ষপাতী ছিলেন । তাই তিনি সম্পূর্ণ শিক্ষা দানের পরিকল্পনাকে শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের সঙ্গে সমতা রেখে রচনা করার কথা বলেছেন । শিশুর জীবনকে তিনি মানসিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তিনটি পর্যায়ে বা স্তরে ভাগ করেছেন ( এক ) খেলার প্রাধান্য মূলক স্তর ( Play period ) , ( দুই ) স্বতঃস্ফূর্ত মনোযোগের স্তর ( Period of spontaneous attention ) , ( তিন ) মননশীল মনোযোগের স্তর ( Period of reflective attention ) । 

খেলা প্রধান স্তর : 

প্রথম স্তরের সময়কাল হিসেবে তিনি ৪ থেকে ৮ বৎসর বয়সকে নির্দেশ করেছেন । এই স্তরের প্রথম দিকে শিশু পরিবারের ( Home ) মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাজের অনুশীলন করে খেলার মাধ্যমে । এর পরে , গৃহ পরিবেশের কাজ ছাড়াও সমাজের অন্যান্য কাজও সে অনুশীলন করতে আরম্ভ করে ; বিশেষভাবে সেইসব কাজের প্রতি তার ঝোঁক দেখা যায় , যেগুলির জন্য তার পরিবারকে সমাজের উপর নির্ভর করতে হয় । অবশেষে , এই অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সে অন্যান্য সামাজিক ক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয় । ডিউই বলেছেন , এই স্তরেরই শেষের দিকে শিশুকে সাধারণভাবে লেখা পড়া এবং ভূগোল সম্পর্কে সাধারণ ধারণা দিতে হবে । 

স্বতঃস্ফূর্ত মনোযোগের স্তর :

দ্বিতীয় স্তরের সময়কালের ঊর্ধ্বসীমা হিসেবে ডিউই ১২ বছর ( ৮-১২ বয়স সীমাকে ) নির্দেশ করেছেন । এই বয়সে শিশুরা লক্ষও এবং উপায় ( Means and ends ) এর মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে । এখন তারা জীবনের প্রত্যক্ষ সমস্যা সমাধানের উপযোগী হয়ে ওঠে । এইসময় থেকে তাকে প্রত্যক্ষ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে । বিভিন্ন ধরনের সমস্যামূলক পরিস্থিতিতে তাকে স্থাপন করে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দিতে হবে । এ ছাড়া , এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সমাজবিদ্যা ( Social studies ) পড়ানোর কথা তিনি বলেছেন । কারণ , এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মানব সভ্যতার বিকাশের ধারার সঙ্গে পরিচিত হবে । সে বুঝতে শিখবে , কিভাবে মানুষ তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন পরিস্থিতিকে আয়ত্তে এনেছে । 

মননশীল মনোযোগের স্তর :

১২ বৎসরের পরবর্তীকালকে তিনি মননশীল মনোযোগের স্তর হিসেবে নির্দেশ করেছেন । মননশীল মনোযোগের এই বয়সের পর শিশুরা নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে এবং নিজেরাই সমাধান করতে পারে । এই স্তরের শিক্ষা এমন হওয়া দরকার যে , তারপরেই শিক্ষার্থীরা সমাজ জীবন যাপনের উপযোগী হয় । 

সক্রিয়তার নীতি ও সমস্যামূলক শিক্ষণ পদ্ধতি 

ডিউই শিক্ষণ পদ্ধতিকে মনোবিদ্যা সম্মত করে রচনা করতে চেয়েছিলেন । তিনি মনে করতেন , মন হল সক্রিয়তার ফল এবং সক্রিয়তার মাধ্যমেই তার বিকাশ হয় । মনের চিন্তন প্রক্রিয়াকে জাগ্রত করার জন্য উদ্দীপকের প্রয়োজন এবং সেই উদ্দীপক সমস্যা ভিত্তিক না হলে চিন্তন প্রক্রিয়ার পেছনে প্রেষণা থাকতে পারে না । শিক্ষণ পদ্ধতির পরিকল্পনা রচনা করতে গিয়ে ডিউই এই তত্ত্বকে প্রয়োগ করেছেন । শিশুর আগ্রহ এবং প্রবণতাকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাকে সমস্যাভিত্তিক করতে হবে । তিনি বলেছেন— “ Method means that arrangement of subject – matter which makes it most effective in use . Never is method something outside of the material . ” 

বিষয়বস্তুর এই বিন্যাস ( Arrangement ) সুষ্ঠুভাবে সমস্যার মাধ্যমেই সম্ভব । তাই তিনি সমস্যামূলক বিষয়বস্তু নির্বাচনের কথা বলেছেন । শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ এবং প্রবণতা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ নির্বাচন করবে এবং যখনই সে এই ধরনের সমস্যামূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে , তখনই সে তার সমাধানের কথা চিন্তা করবে । এই সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য সে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং পরে সেগুলিকে সমস্যা সমাধানের কাজে লাগাবে । এইভাবে যখন সে সমস্যা সমাধান করতে পারবে , তখন সেই জ্ঞান সে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করবে । এই পদ্ধতিকে ডিউই নাম দিয়েছেন ‘ সমস্যামূলক পদ্ধতি ‘ ( Problem Method ) । পরবর্তীকালে এই পদ্ধতির সংস্কার সাধনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে প্রোজেক্ট পদ্ধতি ( Preject Method ) । 

সমস্যামূলক পদ্ধতির বিভিন্ন স্তর 

ডিউই এর এই পদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাঁচটি সোপান বা স্তর দেখতে পাই । তিনি বলেছেন , এই সমস্যা পদ্ধতিতে পাঁচটি স্তর অবশ্যই থাকা প্রয়োজন এবং এর প্রত্যেক স্তরে শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য । এই পাঁচটি স্তর হল— 

( ১ ) সমস্যা সৃষ্টি : প্রথম স্তরে শিক্ষার্থী পরিস্থিতিকে এমনভাবে সাজাবে যাতে করে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয় । অর্থাৎ , শিক্ষার্থীকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে তার প্রবণতা অনুযায়ী । কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে যখনই সে বাধার সম্মুখীন হবে , তখনই সমস্যার সৃষ্টি হবে । তাই সমস্যা সৃষ্টি করা শিক্ষার্থীর নিজেরই কাজ । 

( ২ ) সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারণ : এই ধরনের সমস্যামূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে শিক্ষার্থী তা সমাধানের জন্য বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য কৌশল সম্পর্কে চিন্তা করতে আরম্ভ করবে । এটাই হল দ্বিতীয় স্তর । এখানেও শিক্ষার্থী মানসিক স্তরে বিশেষভাবে সক্রিয় হবে । অর্থাৎ , সমস্যা সমাধানের জন্য সম্ভাব্য কতকগুলি প্রকল্প গঠন এই স্তরের কাজ । 

( ৩ ) তথ্য সংগ্ৰহ : পরবর্তী স্তরে সে তার চিন্তা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা তথ্য সংগ্রহে অগ্রসর  হবে । কোন বিশেষ সমস্যা সমাধানের জন্য তার যে সব হাতিয়ার বা তথ্যের প্রয়োজন , তা সে সমাজ পরিবেশের মধ্যে সংগ্রহ করবে । 

( 8 ) সম্পাদনের সক্রিয়তা : এর পর চতুর্থ স্তরে সে সমস্যা সমাধানের জন্য কর্ম সম্পাদন করবে । তার চিন্তালব্ধ পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়ে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থী সমস্যার প্রকৃত সমাধান করবে ।   

( ৫ ) প্রয়োগ : সবশেষে , সে বিশেষ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করল , তা নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে তার যাথার্থ্যতা বিচার করবে , তবেই জ্ঞান সম্পূর্ণ হবে । 

মন্তব্য 

ডিউই এর শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিকভাবে কাজ করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । শিক্ষার্থীরা সমবেত চেষ্টায় বিশেষ কোন সমস্যার সমাধান করে । এই সমবেতভাবে কাজ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সামাজিক মনোভাবের বিকাশ হয় । ফলে , ডিউই এর এই শিক্ষণ পদ্ধতি তাঁর শিক্ষার দ্বিমুখী উদ্দেশ্যের অনুকূল ।

আরো পড়ুন : জন ডিউই এর শিক্ষা দর্শন

জন ডিউই এর শিক্ষা পদ্ধতি

জন ডিউই এর মতে শিক্ষার লক্ষ্য ও পাঠক্রম

error: Content is protected !!