এক্স রশ্মি কাকে বলে

Contents

এক্স রশ্মি কাকে বলে 

তীব্র গতিবেগ সম্পন্ন ইলেকট্রন উচ্চ গলনাঙ্ক বিশিষ্ট কোনো কঠিন বস্তুকে আঘাত করলে উচ্চ ভেদন শক্তির এবং ক্ষুদ্রতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের যে অদৃশ্য তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ কঠিন বস্তু থেকে নির্গত হয় , তাকে এক্স রশ্মি বলে । 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , পরমাণুর এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে কক্ষীয় ইলেকট্রনের সংক্রমণের জন্য এক্স রশ্মি নিঃসৃত হয় ।

এক্স রশ্মির প্রকৃতি 

প্রকৃতিতে এক্স রশ্মি তরঙ্গধর্মী । সাধারণ আলোর মতো এক্স রশ্মি তির্যক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ । এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সাধারণ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে অনেক কম । 

এক্স রশ্মির ধর্ম 

i. এক্স রশ্মি অদৃশ্য এবং সাধারণ আলোর মতো তির্যক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ । 

ii. এক্স রশ্মি সরলরেখায় আলোর বেগে চলে । শূন্য মাধ্যমে এক্স রশ্মির বেগ 3 x 108 মি/সেকেন্ড । 

iii. এক্স রশ্মি তড়িৎক্ষেত্র এবং চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় না । এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে , এক্স রশ্মি তড়িৎ গ্রস্ত কণা নয় । 

iv. গ্যাসের মধ্য দিয়ে গেলে এক্স রশ্মি গ্যাসকে আয়নিত করতে পারে ।

v. এক্স রশ্মি ফোটোগ্রাফিক প্লেটে বিক্রিয়া ঘটায় । 

vi. এক্স রশ্মি জিঙ্ক সালফাইড , বেরিয়াম প্ল্যাটিনা সায়ানাইড , ক্যালশিয়াম টাংস্টেট প্রভৃতি পদার্থের ওপর পড়ে প্রতিপ্রভার সৃষ্টি করে । 

vii. এক্স রশ্মি কতকগুলি বিশেষ ধাতুর ওপর পড়লে ওই ধাতুগুলি থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয় । এই ঘটনাকে আলোক তড়িৎ ক্রিয়া বলে । 

viii. সাধারণ আলোর মতো এক্স রশ্মির প্রতিফলন , প্রতিসরণ প্রভৃতি হয় । কিন্তু এক্স রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুব ক্ষুদ্র বলে সাধারণভাবে এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করা যায় না । 

ix. এক্স রশ্মি জীবন্ত কোশ ধ্বংস করতে পারে । 

x. সাধারণ আলোর ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ এরূপ অনেক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে এক্স রশ্মি সহজে যেতে পারে । 

xi. এক্স রশ্মি কেলাসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিচ্ছুরিত হয় । 

xii. অধিক ঘনত্ব এবং অধিক পারমাণবিক গুরুত্ব বিশিষ্ট পদার্থ দ্বারা এক্স রশ্মি বেশি শোষিত হয় । 

xiii. এক্স রশ্মি চোখে দর্শনের অনুভূতি জাগায় না । 

এক্স রশ্মির ব্যবহার 

বর্তমানে এক্স রশ্মি নানা কাজে ব্যবহৃত হয় । 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক্স রশ্মির ব্যবহার : 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে এবং নিরাময়ে এক্স রশ্মি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় । এক্স রশ্মি দেহের মাংস ভেদ করতে পারে , কিন্তু হাড় ভেদ করতে পারে না । এক্স রশ্মি ফোটোগ্রাফিক প্লেটকে প্রভাবিত করতে পারে । এই দুই ধর্মের প্রয়োগে দেহের ভিতরের বিভিন্ন অংশের রেডিওগ্রাফ করতে এক্স রশ্মি ব্যবহার করা হয় । দেহের কোনো অংশের হাড় ভেঙে গেলে ভাঙা হাড়ের অবস্থান , দেহের ভিতরে কোনো অবাঞ্ছিত বস্তু থাকলে তার অস্তিত্ব , কিডনি বা গলব্লাডারে পাথর হলে তার অস্তিত্ব , আলসার এবং টিউমারের অস্তিত্ব জানার জন্য এক্স রশ্মি ব্যবহার করা হয় । 

এক্স রশ্মি জীবিত কোশকে ধ্বংস করে — এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে এক্স রশ্মির সাহায্যে ক্যানসার , টিউমার , চর্মরোগ প্রভৃতি রোগের চিকিৎসা করা হয় ।

শিল্প ক্ষেত্রে এক্স রশ্মির ব্যবহার : 

কড়ি , বরগা , লোহার বিম , কারখানার বয়লার প্রভৃতির ভিতরে সূক্ষ্ম চিড় বা ফাঁক আছে কি না পরীক্ষা করতে এক্স রশ্মি ব্যবহৃত হয় । আসল হীরে ও নকল হীরের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে এবং বিভিন্ন আকরিকের মধ্যে অপদ্রব্যের উপস্থিতি জানতে এক্স রশ্মি ব্যবহার করা হয় । 

অপরাধ দমনে এক্স রশ্মির ব্যবহার : 

বিভিন্ন দ্রব্যাদির বা দেহের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ বস্তু বা দামী রত্ন ইত্যাদি লুকিয়ে রাখলে এক্স রশ্মির সাহায্যে তা সহজে ধরা যায় । শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগ তদন্তের কাজে এরূপে এক্স রশ্মি ব্যবহার করে থাকে । 

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এক্স রশ্মির ব্যবহার : 

বিভিন্ন কেলাসের এবং অণু পরমাণুর গঠন সংক্রান্ত গবেষণায় এক্স রশ্মি ব্যবহৃত হয় ।

এক্স রশ্মি কি নিস্তড়িত 

দুটি বিপরীত তড়িৎ গ্রস্ত ধাতব পাতের ফাঁকের মধ্য দিয়ে এক্স রশ্মি পাঠালে দেখা যায় — এক্স রশ্মির কোনো বিক্ষেপ হয় না । এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে , এক্স রশ্মি আহিত কণার সমবায়ে গঠিত নয় । কারণ , এক্স রশ্মি আহিত কণার সমষ্টি হলে যে কোনো একটি ধাতব পাতের দিকে তার গতিপথ বেঁকে যেত ।

ফটোগ্রাফিক প্লেটে ভাঙা হাড়ের ছবি ওঠে কেন

এক্স রশ্মি দেহের মাংস ভেদ করে যেতে পারে , কিন্তু হাড় ভেদ করতে পারে না । এক্স রশ্মি ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর ক্রিয়া করে । সুতরাং , এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা এবং ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর ক্রিয়া — এই দুই ধর্মের জন্য ফটোগ্রাফিক প্লেটে ভাঙা হাড়ের ছবি তোলা যায় । 

কোমল এক্স রশ্মি কাকে বলে

কম ভেদন ক্ষমতা বিশিষ্ট এবং অপেক্ষাকৃত বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মিকে কোমল এক্স রশ্মি বলে । 

কঠিন এক্স রশ্মি কাকে বলে

অধিক ভেদন ক্ষমতা বিশিষ্ট এবং অপেক্ষাকৃত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মিকে কঠিন এক্স রশ্মি বলে ।

এক্স রশ্মিতে বস্তু দৃশ্যমান  হয় না কেন

সাধারণ আলো কোনো বস্তুর ওপর পড়লে বস্তু দৃশ্যমান হয় , কিন্তু এক্স রশ্মি পড়লে বস্তু দৃশ্যমান হয় না । কারণ , সাধারণ আলোক রশ্মি কোনো বস্তুর ওপর পড়লে ওই আলোক রশ্মির বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন হয় । ফলে বস্তুটিকে দেখা যায় । কিন্তু ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মি কোনো বস্তুর ওপর পড়লে ওই রশ্মির বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন হয় না , রশ্মি বস্তুটিকে ভেদ করে চলে যায় , অথবা বস্তুটি দ্বারা শোষিত হয় । তাই , এক্স রশ্মি বস্তুর ওপর পড়লে বস্তু দৃশ্যমান হয় না ।

কাঠ বা অ্যালুমিনিয়াম এক্স রশ্মিকে শোষণ করে না কেন

যে বস্তুর ঘনত্ব যত বেশি সেই বস্তু এক্স রশ্মিকে তত বেশি শোষণ করতে পারে । কাঠ এবং অ্যালুমিনিয়ামের ঘনত্ব সিসা এবং হাড়ের ঘনত্বের তুলনায় কম । এজন্য এক্স রশ্মি কাঠ এবং অ্যালুমিনিয়ামকে ভেদ করে যেতে পারে কিন্তু সিসা এবং হাড়কে ভেদ করতে পারে না । সিসা বা হাড় এক্স রশ্মিকে শোষণ করতে পারে , কিন্তু কাঠ বা অ্যালুমিনিয়াম পারে না । 

সম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মি সিসার চেয়ে লোহাকে বেশি ভেদ করে কেন

এক্স রশ্মি বেশি ঘন বস্তুর চেয়ে কম ঘন বস্তুকে সহজে ভেদ করতে পারে । এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা পদার্থের ঘনত্ব এবং পারমাণবিক গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে । লোহার ঘনত্ব এবং পারমাণবিক গুরুত্ব সিসার চেয়ে অনেক কম বলে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মি সিসার তুলনায় লোহাকে বেশি ভেদ করে । 

এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় 

এক্স রশ্মি উৎপাদনকারী নলের ক্যাথোড এবং অ্যানোডের মধ্যে বিভবপ্রভেদ বাড়িয়ে এক্স রশ্মির ভেদন ক্ষমতা বাড়ানো যায় ।

error: Content is protected !!