শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থা

শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থা 

রবীন্দ্রনাথ গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতা চিরদিন করে গেছেন । তাঁর নিজের শৈশব অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণা তাঁর মনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিল । তাই তাঁর শিক্ষা চিন্তাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করার জন্য ১৯০১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠা করেন । এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন— “ আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল যে , এখানকার এই প্রভাতের আলো , শ্যামল প্রান্তর , গাছপালা যেন শিশুদের চিত্ত স্পর্শ করতে পারে । কারণ , প্রকৃতির সাহচর্যে তরুণ চিত্তে আনন্দ সঞ্চারের দরকার আছে । এই উদ্দেশ্যে আমি আকাশ আলোর অঙ্কশায়ী উদার প্রান্তরে এই শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলুম । ” 

শান্তিনিকেতনের আদর্শ  

রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমিক শিক্ষার ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে এই বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । প্রাচীন আশ্রমিক শিক্ষার সব বৈশিষ্ট্যই এর মধ্যে আমরা দেখতে পাই । তিনি এখানে ব্রহ্মচর্যের তপস্যার কথা বলেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য । সরল ভারতীয় জীবন যাপনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন । এতে করে মনের উদারতা আসে । তাই তিনি বলেছেন— “ আয়োজনের কিছু অভাব থাকাই ভাল । অভ্যস্ত হওয়া চাই স্বল্পে — ” 

তাছাড়া গুরু শিষ্যের সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি , এখানে প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে । তিনি বলেছেন , পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই শিক্ষা হতে পারে , শিক্ষার্থী যেমন শ্রদ্ধার সঙ্গে জ্ঞান আহরণ করবে , তেমনি শিক্ষকও শ্রদ্ধার সঙ্গে জ্ঞান বিতরণ করবেন । তিনি বলেছেন , “ শ্রদ্ধার সঙ্গে দান করলেই শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব হয় । যেখানে সেই শ্রদ্ধার সম্পর্ক নেই , সেখানে আদান প্রদানের সম্বন্ধ কলুষিত হইয়া উঠে । ”  

বিশ্বভারতীর আদর্শ 

পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের এই বিদ্যালয়কে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয় ১৯২১ সালে । বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যের কথা তিনি ব্যক্ত করেছেন— “ প্রথমে আমি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপন করে এই উদ্দেশ্যে ছেলেদের এখানে এনেছিলুম যে , বিশ্বপ্রকৃতির উদারক্ষেত্রে আমি এদের মুক্তি দেব । কিন্তু ক্রমশ : আমার মনে হল যে , মানুষে মানুষে যে ভীষণ ব্যবধান আছে , তাকে অপসারিত করে মানুষকে সর্বমানবের বিরাট লোকে মুক্তি দিতে হবে । ” 

তিনি বিশ্বভারতীতে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্ত্য সংস্কৃতির সমন্বয়ের চেষ্টাই করেছেন । তিনি বলেছেন— “ যে আত্মীয়তা বিশ্বে বিস্তৃত হবার যোগ্য , সেই আত্মীয়তার আসন এখানে পাতব ।” “ যত্রাবিশ্বং ভরত্যেকনীড়ম্ ।” 

শিক্ষালয়ের বৈশিষ্ট্য 

রবীন্দ্রনাথের আশ্রমিক শিক্ষার মধ্যে আমরা যেসব বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই , সেগুলি হল– 

( ১ ) তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অবাধ স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছেন । শিক্ষার্থীদের নিজেদের ইচ্ছামত ঘুরে বেড়ানোর ও খেলাধূলা করার সুযোগ দেওয়া হত । রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় এক হাস্যকর কাহিনীর অবতারণা করে এই স্বাধীনতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন । এক অভিজ্ঞ শিক্ষক পড়াতে এলেন এবং কয়েকদিন সব দেখেশুনে রবীন্দ্রনাথকে বললেন— “ ছেলেরা গাছে চড়ে , চেঁচিয়ে কথা কয় , দৌড়ায় , এত ভাল নয় । ” রবীন্দ্রনাথ বললেন— “ দেখুন , আপনার বয়সে তো কখনও তারা গাছে চড়বে না । এখন একটু চড়তে দিন না । গাছ যখন ডালপালা মেলেছে , তখন সে মানুষকে ডাক দিচ্ছে । ওঁরা ওতে চড়ে থাকলেই বা । ” 

( ২ ) রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয়ের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল উন্মুক্ত প্রান্তরে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা । প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ রেখে মনের চর্চা করার কথা তাঁর শিক্ষাতত্ত্বে বলেছেন এবং তাই প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োগ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে । শ্রেণীকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বন্ধ করে রাখার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না । 

( ৩ ) এই বিদ্যালয়ে শিশুদের সৃজনমূলক কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সহপাঠ্যক্রমিক কাজের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । নানা ধরনের উৎসব পালন করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে । এ সবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব সৃজনাত্মক কাজের সুযোগ হবে ।

( ৪ ) এই বিদ্যালয়ে গতানুগতিক সময়তালিকার বিশেষ স্থান ছিল না । শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও বাধ্যবাধকতাহীন সামর্থ্য বিচারে তা নির্ধারণ করা হত । 

( ৫ ) শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখানে অনেক সহজ । পারস্পরিক ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা হত । শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে সহজ সম্পর্ক না গড়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক উঠলে শিক্ষা সম্ভব হবে না , রবীন্দ্রনাথ এই সম্পর্কে সচেতন ছিলেন । 

আলোচনা 

রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবনে যেমন বিভিন্ন কৃষ্টির সমন্বয় হয়েছিল এবং চিন্তাজগতেও যেমন বিভিন্ন দার্শনিক ভাবধারায় অপূর্ব সমন্বয় হয়েছিল , ঠিক তেমনি তাঁর শিক্ষা দর্শনের মধ্যেও আমরা বিভিন্ন ধারার সমাবেশ দেখতে পাই । তিনি প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার পদ্ধতি ও দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্ত্য জগতের যা কিছু ভাল , তার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে গেছেন । তিনি শুধুমাত্র ভারতীয় উপনিষদের জ্ঞানকে চরম হিসেবে বিবেচনা করেননি । তিনি জানতেন , আধুনিক যুগে বাঁচতে হলে ইউরোপীয় বিজ্ঞানের জ্ঞানের প্রয়োজন । তিনি তাই তাঁর শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় আদর্শের সঙ্গে পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সমন্বয় সাধন করতে চেয়েছেন । কি শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ণয়ে , কি তার পদ্ধতি নির্ণয়ে , কি তার পাঠ্যক্রম নির্ণয়ে — সর্বত্রই এই সমন্বয়ের ভাব আমরা দেখতে পাই । 

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জি রামচন্দ্রন ( G. Ramchandran ) রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তার সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই কথাই বলেছেন— “ Tagore wanted the boys and girls to be fearlesss , free and open minded , self – reliant , full of spirit of energy and self criticism , with their roots deep in the soil of India but reaching out to the whole world in understanding , neighbourliness , co – operation and material and spiritual progress . ” এখানেই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং তিনি শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মধ্যে তাঁর চিন্তাধারাকে কার্যকরী করার জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাধনা করে গিয়েছেন ।

আরো পড়ুন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শন

স্বদেশী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা

শান্তিনিকেতনের শিক্ষা ব্যবস্থা

error: Content is protected !!