রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রভাবক ও নিয়ন্ত্রক

রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রভাবক ও নিয়ন্ত্রক

পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তন নানা শর্ত সাপেক্ষে ঘটে । রাসায়নিক পরিবর্তনকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে এমন কয়েকটি বিষয় নীচে আলোচনা করা হল : 

সংস্পর্শ বা প্রত্যক্ষ সংযোগ  

কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক পদার্থের সাথে অন্য পদার্থের সংযোগ ঘটলেই রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে । যেমন— 

( i ) সাদা ফসফরাস এবং আয়োডিন পরস্পর স্পর্শ করলেই আগুন ধরে যায় এবং রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে ফসফরাস ট্রাই আয়োডাইড নামে নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয় । 

2P + 3I2 = 2PI3

( ii ) চুন বা ক্যালসিয়াম অক্সাইডে জল ঢাললেই হিস হিস শব্দ হয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় । এর ফলে জল ফুটতে থাকে , চুনের রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং কলিচুন বা ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড উৎপন্ন হয় । 

CaO + H2O = Ca(OH)2

( iii ) চিনির ( C12H22O11 ) সঙ্গে গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিড যোগ করলে চিনির রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট কালো কার্বন উৎপন্ন হয় । 

C12H22O11 + H2SO4 = 12C + 11H2O + H2SO4

তাপ

তাপ প্রয়োগের ফলে অনেক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে বা পরিবর্তন দ্রুততর হয় । যেমন— 

( i ) সাধারণ উষ্ণতায় চুনাপাথর বা ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কিছু হয় না , কিন্তু উত্তপ্ত করলে এটি ভেঙে গিয়ে চুন বা ক্যালসিয়াম অক্সাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে । 

Caco3 ⟶ CaO + CO2

( ii ) চকচকে পারদকে বাতাসের মধ্যে উত্তপ্ত করলে লাল রঙের মারকিউরিক অক্সাইড উৎপন্ন হয় । 

2Hg + O2 = 2HgO 

( iii ) চিনিকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত করলে এটি কালো কার্বনে পরিণত হয় ।

C12H22O11 ⟶ 12C + 11H2

চাপ

চাপ প্রয়োগের ফলেও অনেক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে । যেমন—

( i ) উত্তপ্ত সিসা চূর্ণ ও গ্যাসীয় সালফার বা গন্ধকের মিশ্রণে উচ্চচাপ প্রয়োগ করলে লেড সালফাইড উৎপন্ন হয় ।

Pb + S = PbS 

( ii ) নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেন গ্যাস অতি উচ্চচাপে ও উষ্ণতায় রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায় এবং অ্যামোনিয়া উৎপন্ন করে । 

N2 + 3H2 = 2NH3 

( iii ) পটাসিয়াম ক্লোরেট ও আর্সেনিক সালফাইডের মিশ্রণের উপর জোর চাপ দিলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয় এবং পদার্থগুলির রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে । এইভাবে ভুঁই পটকা তৈরি করা হয় ।

অনুঘটন ও অনুঘটক 

বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বিভিন্ন রকম হয় । যেমন — লোহায় মরচে ধরা একটি ধীর গতির রাসায়নিক বিক্রিয়া । আবার সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের প্রশমন ক্রিয়া অতিদ্রুত গতিতে হয় । কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে । যেমন — বিক্রিয়কগুলির প্রকৃতি , উষ্ণতা , গাঢ়তা , বিক্রিয়কগুলির পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বিকিরণ বা কোনো পদার্থের উপস্থিতি । 

অনেক সময় দেখা যায় যে কোনো একটি বিশেষ পদার্থ উপস্থিত থাকলেই রাসায়নিক পরিবর্তনের বেগ বাড়ে অথচ বিক্রিয়ার শেষে ওই বিশেষ পদার্থটির কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন হয় না । যে সব পদার্থ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় অথচ বিক্রিয়ার শেষে নিজে অপরিবর্তিত থাকে তাকে অনুঘটক বলে ।

অনুঘটকের উপস্থিতিতে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বাড়ানোর ঘটনাকে অনুঘটন বলে । 

পটাসিয়াম ক্লোরেটকে উত্তপ্ত করলে 630°C উষ্ণতায় যৌগটি ধীরে ধীরে বিয়োজিত হয়ে পটাসিয়াম ক্লোরাইড ও অক্সিজেন গ্যাস উৎপন্ন করে । কিন্তু পটাসিয়াম ক্লোরেটের সাথে সামান্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড ( MnO2 ) মিশিয়ে উত্তপ্ত করলে অনেক কম উষ্ণতায় ( 200°C – 240°C ) এবং অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে অক্সিজেন উৎপন্ন হয় এবং বিক্রিয়া শেষে MnO2 অপরিবর্তিত থাকে । 

2KCIO3 + [ MnO2 ] = 2KCl + 3O2 + [ MnO2 ]

সুতরাং এখানে MnO2 একটি অনুঘটক ।

error: Content is protected !!