রাসেলের মতে শিক্ষার প্রকৃতি

রাসেলের মতে শিক্ষার প্রকৃতি 

বার্ট্রান্ড রাসেল , শিক্ষাকে আত্মবিকাশের প্রক্রিয়া হিসাবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করলেও সব সময় সেই দৃষ্টিভঙ্গী বজায় রাখতে পারেননি । বিভিন্ন সময়ে তিনি শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার এমন কতকগুলি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন , যেগুলি তাঁর এই প্রাথমিক ধারণার বিরুদ্ধে যায় । পরিণত বয়সে তিনি বিশ্ব সমাজ স্থাপনের কথাই চিন্তা করছিলেন । তাই তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে , তিনি শিক্ষার প্রকৃতি কি হওয়া উচিত , সে বিষয়ে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন । এর থেকে বোঝা যায় , তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিশ্ব সমাজের নাগরিক হিসাবে চিন্তা করে , তার উপযোগী শিক্ষার প্রসঙ্গে চিন্তা করেছেন ।

প্রথমতঃ তিনি বলেছেন , শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠবে মানবতাবাদ ( Humanism ) এবং উপযোগিতাবাদের ( Utilitarian ) সংমিশ্রণে । অর্থাৎ , শিক্ষা শুধুমাত্র মানবীয় আদর্শের কথা চিন্তা করবে না । তা করলে , সামাজিক অগ্রগতি ব্যবহৃত হবে । শিক্ষার উপযোগিতার মূল্যকে যথাযোগ্য স্থান না দিলে , শিক্ষা কেবলমাত্র ব্যক্তির অলংকারে পরিণত হবে । সুতরাং , তাঁর মতে শিক্ষার মধ্যে উপযোগিতার উপাদান অবশ্যই থাকবে । তিনি বলেছেন— “ The humanistic element in education must remain but , they must be simplified to leave room for the other elements without which the new world rendered possible by science can never be created ” 1 

দ্বিতীয়তঃ রাসেল বলেছেন , শিক্ষা নিজেই কোন লক্ষ্য নয় । আমরা সংকীর্ণ অর্থে শিক্ষাকেই জীবনের লক্ষ্য হিসাবে বিবেচনা করি । আমরা বলি , —শিশুকে শিক্ষা দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য । কিন্তু , রাসেল এই মত বিশ্বাস করেন না । তিনি বলেছেন , শিক্ষা একটি উপায় ( Means ) মাত্র । তাঁর মতে , শিক্ষার সহায়তায় , ব্যক্তি তার জীবনের একটি লক্ষ্যে উপনীত হয় । অর্থাৎ তাঁর ধাঁরণা অনুযায়ী শিক্ষা জীবনের লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার উপায় মাত্র ( Education is a means to an end ) ।

তৃতীয়তঃ শিক্ষার প্রকৃতি নির্ধারণে বার্ট্রান্ড রাসেল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ধারার মধ্যে সমন্বয় করেছেন অভিনব ভাবে । তিনি যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করেছেন , ব্যক্তি কেন্দ্রিক শিক্ষা ( Individualistic Education ) এবং নাগরিকতার শিক্ষার ( Education for citizenship ) প্রকৃতিগত পার্থক্য আছে । তাই এদের মধ্যে কোন প্রকৃতির শিক্ষা আমাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে , তা যুক্তির দ্বারা নির্ধারণ করতে হবে । তিনি বলেছেন— “ The cultivation of the individual mind is not , on face of it the same thing as the production of a useful citizen . ”

তবে তিনি এই দু’ধরনের শিক্ষার মধ্যে নাগরিকতার শিক্ষাকেই নির্বাচন করেছেন । তিনি বলেছেন , আধুনিক মানুষের চাহিদার কথা চিন্তা করে , তার জন্য বিশ্বনাগরিকতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে । অর্থাৎ , তাঁর মতে শিক্ষার উপাদান হবে বিশ্ব রাষ্ট্রের নাগরিকতা প্রশিক্ষণের উপযোগী । তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বনাগরিকতার প্রশিক্ষণের গুরুত্ব দিয়ে , ব্যক্তিগত শিক্ষাকেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন । অর্থাৎ , বিশ্ব নাগরিকতার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যাবলীর বিকাশ সম্ভব হবে , এই বিশ্বাস তাঁর ছিল । এই ব্যাপক তাৎপর্যে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন ।

এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন — “ The most vital need of the near future will be the cultivation of a vivid sense of citizenship of the world . Onece the world as a single economic and political unit has become secure , it will be possible for individual culture to revive . ” অর্থাৎ , শিক্ষাকে এমন এক প্রক্রিয়া হিসাবে বিবেচনা করেছেন , যার মধ্যে নাগরিকতার প্রশিক্ষণকে সম্পূর্ণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক উন্নতি প্রত্যাশা করা যাবে ।

আরো পড়ুন : বার্ট্রান্ড রাসেলের শিক্ষা দর্শন

বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে শিক্ষার পাঠ্যক্রম

বার্ট্রান্ড রাসেলের শিক্ষা পদ্ধতি

বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে শিক্ষার লক্ষ্য

রাসেলের মতে শিক্ষার প্রকৃতি

error: Content is protected !!