রাষ্ট্র বিজ্ঞান

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির সম্পর্ক

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির সম্পর্ক

প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের যুগ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর চিন্তাবীদদের সময় পর্যন্ত অর্থনীতিকে একটি পৃথক শাস্ত্র হিসাবে গণ্য করা হত না । গ্রীক , দার্শনিকগণ একে রাষ্ট্রনৈতিক অর্থবিদ্যা ( Political Economy ) হিসাবে অভিহিত করেছেন । তাদের ধারণায় পারিবারিক অর্থ ব্যবস্থার মতোই রাষ্ট্রের এক অর্থ ব্যবস্থা আছে । রাষ্ট্র এই অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করে । তারা মনে করতেন , অর্থনীতি বা রাষ্ট্রনৈতিক অর্থ ব্যবস্থা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য শাখা মাত্র । 

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই মতবাদই বিশেষভাবে চালু ছিল । ঐ মতের পিছনে এই যুক্তি ছিল যে , রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয় , এবং বৈদেশিক আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হয় বলে রাষ্ট্রের রাজস্বের প্রয়োজন হয় । অতএব অর্থনীতির আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধির বিভিন্ন উপায় । এইজন্য আগে অর্থনীতিকে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থা বলে অভিহিত করা হত । 

অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য দুইটি ; যথা – 

( ক ) শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য রাজস্ব আদায় করার নীতি নির্ধারণ করা ; 

( খ ) জনসাধারণের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য যাতে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করা যায় তার বিবিধ উপায় নির্ধারণ করা । 

সংক্ষেপে বলা যায় , রাষ্ট্র ও জনসাধারণকে ধনশালী করে তোলাই হল অর্থবিদ্যার প্রধান লক্ষ্য ।

উপরি উক্ত ধারণাগুলি বর্তমানে বিশেষভাবে পরিবর্তিত হয়েছে । বর্তমানে অর্থনীতির আলোচনা ক্ষেত্রের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক । এই শাস্ত্রের আলোচনা রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না । বর্তমানে অর্থনীতি অর্থ ব্যবস্থাপনা , উৎপাদন , ভোগ , সঞ্চয় , বিনিময় ও বণ্টন সংক্রান্ত সমস্যা নিয়েই আলোচনা করে । অর্থনীতির এই সমস্ত বিষয়ের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের সুবিধার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিকে পৃথকভাবে আলোচনা করা হয় । 

অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পৃথকভাবে আলোচিত হলেও এরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্ক যুক্ত । এই দুই শাস্ত্রই মানুষের সমাজ জীবনের কাজ কারবার নিয়ে আলোচনা করে । আবার উভয়েরই লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ সাধন করা । রাষ্ট্রবিজ্ঞান দেশের শান্তি রক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্বন্ধে আলোচনা করে । দেশের ধন উৎপাদন ব্যবস্থা দেশের শান্তি রক্ষার উপর অনেক পরিমাণে নির্ভরশীল । আবার ধন উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে দেশের শান্তি । কারণ অর্থের বণ্টন ব্যবস্থায় অসাম্য দেখা দিলে অন্তর বিপ্লব হবার সম্ভাবনা থাকে । ধন উৎপাদন ব্যাহত হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ।

অতএব দেখা যায় , রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়বস্তু যেমন অর্থনীতির আলোচনার অন্তর্ভুক্ত বিষয়বস্তুকে  প্রভাবিত করে , তেমনি অর্থনীতির আলোচ্য বিষয়ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়কে প্রভাবিত করে । সুতরাং উভয়ই বিশেষভাবে সম্পর্কিত । আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য বিষয় রাষ্ট্র । পূর্বে ছিল পলিস রাষ্ট্র । রাষ্ট্রের প্রধান কাজ ছিল শান্তিরক্ষা করা । অতএব অর্থনীতির সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিল না । 

কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্র হল কল্যাণকর রাষ্ট্র । এই কল্যাণকর রাষ্ট্র সমাজের সঠিক উন্নতি বিধান করে । রাষ্ট্র আজ নিজেই ব্যবসা করে , ধন উৎপাদন ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে । এই রাষ্ট্রের আলোচনা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞান একদিকে করধার্য করে কিভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় , তারও আলোচনা করে । এছাড়া আর্থিক অবস্থা ও শাসন ব্যবস্থার সুবিধার্থে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের মৌলিক তত্ত্ব আলোচনা করে । 

অতএব দেখা যায় , অর্থনীতির বিষয়বস্তু রাষ্ট্রের কার্যকলাপ ও তার নীতি নির্ধারণে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে । ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আলোচিত সমভোগবাদ , সাম্যবাদ , সমাজতন্ত্রবাদ প্রভৃতি অর্থনীতিরও আলোচনার বিষয় হয় । উপসংহারে বলা যায় , এই দুই শাস্ত্রের মধ্যে প্রভৃতি পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ।

error: Content is protected !!