স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন

স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় চিন্তাজগতে অনেক দিক থেকে আলোড়ন আনার চেষ্টা করেছেন । তাই আধুনিক চিন্তাধারায় তাঁর অবদানকে অস্বীকার করা যায় না । পরাধীন ভারতবাসীর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি তাদের ধর্মীয় চেতনাকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর তাত্ত্বিক অবদানও কম নয় । তিনি ভারতীয় উপনিষদ ও বেদান্তের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পৃথিবীর সামনে উপস্থিত করেছেন এবং ভারতবাসীকে সেই উদ্দেশ্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন । তাঁর শিক্ষার প্রয়োগমূলক কোন দিকই নেই , সবই তত্ত্ব ভিত্তিক । তিনি তাঁর শিক্ষা চিন্তার প্রয়োগের কোন সুযোগ পাননি । তবে তাঁর শিক্ষা তত্ত্ব এতই বিজ্ঞানসম্মত যে , তার ভাব আধুনিক শিক্ষাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে ।

স্বামী বিবেকানন্দের মতে শিক্ষার লক্ষ্য

বিবেকানন্দ শিক্ষার সংজ্ঞা দিয়েছেন— “ Education is the manifestation of perfection already in man ” . তাঁর মতে জ্ঞান মানুষের অন্তরের জিনিস । বাইরে থেকে জ্ঞান আসে না । মানুষের মনই হল বিশ্বপ্রকৃতির জ্ঞানের ভাণ্ডার , সেখানেই সমস্ত জ্ঞান সঞ্চিত থাকে । সাধারণ অর্থে আমরা যাকে বলি “ শিক্ষা করছি ” আসলে তা ঠিক নয় , বলা উচিত “ নিজে আবিষ্কার করছি । ” মনের মধ্যে থেকে যখন আবরণকে আমরা সরিয়ে দিতে পারি , তখন আমাদের আত্মজ্ঞান প্রকাশ লাভ করে । চকমকি পাথরের মধ্যে আগুন জ্বলার সম্ভাবনা আছে বলেই ঘর্ষণের ফলে তা জ্বলে ওঠে , আগুন বাইরে থেকে আসে না । 

মনের মধ্যে জ্ঞানের উৎস আছে বলেই তার প্রকাশ পায় অনুভাবনের মাধ্যমে ( Like fire in a piece of flint , knowledge exists in the mind ; suggestions is the friction which brings it out ) । তাই তাঁর মতে শিক্ষা হল আন্তরিক সত্তার প্রকাশ , বাইরের কোন প্রচেষ্টা নয় এবং এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটবে । 

বিবেকানন্দের এই শিক্ষা চিন্তা যদিও ভারতীয় দর্শনের অতি জটিল তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত , তাহলে এর মধ্যে বৈজ্ঞানিক উপাদানেরও সংযোজন আছে এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এই মতবাদ অতি আধুনিক মতবাদের সঙ্গে মিলে যায় । বিবেকানন্দ বলেছেন , শিক্ষা হল অভ্যন্তরীণ মহত্ত্বের প্রকাশ । এই সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে , দুটি শব্দের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করতে হয় । প্রথমতঃ মহত্ত্ব ( Perfection ) , দ্বিতীয়তঃ ; প্রকাশ ( Manifestation ) ।

শিক্ষার ব্যক্তিতান্ত্রিক তাৎপর্য :

অন্তর্নিহিত মহত্ত্ব বলতে তিনি ব্যক্তির নিজস্ব গুণাবলীর কথাই বলতে চেয়েছেন । মানবতাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত তিনি , তাই ব্যক্তির সকল রকম নিজস্ব সত্তাকেই মহৎ দেখেছেন । অর্থাৎ , এই সত্তাকে আমরা মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের ( Individualty ) দিক বলতে পারি । অর্থাৎ , ব্যক্তি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র অনুযায়ী বিকাশ লাভ করবে । এই মতবাদই তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন । ফলে তিনি শিক্ষায় ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন । 

শিক্ষার সমাজতান্ত্রিক তাৎপর্য :

অন্যদিকে ‘ প্রকাশ ‘ ( Manifestation ) কথার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে আমরা অন্য জিনিস দেখতে পাই । কোন কিছুর প্রকাশ একটি বিশেষ মাধ্যমেই হওয়া স্বাভাবিক । কোন বিশেষ পরিবেশের মধ্যে যদি প্রকাশিত না হয় , তাহলে ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্নিহিত শক্তি যতই থাকুক না কেন , তার কোন মূল্য নেই । তাই বিবেকানন্দ ‘ মহত্ত্বের ‘ উপর যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন , তেমনি তার প্রকাশের উপর সমান গুরুত্ব দিয়েছেন । যে মহত্ত্ব অন্তর্নিহিত তার কোন মূল্যই নেই , তা যদি যথাযোগ্য পরিবেশে প্রকাশ লাভ না করে । 

ব্যক্তির এই অন্তর্নিহিত মহত্ত্বের প্রকাশের একমাত্র স্থান হল মনুষ্য সমাজ । মহত্ত্বকে উপলব্ধি করবে কে , যদি তা সমাজ পরিবেশের মধ্যে প্রকাশিত না হয় । তাঁর এই ‘ প্রকাশ ’ কথার মধ্যে আমরা সামাজিক গুরুত্বের ইঙ্গিত পাই । এদিক থেকে বিবেকানন্দ , সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে ( Socialistic view ) সমর্থন করেছেন । সুতরাং বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শনের মধ্যে আমরা ব্যক্তিতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদের ( Individualistic and socialistic view ) সার্থক সমন্বয় দেখতে পাই । 

তিনি শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে গিয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে সমাজ চেতনার সমন্বয় সাধন করেছেন । তিনি তাই মনুষ্যত্বের শিক্ষার ( Man – making education ) কথা বলেছেন । শিক্ষার লক্ষ্য শুধু কতকগুলি তথ্য পরিবেশন করা নয় ; ব্যক্তির অন্তর্নিহিত শক্তিকে যথার্থ সামাজিক পথে পরিচালিত করাই হল শিক্ষার লক্ষ্য । তিনি বলেছেন— “ Education is not the amount of information that is put into your brain and runs riot there undigested all your life . We must have life – building , man – making . character – making , assimilation of ideas . ” তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন— “ The end of all education , all training should be man – making . The end and aim of all training is to make the man grow . “

স্বামী বিবেকানন্দের মতে শিক্ষার পাঠ্যক্রম 

পাঠ্যক্রম সম্পর্কে বিবেকানন্দ বিশেষ কিছু বলেননি । তাঁর শিক্ষা চিন্তার মধ্যে আমরা ব্যবহারিক দিকের চেয়ে তত্ত্বের সন্ধানই বেশী পাই । তিনি ভারতবাসীর সাধারণ অবস্থার কথা চিন্তা করে তাদের জন্য সর্বজনীন শিক্ষার ( Mass education ) কথা বলেছেন । তিনি বিশ্বাস করতেন— “ A nation is advanced in proportion as education and intelligence spread among the masses . ” এই সর্বজনীন শিক্ষার জন্য যে পাঠ্যক্রমের কথা বলেছেন , তার মধ্যে তিনি তাঁদের আধ্যাত্মিক বিকাশের উপর গুরুত্ব দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা প্রবর্তনের কথা বলেছেন । তিনি সমস্ত কিছু শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যমে দেওয়ার কথা বলেছেন এবং মাতৃভাষার চর্চার কথা বলেছেন । 

এছাড়া তিনি বলেছেন , যেহেতু , ভারতীয় চিন্তাধারার সব মূল অংশ সংস্কৃত ভাষায় রচিত , সুতরাং সংস্কৃত চর্চার ব্যবস্থা রাখতে হবে পাঠ্যক্রমের মধ্যে । তাছাড়া , কর্ম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানসম্মত ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা পাঠ্যক্রমে রাখার কথা তিনি বলেছেন । তিনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার উন্নতিতে আস্থাবান ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানের মাধ্যমেই মনুষ্য জীবনের কর্মক্ষমতা ( Efficiency ) বাড়ানো যায় । তাই পাঠ্যক্রমে তিনি বিজ্ঞানকে অতি প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছেন । 

এছাড়া , ইতিহাস , ভূগোল , সাহিত্য ইত্যাদি পাঠের কথাও বলেছেন । তিনি তাঁর পাঠ্যক্রমের দ্বারা ভারতীয়দের একদিকে যেমন প্রাচীন ভারতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন , অন্যদিকে তাদের বিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়ে পাশ্চাত্ত্য দেশের কর্মক্ষমতার সমান অধিকারী করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন ।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা পদ্ধতি

বিবেকানন্দ শিক্ষার পদ্ধতি হিসেবে স্বয়ং শিক্ষাকে ( self – education ) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । “ No one was ever really taught by another . Each of us has to teach himself ” শিশু তার নিজের নিয়মেই বিকাশ লাভ করবে । তাকে জোর করে কিছু করানো যাবে না এবং তার এই বিকাশে সহয়তা করবে মনের কেন্দ্রীকরণ ( Concentration ) । যার মধ্যে এই ক্ষমতা যত বেশী হবে , সে তত জ্ঞান আহরণ করতে সক্ষম হবে । বিবেকানন্দ বলেছেন “ High achievements in arts , music etc. are the result of concentration . ” মনকে কেন্দ্রীভূত করে যে কোন বস্তুর উপর প্রয়োগ করতে পারলেই তাকে লাভ করা যাবে । 

প্রাচীন গ্রীক দর্শনে এরূপ বাহ্যিক কেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে । ভারতীয় যোগ দর্শনেও অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে । যেরূপই হোক না কেন কেন্দ্রীকরণ শিক্ষার পক্ষে একটি প্রয়োজনীয় কৌশল । এই কেন্দ্রীকরণ করার জন্য যে শক্তির দরকার , তা আসবে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে । তিনি বলেছেন , ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে জৈবিক শক্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় । ফলে , কেন্দ্রীকরণের জন্য অনেক শক্তি পাওয়া যায় । 

এছাড়া , শিক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি আত্মবিশ্বাসের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । অর্থাৎ , একত্রে বলা যায় , আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মনকে কেন্দ্রীভূত করে আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষা করাই হল শিক্ষার মূল পদ্ধতি । এছাড়া , তিনি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মনোবিদ্যার ( Science of Mind – psychology ) প্রয়োগের কথা বলেছেন— “ The utility of this science is to bring out the perfect man , and not let him wait and wait for ages , just as a plaything in the hands of the physical world , like a log of cheek food carried from wave to wave and tossing about in the oceans . ” তাই শিক্ষণ পদ্ধতিকে মনোবিদ্যা সম্মত করার কথা তিনি বিশেষভাবে বলেছেন ।  

বিবেকানন্দের শিক্ষালয় ও শিক্ষক সম্পর্কে ধারণা

বিবেকানন্দ শিক্ষার পরিবেশ হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার পরিবেশকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করেছেন । তিনি বলেছেন , গুরুগৃহে বাস করে গুরুর আদর্শ জীবন দ্বারা শিক্ষার্থীরা প্রভাবিত হবে । “ My idea of education is Gurugriha – vasa ; without the personal life of the teacher , there would be no education . ” এই কারণে তিনি শিক্ষকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । আগুন যেমন সব কিছুকে গ্লানিমুক্ত করে , তেমনি শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্রের প্রভাব শিশুর সবকিছু সংকীর্ণতাকে দূর করবে । তিনি বলেছেন— “ One should live from his boyhood with one whose character is a blazing fire and should have before him a living example of highest teaching . ” 

এছাড়া , বিবেকানন্দ নারীশিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । কারণ তিনি মনে করতেন মাতৃজাতির উন্নতি করতে পারলে সমগ্র ভারতবাসীর উন্নতি করা সম্ভব হবে । 

আলোচনা 

বিবেকানন্দের শিক্ষা চিন্তা তাঁর বলিষ্ঠ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতীক । তিনি যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভারতবাসীর শিক্ষা পরিকল্পনাকে রচনা করতে চেয়েছিলেন , তা যদি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হত , তাহলে তাঁর বিশ্বাসের ভারত যে গড়ে উঠতই সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি বিরাট একটি জাতিকে “ উত্তিষ্ঠত জাগ্রত ……. ” বলে আহ্বান করেছিলেন , সেই মনোবল যদি প্রয়োগ করতে পারতেন তাঁর শিক্ষা চিন্তার বাস্তব রূপায়ণে , তাহলে সমগ্র জাতিই যে জেগে উঠতো সে বিষয়ে সন্দেহ নেই । কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যু ভারতবাসীকে সেই ফললাভে বঞ্চিত করেছে । 

তাঁর শিক্ষা চিন্তার মধ্যে আমরা ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের উপাদান যেমন দেখতে পাই , তেমনি পাশ্চাত্ত্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞানেরও প্রয়োগ দেখতে পাই । তাঁর শিক্ষা চিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এই সমন্বয় ।

আরো পড়ুন : স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন

স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার

স্বামী বিবেকানন্দের অবদান আলোচনা করো

জাতীয়তাবাদের বিকাশে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান

নবভারত গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান

error: Content is protected !!