রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান পদবাচ্য

রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান পদবাচ্য

রাষ্ট্রবিজ্ঞানিদের মধ্যে সকলেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দিতে চান না । এই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত উল্লেখ করার আগে বিজ্ঞানের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞাটি আমাদের জানা প্রয়োজন । কারণ বিজ্ঞান কাকে বলে , তা না জানতে পারলে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিজ্ঞান পর্যায়ভুক্ত কিনা বলা সম্ভব নয় । বিজ্ঞান শব্দের অর্থ হলো বিশেষরূপে জ্ঞান । কোন বিষয় সম্বন্ধে বিশেষরূপে জ্ঞান লাভ করতে হলে পর্যবেক্ষণ , বিশ্লেষণ প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণ করতে হয় । এই জ্ঞানকে সংশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ হতে হবে ; অন্যথা ঐ জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে  যাবে । 

সংক্ষেপে বলা যায় : “ বিজ্ঞান হল কোন এক শ্রেণীভুক্ত বিষয় বস্তুর সুসংবদ্ধ জ্ঞান ।” এই সুসংবদ্ধ জ্ঞান থেকে বিজ্ঞানীরা কতকগুলি সাধারণ সূত্র বার করেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে এই সূত্রগুলি প্রয়োগ করে বিষয়বস্তুর সত্যতা যাচাই করেন । রসায়ন , পদার্থবিদ্যা , জ্যোতিষশাস্ত্র প্রভৃতিকে বিজ্ঞান পদবাচ্য করা যায় । কারণ , তাদের বিষয় বস্তুগুলির বিশ্লেষণ , শ্রেণীবিভাগ ও পর্যবেক্ষণ করে একটি সুসংবদ্ধ জ্ঞান লাভ করা যায় এবং এই লব্ধ জ্ঞান থেকে আবার কতকগুলি সূত্র নির্ধারণ করা যায় ।

এখন প্রশ্ন হল , রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দেওয়া যায় কিনা । ফরাসী দার্শনিক বাকলে ( Backle ) , কোঁত ( Comte ) এবং মেটল্যান্ড ( Maitland ) প্রমূখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানিগণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান পদবাচ্য করতে চান না । এইসব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তাঁদের মতের সমর্থনে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন করেন । এই যুক্তিগুলি হল  :

রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলার বিপক্ষে যুক্তি

( ১ ) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চয়তা পূর্ণ । ফলে অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর পরীক্ষা কার্য , গবেষণা এবং শ্রেণী বিভক্তিকরণ যতটা সহজ , রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ততটা সহজ নয় ।

( ২ ) অন্যান্য বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে যতটা ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা সহজ , রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে ততটা ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা সহজ নয় । 

( 3 ) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্ত , অর্থাৎ মানুষের রাষ্ট্রনৈতিক জীবন এবং রাষ্ট্রের সমস্যাবলীর সঠিক পরিমাপ করা বা অপরিবর্তনীয় অবস্থায় রেখে তার স্বরূপ নির্ণয় করাও সম্ভব নয় । ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন মানুষকে নিয়ে গবেষণাগারে পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব । গবেষকের গবেষণার বিষয় যদি সকল অবস্থায়ই অপরিবর্তিত থাকে তবেই গবেষকদের পক্ষে সাধারণ সূত্র বার করা সম্ভব । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্ত , সর্বদা পরিবর্তনশীল । অতএব , অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো এর পরীক্ষাকার্য চলে না । ফলে এটি বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্তও হয় না ।

( ৪ ) রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে বাহ্যিক পরিবেশের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্তে পৌছাতে হয় । এই সকল কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয় । এই জন্য অনেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলিকে অনুমানসিদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেন । কিন্তু অন্যান্য বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলি বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর নির্ভরশীল ; ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অন্যান্য বিজ্ঞানের পদবাচ্য করা যায় না । এইজনা লর্ড ব্রাইস রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অসম্পূর্ণ বিজ্ঞানের মর্যাদা দিয়েছেন এবং একে আবহবিদ্যার ( Meteorology ) সঙ্গে তুলনা করেছেন ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি

আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানিদের মধ্যে যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দিতে চান , তাদের মধ্যে আছেন অ্যারিস্টটল , বোড্যা , হবস , মন্টেস্কু , পোলক প্রভৃতি মনীষীগণ । স্যার ফ্রেডারিক পোলক বলেন : ” যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেন না , তারা বিজ্ঞান কাকে বলে জানেন না ” । এই মতাবলম্বীদের যুক্তি হল : 

( ১ ) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পক্ষেও শ্রেণীবিভক্তিকরণ , বিশ্লেষণ প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্তর্গত বিষয়বস্তুর সুসংবদ্ধ জ্ঞান লাভ করতে পারা যায় ।

( 2 ) লর্ড ব্রাইস এর মতে  , মানুষের আচরণের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় এবং এই সুসামঞ্জস্য আচরণ থেকে সুসংবদ্ধ জ্ঞানলাভও করা যায় । তাছাড়া মানুষের এই আচরণ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সাধারণ নিয়মও বার করে থাকেন । আবার এই নিয়মগুলির সাহায্যে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধান করা যায় ।

( 3 ) অধ্যাপক গার্নারের মতানুসারে রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়বস্তুর যেহেতু বিশ্লেষণ , শ্রেণিবিভক্তিকরণ , পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি করা যায় এবং শ্রেণিবিভক্ত জ্ঞান থেকে সাধারণ সূত্রের  প্রতিষ্ঠাও যেহেতু সম্ভব , সেই হেতু রাষ্ট্রবিজ্ঞানও বিজ্ঞান পদবাচ্য । 

উপসংহার

উপসংহারে বলা যেতে পারে , রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে একটি গভীর শৃঙ্খলা দেখা যায় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়সমূহ থেকে কতকগুলি সূত্রও নির্ধারণ করেছেন । এই সূত্রগুলি বিভিন্ন রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যা সমাধানকল্পে প্রয়োগ করেছেন । সুতরাং তুলনামূলক , পরীক্ষামূলক , ঐতিহাসিক , আইনমূলক প্রভৃতি পদ্ধতির সাহায্যে রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যার বিচার বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান । 

আদিম যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে , মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালী প্রগতিশীল । রাষ্ট্রবিজ্ঞান এই প্রগতিশীল মানব জীবনের আলোচনা করে । এই কারণেই লড ব্রাইস বলেছেন , রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রগতিশীল বিজ্ঞান । আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও মানুষের এই ক্রমবর্ধমান উন্নত প্রণালীর রাষ্ট্রনৈতিক জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন । বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের পক্ষে মানুষের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে আলোচনা সহজতর হয়েছে । অতীতের পটভূমিকায় বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে যে ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন তার অধিকাংশই নির্ভুল প্রমাণিত হয় ।

অধ্যাপক গেটেল বলেছেন “ যদি বিজ্ঞান বলতে এই বোঝায় যে , শৃঙ্খলিত পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সাহায্যে প্রাপ্ত কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের সম্যক জ্ঞান ও আলোচনা এবং সুসংবদ্ধ বিষয়ের বিশ্লেষণ ও শ্রেণীবিভক্তিকরণ , তাহলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকেও বিজ্ঞান বলা যেতে পারে ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কিভাবে এই সূত্র নির্ধারণ করেন তা উদাহরণের সাহায্যে বোঝানো যেতে পারে । বিপ্লব কেন হয় ? শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন কেন হয়ে থাকে ? এই দুইটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করা যাক । রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একটি শাসনতন্ত্র চালু হবার পর দেখেন যে এটা জনসাধারণ কর্তৃক কি পরিমাণ সমর্থন লাভ করছে । যদি ঐ শাসনতন্ত্র সকল অবস্থায়ই অগ্রাহ্য হয় , তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ঐ শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন করেন এবং ঐ শাসনতন্ত্রকে বিপ্লবের কারণ বলে ধরে থাকেন । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরীক্ষা ক্ষেত্র বিরাট হলেও অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো এই শাস্ত্রেও পরীক্ষাকার্য চলে এবং পরীক্ষার পর সূত্র নির্ধারিত হয় । আবার রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কয়েকটি দিক আছে ; যথা , বিজ্ঞান , কলা , দর্শন ও আইন প্রভৃতি । এই সমস্ত বিষয়ের আলোচনায় সর্বদা বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করা সম্ভব নয় বলে এই শাস্ত্রকে আবার কেউ কেউ অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেন ।

error: Content is protected !!