কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষার লক্ষ্য পাঠ্যক্রম ও শিক্ষালয়

কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষার লক্ষ্য পাঠ্যক্রম ও শিক্ষালয় 

মার্কস ( Marx ) এবং এঙ্গেলস ( Engels ) সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু পূর্বে তাদের সামাজিক আদর্শ গঠন করেন । তাঁরা এই মতবাদ গঠনে ঐতিহাসিক উপাদানগুলিকে বিশ্লেষণ করেন এবং তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা রচনা করেন । শিক্ষার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা মার্কস এর মূল মতবাদের এই ব্যবহারিক দিকগুলির কথা আলোচনা করব ।

কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষার লক্ষ্য

মার্কসীয় ধারণা অনুযায়ী শিক্ষার লক্ষ্য হল — রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা সমাজ ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা এবং শ্রেণীহীন সমাজ গঠনে সহায়তা করা । এই মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি , তাদের জাতীয় শিক্ষার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন , সেগুলিকেই , আধুনিক কালে মার্কসীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে । মার্কসীয় ধারণায় শিক্ষার এই ব্যবহারিক লক্ষ্যগুলি হল  নিম্নরূপ— 

( ১ ) সমাজ জীবনের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োজনীয় জ্ঞান ( Knowledge ) আহরণে ব্যক্তিকে সহায়তা করা এই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য । 

( ২ ) সমাজের উৎপাদনমুখী বৃত্তি সমূহে পরিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে ব্যক্তিকে সহায়তা করা , এই শিক্ষার আর একটি লক্ষ্য । 

( ৩ ) শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য অভ্যাস গঠনের প্রশিক্ষণ দেওয়া শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য । এছাড়া আরো কতকগুলি শিক্ষার লক্ষ্যের কথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বলা হয়ে থাকে ।

( ৪ ) সমাজের সম্পত্তির প্রতি যত্নবান হওয়ার মনোভাব জাগ্রত করা ; 

( ৫ ) শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং 

( ৬ ) যে কোন রকম কাজে উৎসাহিত করে তোলা , এবং শিক্ষার্থীদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করা । 

শিক্ষার এই লক্ষ্যগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় , এগুলির মাধ্যমে সামাজিক কাঠামো দৃঢ় করার চেষ্টা হয়েছে । অর্থাৎ , সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে , শিক্ষার লক্ষ্যগুলি , সামগ্রিকভাবে সমাজ জীবনের উন্নতির কথা চিন্তা করে নির্ধারিত হয়েছে । তবে ব্যক্তির বিকাশকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়নি । এখানে ব্যক্তি বলতে সমাজের নির্বাচিত কোন একককে বুঝায় না । সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তি এবং সমাজ একাকার হয়ে গেছে । এখানে একক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব খুঁজে বের করার কোন অবকাশ নেই । 

কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষার পাঠ্যক্রম

পূর্বোক্ত উদ্দেশ্যগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী রাষ্ট্রগুলিতে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যক্রম রচনা করা হয়েছে । এই পাঠ্যক্রমের সাধারণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যগুলি হল ─

প্রথমত : শিক্ষার সর্বস্তরে পাঠ্যক্রমে , মার্কসীয় দর্শনের পাঠকে আবশ্যিক করা হয়েছে । যেহেতু এই নীতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক দল ( Party ) নিয়ন্ত্রণ করে থাকে , সেহেতু পাঠ্যক্রমের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ও দেশের পুনর্গঠনে তার ভূমিকা কি , সে বিষয়ে পাঠের ব্যবস্থা থাকবে । এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক চেতনা বৃদ্ধি পাবে । 

দ্বিতীয়ত : শিক্ষার্থীদের শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ জাগ্রত করার জন্য পাঠ্যক্রমে বাস্তব কর্ম অভিজ্ঞতা ( Work experience ) দানের ব্যবস্থা আছে । মার্কসীয় দর্শনে শিক্ষাকেও উৎপাদন শক্তি ( Production force ) হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে । তাই সমাজের প্রয়োজনীয়তা শিক্ষা উৎপাদনমুখী হওয়া উচিত । শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষাকে উৎপাদনমুখী করতে , এই কর্ম অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে সহায়তা করেছে । উচ্চবর্তী পাঠ্যক্রমে , এই অংশে দক্ষতা বৃদ্ধির উপর ( Skill development ) গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । 

তৃতীয়ত : শিক্ষার্থীদের সামাজিক দিক থেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ( Knowledge ) আহরণে সহায়তা করার জন্য পাঠ্যক্রমে গণিত ( Mathematics ) , বিজ্ঞান ( Science ) , ভূগোল ( Geography ) , জীববিদ্যা ( Biology ) , ভূবিজ্ঞান ( Geology ) , জ্যোতির্বিজ্ঞান ( Astronomy ) ইত্যাদি পাঠের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । 

চতুর্থত : শিক্ষার প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে কেবলম মাত্র মাতৃভাষা শিক্ষার কথা বলা হয়েছে । মাধ্যমিক স্তরে , বিদেশী ভাষা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে । 

পঞ্চমত : শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য এবং জ্ঞানের প্রতি স্পৃহা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে শিক্ষার সর্বস্তরে পাঠ্যক্রমের মধ্যে যৌথ কাজ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে । এইসব কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গী জাগ্রত করার সুযোগ আছে । খেলাধূলা , অভিনয় ইত্যাদির মত কাজগুলি যৌথ কাজের অন্তর্ভুক্ত করে , পাঠ্যক্রমে সেগুলিকে আবশ্যিক করা হয়েছে । 

ষষ্ঠত : শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যক্রমে বিশুদ্ধ শারীর শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে । 

সবশেষে , শিক্ষার্থীদের সৃজন ক্ষমতা বিকাশের উদ্দেশ্যে এবং সামাজিক কৃষ্টির ধারা বজায় রাখতে ও তার উন্নতির উদ্দেশ্যে সৃজনমূলক কাজে অংশগ্রহণকে পাঠ্যক্রমে আবশ্যিক করা হয়েছে । সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির শিক্ষাস্তরের পাঠ্যক্রমের পূর্বোক্ত সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় , শিক্ষার মাধ্যমে মূলতঃ তিনটি দিকের প্রশিক্ষণের কথা ভাবা হয়েছে — মানসিক শিক্ষা ( Mental education ) , দৈহিক বিকাশ ( Bodily education ) এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির শিক্ষা ( Education of skill ) । 

এই তিনটি দিকের মধ্যে সর্বশেষটিকে শিক্ষাক্রমের কেন্দ্র বিন্দু হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে । কারণ , তার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে । মার্কসীয় শিক্ষায় এই কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির শিক্ষার উপর গুরুত্বই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য । মার্কস এই কর্মদক্ষতা বিকাশের উপর গুরুত্ব সম্পন্ন পাঠ্যক্রমের উপযোগিতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— “ This education in case of every child over a given age , combine productive labour with instruction any gymnastics , not only as one methods of adding to efficience of production , but as the only method of producing fully developed human beings . ” 

কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষালয় 

মার্কসীয় শিক্ষাদর্শ , শিক্ষার উপর রাষ্ট্রের বা সমাজের নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী । কারণ , শিক্ষা যেহেতু সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার , সেহেতু সমাজ বা রাষ্ট্রই তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে । এই অর্থে শিক্ষার প্রধান সংস্থা ( Agency of education ) হল রাষ্ট্র ( State ) । এ ব্যাপারে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির ধারণা অত্যন্ত স্পষ্ট । লেনিন ( Lenin ) সোভিয়েত রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃতি কিরূপ হবে , সে সম্পকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন— “ Our object in the filed of school system is the same struggle for overthrow of the bourgeoisie ; we openly declare that a school outside life , outside politics is a lie and hipocracy . ” 

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিদ্যালয়গুলি ( Schools ) শিক্ষার কার্যকরী সংস্থা হলেও , তাদের সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে । এখানেই মার্কসীয় আদর্শে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয়ের সঙ্গে অন্য দেশের শিক্ষালয়ের পার্থক্য । রাষ্ট্র , শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে বলে , বিদ্যালয়ের কর্ম প্রকৃতিও সুনিয়ন্ত্রিত হয় । যেমন সোভিয়েত রাশিয়ায় রাষ্ট্রের পরিচালনায় দেশের প্রত্যেক অঞ্চলে নার্শারি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে । এই বিদ্যালয়গুলিতে গৃহের ( Home ) মত সমস্তরকম সুযোগ সুবিধা আছে । তাছাড়া রাষ্ট্রের মার্কসীয় প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত স্তরের শিক্ষালয়গুলি দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে । আদর্শ অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলির নিজস্ব কতকগুলি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে । যেমন— 

( ১ ) একই শিক্ষাস্তরের বিদ্যালয়গুলির মধ্যে পারস্পরিক কোন পার্থক্য থাকবে না । সমাজের প্রত্যেক সদস্য যাতে একই রকম শিক্ষার সুযোগ পায় , তার জন্য এই ব্যবস্থা । 

( ২ ) শিক্ষালয়গুলিতে একই ধরনের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয় । এর ফলে , রাষ্ট্রের অন্তর্গত একই বয়সের শিশুরা সকলেই একই রকম শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায় । 

( ৩ ) সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে শিক্ষালয়ের মাধ্যমে ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষাদানের ( Secular education ) ব্যবস্থা করা হয় । 

( ৪ ) উপযুক্ত নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার সমস্ত স্তরের শিক্ষালয়গুলিতে সহশিক্ষার ( Co – education ) ব্যবস্থা রাখা হয় । এর থেকে বুঝা যায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারীদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয় । 

( ৫ ) শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাকেই শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করা হয় । এর কারণ , মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব । 

( ৬ ) শিক্ষালয়গুলিতে শৃঙ্খলা স্থাপনের উপর খুবই গুরুত্ব আরোপ করা হয় । কারণ , ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা , সামাজিক শৃঙ্খলায় রূপান্তরিত হয় । সুযোগের সমতা বজায় রাখাই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শিক্ষালয় পরিচালনার মূলনীতি । অবশ্য প্রত্যেক দেশেই শিক্ষার একটি বিশেষ স্তরের পর বহুমুখী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে । 

আলোচনা 

মার্কসীয় শিক্ষাদর্শনের ভিত্তিতে রচিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের মধ্যে অনেক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সহায়তা করে । অনেক চিন্তাবিদ , মার্কসীয় শিক্ষাদর্শনকে তার অত্যধিক বস্তুধর্মিতার জন্য সমালোচনা করেছেন । কিন্তু বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে আমরা তার এমন অনেক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই , যা সব সময় গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নেই । মার্কসীয় ধারণা অনুযায়ী রচিত শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নলিখিত সুবিধা আছে— 

( ১ ) এই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যদিয়ে সমাজে অন্তর্গত সকল মানুষকে , শিক্ষার ব্যাপারে সমান সুযোগ দেওয়া যায় । 

( ২ ) যেহেতু এই ব্যবস্থায় , শিক্ষার সমস্ত দায়িত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের উপর থাকে , সেহেতু এই ব্যবস্থায় , শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে অবৈতনিক করা সম্ভব হয়েছে । রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে , শিক্ষাকে আবশ্যিক ( Compulsory education ) করাও সহজ হয়েছে । 

( ৩ ) মার্কসীয় দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তির নানাধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিকাশে বিশেষভাবে সহায়তা করে । এই শিক্ষার আদর্শ ও পরিচালন পদ্ধতির দরুন , শিশুদের মধ্যে শ্রমের প্রতি মর্যাদাবোধ , কর্মমনস্কতা , বয়স্কদের শ্রদ্ধাভাব এবং সর্বোপরি মার্কসীয় আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় । 

( ৪ ) মার্কসীয় শিক্ষাদর্শ ব্যক্তির মধ্যে জাতীয়তাবোধ সঞ্চারে বিশেষভাবে সহায়তা করে । এইসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মার্কসীয় দর্শন ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা যে সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন একথা বলা যায় না । বিভিন্ন চিন্তাবিদই শিক্ষানীতির সমালোচনা নানা দিক থেকে করেছেন । তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবেশ না করে , মার্কসীয় শিক্ষাদর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগগত কিছু ত্রুটির কয়েকটি দিকের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে । 

প্রথমত : এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় , এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তনের কোন সুযোগ থাকবে না । ফলে অনেকক্ষেত্রে শিক্ষা স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে । 

দ্বিতীয়ত : অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষকের নিজস্ব মত প্রকাশের কোন সুযোগ এই শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকে না— শিক্ষণের কাজ সম্পূর্ণভাবে যান্ত্রিক ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে । শিক্ষক পদ্ধতি , মূল্যায়ন , বস্তুবিন্যাস ইত্যাদি ব্যাপারে তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করতে পারেন না । 

তৃতীয়ত : এই শিক্ষা ব্যবস্থায় , উৎপাদনমূলক দক্ষতা বিকাশের উপর মাত্রাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় । আর এই কারণে , শিক্ষার্থীর সৃজনাত্মক ক্ষমতাগুলিকে অবহেলা করা হয় । এর ফলে , শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ ব্যক্তি সত্তা বিকাশের সুযোগ হয় না । 

চতুর্থত : মার্কসীয় শিক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে রচিত শিক্ষা ব্যবস্থায় , মার্কসীয় সমাজাদর্শ পাঠের উপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় । অর্থাৎ , এর মধ্যে মার্কসীয় দর্শনে দীক্ষিত করার উদ্দেশ্য অত্যন্ত প্রকট । এই প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার অভিব্যক্তি ব্যাহত হয় । অবশ্য মার্কসীয় মতবাদের ভিত্তিতে এই ত্রুটিগুলিকে বিচার করলে বলা যায় , এগুলি আদৌ ত্রুটি নয় । কারণ এর মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলি ইচ্ছকৃত ভাবেই সংযোজিত করা হয়েছে মার্কসীয় নীতি অনুসরণ করে । সুতরাং কোন শিক্ষা ব্যবস্থা ভাল বা খারাপ তা বিচার করা উচিত , যে নীতির উপর সে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত তার মূল্য বিচারে । 

আধুনিক বিশ্বে মার্কসীয় দর্শন এক সংকটকালের মধ্যে উপস্থিত হয়েছে । মার্কসীয় শিক্ষা দর্শনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এই সংকটকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর । বর্তমান , পরিস্থিতিতে তার সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা উচিত হবে না । বাস্তবে বর্তমান বিশ্বে যে অনিশ্চিত অবস্থা চলছে , তাতে কোন শিক্ষানীতিরই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু সঠিকভাবে বলা যায় না । 

শিক্ষাবিগণ শিক্ষার বিবর্তনের ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে তাই বলেছেন— বর্তমান বিশ্বে প্রত্যেক দেশের চিন্তাবিদগণই শিক্ষার ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে চিন্তিত । তাঁর কেউই বর্তমান ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট নন ; কিন্তু কি হওয়া উচিত , সে ব্যাপারেও কোন সঠিক দিক নির্ণয় করতে পারছেন না । তবে যে দিকেই শিক্ষার উত্তরণ হোক না কেন , মার্কসীয় শিক্ষা দর্শনের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি তাদের যোগ্য স্থান করে নেবে । তা স্ব নামে হোক বা ভিন্ন নামেই হোক ।

আরো পড়ুন : কার্ল মার্কসের মতে শিক্ষার লক্ষ্য পাঠ্যক্রম ও শিক্ষালয়

মার্কসীয় শিক্ষা তত্ত্ব

কার্ল মার্কসের সমাজ দর্শন

মার্কসবাদের উৎস

মার্কসবাদ কি

error: Content is protected !!