গান্ধীজীর জীবন দর্শন

গান্ধীজীর জীবন দর্শন

পরাধীন ভারতবর্ষের জীবনে গান্ধীজীর দান অপরিসীম । তিনি যে শুধু সমগ্র জাতিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরূদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তাই নয় , ভারতবাসীর নৈতিক , অর্থনৈতিক , সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য তাঁর সমস্ত জীবন নিয়োগ করেছিলেন । ভারতবাসীর উন্নতির জন্য তাঁর মত সর্বেতোমুখী প্রচেষ্টা আর কেউ কোনদিন করেননি ।  গান্ধীজীর শিক্ষা চিন্তা একদিকে যেমন তাঁর ভাববাদী দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত , অন্যদিকে তেমনি গভীর সমাজ দর্শনের যুক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত । 

 ঈশ্বর ও মানুষ সম্পর্কে ধারণা

গান্ধীজীকে আমরা ভাববাদী দার্শনিক ( Idealist ) বলতে পারি । যে কোন ভাববাদীর মত ভগবানে তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও ভক্তি ছিল । তিনি ঐশ্বরিক শক্তিতে বিশ্বাস করতেন । তিনি বলেছেন , ভগবানই একমাত্র স্থির , তিনিই তাঁর লীলার মধ্যে সৃষ্টি করেছেন , আবার ধ্বংস করেছেন । মানুষ সর্ম্পকেও তাঁর ধারণা ছিল অধ্যাত্মবাদীদের মত ।  

তিনি প্রত্যেক মানুষকে সেই একই ব্রহ্মের অংশ হিসাবে কল্পনা করেছেন । সূর্যের আলো বিভিন্ন পথে এলেও তা যেমন একই উৎস থেকে আসে , মানুষও একই উৎস থেকে সৃষ্টি । তাঁর মতে জীবনের উদ্দেশ্য হল— সেই স্রষ্টা পরম ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা । তিনি মনে করতেন , মানুষের উৎস যেমন পরম ব্রহ্ম , তার জীবনের উদ্দেশ্যও সেই পরম ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা । তিনি আরও বলেছেন , আত্মোপলব্ধিই হল ভগবানকে উপলব্ধি করার একমাত্র উপায় । গান্ধীজীর হিন্দু দর্শনের উপর অগাধ বিশ্বাস ছিল ।  

কিন্তু অন্যান্য আদর্শবাদীদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য হল এই যে , তিনি শুধুমাত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না , তাঁকে প্রয়োগমূলক দার্শনিকও বলা যেতে পারে । তিনি তাঁর বিশ্বাস এবং চিন্তাধারাকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন । 

ঈশ্বরকে লাভ করার উপায় 

ভগবানকে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে হলে কি কি কৌশল অবলম্বন করতে হবে তাও তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন এবং নিজের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করে তার ফলাফল সম্পর্কেও পরীক্ষা করে গেছেন । তিনি বলেছেন , ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে হলে , সত্য আচরণ ( Truth ) প্রেম ( Love ) এবং অহিংসা ( Ahimsa ) — এই তিনটি জিনিসের প্রয়োজন ।  

সত্যাচরণকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেছেন । তিনি বলেছেন— “ I have no God to serve but truth ” . সত্যাচার শুধুমাত্র কথায় এবং আচরণে প্রকাশ পায় না । তার একটি নৈসর্গিক তাৎপর্যও আছে । ঈশ্বর উপলব্ধির একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল সত্যাচার ।  

মানব প্রেম ভগবানকে উপলব্ধি করার আর এক উপায় । প্রত্যেকের জীবনের গতি নিয়ন্ত্রণ করবে প্রেম । কারণ পাশাপাশি বস্তু সামগ্রীকে যদি ভালবাসার চোখে দেখা না যায় , তাহলে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম জাগবে না , ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা যাবে না । গান্ধীজী বলেছেন— “ To see the universal and all prevailing spirit of truth face to face . one must be able to love the nearest of creation as oneself . ” এই মানবপ্রেম গান্ধীজীকে সকলরকম কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতো ।  

তিনি সৃষ্টির প্রতি প্রেম প্রদর্শন করে স্রষ্টাকে জয় করতে চেয়েছিলেন । তার এই প্রেমের নীতির বিস্তৃতি ( Extension ) হিসেবে অহিংসার তত্ত্ব স্থাপন করেন । তিনি বিশ্বাস করতেন , কোন কিছু খারাপকে খারাপ ভাব দিয়ে জয় করা যায় না । মন্দকে ভাল দিয়েই জয় করা সম্ভব । ঘৃণা এবং হিংসাকে প্রেম ও অহিংসার দ্বারাই জয় করা যায় । তিনি বলেছেন , সত্যাচার এবং অহিংসা পরস্পর সম্পর্ক যুক্ত ।  

অহিংসার অর্থ আনুগত্য নয় । অহিংসার মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ মানবীয় গুণ — সহনশীলতা , ধৈর্য , উদ্যম , আত্মোৎসর্গের ভাব ইত্যাদি । তিনি বলেছেন , অহিংসাই হল মানুষের বৈশিষ্ট্য— হিংসাগুলি পাশবিক গুণ । অহিংসা ও প্রেমের বন্ধনে সমগ্র মানুষকে আবদ্ধ করতে পারলে ঈশ্বর উপলব্ধি হবে । এটাই হল তাঁর জীবন দর্শনের মূল কথা । 

গান্ধীজীর সমাজ দর্শন

গান্ধীজীর জীবন দর্শনের উপর ভিত্তি করে তাঁর সমাজ দর্শন গড়ে উঠেছিল । তিনি ভারতের সামাজিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধি করেছিলেন , জাতিকে সামগ্রিকভাবে উন্নত করতে হলে তার সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন । গান্ধীজী তাই বুঝেছিলেন , জাতির উন্নতি করতে হলে তার মধ্যে ভারতীয় জীবনাদর্শের প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করতে হবে এবং বিদেশী শাসনের প্রভাবে সমাজের মধ্যে যে কৃত্রিম স্তরের সৃষ্টি হয়েছে তাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে ফেলতে হবে । প্রত্যেক মানুষ পারস্পরিক আন্তরিকতা বজায় রেখে পাশাপাশি বাস করবে , তবেই সমাজের উন্নতি হবে ।  

তিনি এমন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন যেখানে প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ বিকাশের জন্য সমান সুযোগ পারে । সর্বোদয় সমাজ স্থাপনের আদর্শ তাঁর এই জীবন দর্শন দ্বারা প্রভাবিত । এছাড়া , সামাজিক উন্নতির জন্য তিনি অর্থনৈতিক সাম্য স্থাপনের কথা বলেছেন । কোন আদর্শ সমাজেই একজনকে অবহেলা করে অন্যের বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া উচিত নয় । অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থাকে ঠিক রেখে সমাজের মধ্যে এই বৈষম্যকে দূর করার কথা তিনি বলেছেন ।  

সবশেষে সমাজ জীবনের উন্নতির জন্য তিনি নাগরিকতার শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । প্রত্যেক নাগরিককে এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে করে সে সমাজে তার নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারে । এই ধরনের জীবনদর্শন ও সমাজ দর্শন দ্বারা গান্ধীজীর শিক্ষাদর্শন প্রভাবিত । তিনি বলেছেন- “ shall work for an India in which the poorest shall feel that it is their country.in whose making they have an effective voice , an India in which there shall be no high class or low class of people , an India in which communities shall live in perfect harmony. ” এবং শিক্ষা এই উদ্দেশ্য সাধনে সহায়তা করবে।

আরো পড়ুন : গান্ধীজীর জীবন দর্শন

গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য

আমেদাবাদ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে গান্ধীজীর ভূমিকা

খেদা সত্যাগ্রহ আন্দোলনে গান্ধীজীর ভূমিকা

চম্পারন সত্যাগ্রহ আন্দোলনে গান্ধীজীর ভূমিকা

মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষা দর্শন

error: Content is protected !!