দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ 

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের উপর সমগ্র মার্কসীয় দর্শন প্রতিষ্ঠিত । সাধারণভাবে দ্বান্দ্বিকতার অর্থ হল বিরোধ সমূহের মিলন তত্ত্ব ( the theory of the union of the opposites . ) । ‘ Dialectic ‘ এই ইংরেজী শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ‘ Dialego ‘ থেকে । এই গ্রীক শব্দটির অর্থ আলাপ আলোচনা বা তর্ক বিতর্ক । গ্রীক দার্শনিকগণ আলোচনা ও যুক্তির পথে উদ্ভূত বৈপরীত্যকে দূর করে সত্যের সন্ধান করতেন । 

মার্কসীয় দর্শন বস্তুবাদী ও দ্বন্দ্বমূলক 

মার্কসবাদ হল একটি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন । আবার মার্কসবাদ হল একটি দ্বান্দ্বিক দর্শন । সংক্ষেপে মার্কসবাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় হল দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হিসাবে । মার্কসের এই দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একেবারে একটি নতুন ধারা সংযুক্ত করেছে । মার্কস তাঁর রচনায় ‘দ্বান্দ্বিকতা ’ ( dialectics ) ও ‘ বস্তুবাদ ’ ( Materialism ) কথা দুটি ব্যবহার করলেও একযোগে ‘ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ’ ( dialectical Materialism ) কথাটি প্রয়োগ করেননি । মার্কসীয় চিন্তা দর্শনকে ‘ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ’ হিসাবে প্রথম আখ্যায়িত করেন রুশ চিন্তাবিদ প্লেখানভ । এমিল বার্নস বলেছেন : “ মার্কসীয় দৃষ্টিতে পৃথিবী শুধু বস্তু সত্যই নয় । তার আরও কতকগুলি ধর্ম বর্তমান । সেগুলির সমষ্টিকে সামগ্রিকভাবে দ্বন্দ্বমূলক সংজ্ঞা দেওয়া যায় । ”  

মার্কস ও হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ আলাদা

দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তির সংঘাতজনিত প্রক্রিয়াকে দ্বন্দ্ববাদ বা দ্বান্দ্বিকতা( dialectics ) বলে । এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কথা প্রথম বলেন ভাববাদী জার্মান দার্শনিক হেগেল । হেগেলের মতানুসারে সবকিছুর বিকাশ তার অন্তর্নিহিত দ্বান্দ্বিকতার ফলেই ঘটে থাকে । তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রও হল মানব ইতিহাসের দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়াগত বিবর্তনের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ ফসল । মার্কস তাঁর দ্বন্দ্ববাদের ক্ষেত্রে হেগেলকে অনুসরণ করেছেন । তবে মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদ হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদ থেকে একেবারে আলাদা । হেগেলীয় দর্শন হল ভাববাদী । কিন্তু মার্কসীয় দর্শন হল সম্পূর্ণ বস্তুবাদী । তাই মার্কসের দ্বন্দ্ববাদ হেগেলের দ্বন্দ্ববাদের বিপরীত । 

মার্কস তাঁর Das Capital গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন : “ My dialectic is opposite of Hegel’s . হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদ নেতিবাচক ( Negative ) । হেগেলীয় দর্শন অনুসারে এক মহাভাব বা চৈতন্যের দ্বান্দ্বিক বিকাশের ফল হিসাবে পার্থিব জগৎ ও জীবনের সতত পরিবর্তনশীল বিভিন্ন রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি । এই দ্বান্দ্বিক বিকাশের প্রকৃতিটি হল নেতিকরণের মাধ্যমে পরিবর্তন ও উন্নতি । হেগেলের অভিমত অনুসারে এই জগৎ ও জীবনের যে কোন স্তর হল ঠিক তার আগেকার স্তরের নেতিকরণ বা অস্বীকৃতি । জগৎ ও জীবনের পরিবর্তন ও বিবর্তন বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মার্কস কিন্তু কেবল এই নেতিকরণের পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি । মার্কসের মতানুসারে হেগেলের ভাববাদী চিন্তাদর্শন ও নেতিকরণ প্রক্রিয়ার কারণে তাঁর ইতিহাস দর্শন চূড়ান্ত বিচারে বন্ধ্যা প্রতিপন্ন হয় । 

মার্কসীয় দ্বন্দ্ববাদ

কমিউনিস্ট ইস্তেহার ’ এর শুরুতেই বলা হয়েছে যে , “ আজ পর্যন্ত আমরা মানব সমাজের যত ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হয়েছি সেই সব ইতিহাস হল শ্রেণী দ্বন্দ্বের ইতিহাস । ” এখানে যে দ্বন্দ্ববাদের কথা বলা হয়েছে তা শুধুমাত্র একটি নেতিকরণ প্রক্রিয়া নয় । মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার প্রক্রিয়াটির চারটি মূল নীতি উল্লেখযোগ্য । 

সকল বস্তু পরস্পর নির্ভরশীল :

পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোন বিষয়ের বিশ্লেষণ করা যায় না । প্রকৃতিগতভাবে প্রতিটি বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কিত ও পরস্পরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার মূল বক্তব্য হল সামগ্রিকর্তার পরিপ্রেক্ষিতে যাবতীয় ঘটনা ও কাজকে বিচার বিশ্লেষণ করা । বস্তুজগতের সকল ঘটনা ও বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত । প্রকৃতি বিষয়সমূহের আকস্মিক সমাহারে সৃষ্ট নয় । স্তালিন বলেছেন : ..dialectics does not regard nature as accidental agglomeration of things . ” 

বস্তু মাত্রই গতিশীল :

বস্তু মাত্রেই গতিশীল ও পরিবর্তনশীল । এই বিশ্বপ্রকৃতির কোন কিছুই শাশ্বত বা চিরন্তন নয় এবং অনড় বা অচল নয় । নতুন বস্তুর জন্ম এবং পুরাতনের ধ্বংস প্রাকৃতিক জগতে সতত ঘটে চলেছে । বস্তুর উদ্ভব ও বিকাশের বৈজ্ঞানিক বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই গতিশীলতা বা পরিবর্তনশীলতার উপর গুরুত্ব আরোপের কথা বলা হয় । তাই মার্কসবাদ অনুসারে সমাজেরও পরিবর্তন ও বিবর্তন স্বাভাবিক , কোন সমাজব্যবস্থাই স্থিতিশীল নয় । পার্থিব জগতের বিষয়সমূহ পরস্পর নির্ভরশীলতা এবং গতিশীলতা ও বিকাশশীলতার দ্বারা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ । দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য অনুসারে প্রকৃতি নিশ্চল নয় পুরোমাত্রায় সচল । মার্কস ও এঙ্গেলস বলেছেন : “ Nature is the proof of dialectics and it must be said for modern science that it has furnished this proof with rich materials increasing daily . Nature works dialectically and not metaphysically . ”

বস্তুর পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন :

দ্বান্দ্বিক নিয়মে প্রগতির ক্ষেত্রে তাৎপর্যহীন অবস্থা থেকে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয় । এই মৌলিক পরিবর্তন গুণগত পরিবর্তনও বটে । দ্বান্দ্বিক নিয়মে এক অবস্থা থেকে অন্য এক অবস্থায় আমূল রূপান্তর ঘটে । এ হল এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উল্লম্ফন । বস্তুর পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় ( quantitative change leading to qualitative change ) । ক্রমবিকাশের ধারায় কোন কিছুর পরিমাণগত পরিবর্তন একটা বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তার মধ্যে গুণগত পরিবর্তন দেখা দেয় । এই পরিবর্তন ধীরে হয় না । বিশেষ একটা পর্যায়ে অতিক্রমের মত অত্যন্ত দ্রুত এই রূপান্তর ঘটে । যেমন , জলের উপর উত্তাপ বৃদ্ধির ফলে এক নির্দিষ্ট অবস্থায় জল বাষ্পে রূপান্তরিত হয় । আবার উত্তাপ হ্রাসের ফলে এমন এক অবস্থা আসে যখন জল বরফে রূপান্তরিত হয় । একে জলের বৈপ্লবিক রূপান্তর বলা যেতে পারে । মার্কসীয় দর্শন অনুসারে মানবসমাজেও এ রকম পরিবর্তন ঘটে । একে বিপ্লব বলে । 

বস্তু ও ঘটনার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব :

প্রত্যেক বস্তু ও ঘটনার মধ্যে পরস্পর বিরোধী ধর্ম একই সঙ্গে বর্তমান থাকে । তার ফলে বস্তু ও ঘটনার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকে । এই অন্তর্দ্বন্দ্বের জন্যই সকল পরিবর্তন ঘটে । বস্তুর পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তর হল এই অন্তর্দ্বন্দ্বেরই ফল । স্তালিন এর মতানুসারে প্রকৃতির সকল প্রতীয়মান বস্তুর মধ্যে আভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য বর্তমান । এই দুটি শক্তি হল নেতিবাচক ও ইতিবাচক । এই দুই পরস্পর – বিরোধী শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ বস্তুকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও গতিময় করে । স্ববিরোধের এই সংঘর্ষই হল বিকাশ ।  

লেনিন বলেছেন : “ Development is the ‘ struggle ‘ of opposites . ” লেনিনের মতানুসারে বস্তুর প্রকৃতিগত ও অন্তর্নিহিত এই স্ববিরোধের আলোচনাই হল দ্বান্দ্বিকতা । আদিম সাম্যবাদী সমাজের পর প্রত্যেক পর্যায়ে অপরিহার্যভাবে শ্রেণীদ্বন্দ্ব বর্তমান । পুঁজিবাদী সমাজে সর্বহারা ও বুর্জোয়া শ্রেণী দ্বন্দ্বের ফলে পুঁজিবাদী সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে ; উদ্ভব হবে শ্রেণীহীন , শোষণহীন এক সমাজতান্ত্রিক সমাজের । সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ক্রমে সাম্যবাদী সমাজে রূপান্তরিত হবে । সাম্যবাদী সমাজে মানুষের উপর শাসনের জায়গায় সৃষ্টি হবে বস্তুর উপর শাসন ও উৎপাদন প্রণালীর গতি নিয়ন্ত্রণ । এইভাবে প্রত্যেক বস্তু বা ঘটনার পরস্পরিক সংঘাত ও ঐক্যই নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তরে উন্নীত হওয়ার মূল কারণ । দ্বান্দ্বিকতার এই নীতিটিকে বলে ‘ Struggle and unity of opposites . ” 

নেতির নেতিকরণ :

বিকাশের প্রত্যেক পর্যায়ে পূর্ববর্তী পর্যায়ের মূল অবস্থার অস্বীকৃতি প্রকাশ পায় । পুরাতনের অস্বীকৃতি ব্যতিরেকে নতুনের আবির্ভাব অসম্ভব । মার্কস বলেছেন : “ No development can take place in any sphere unless it negates old forms of existence . ‘ ‘ নতুনের জঠর থেকে পুরাতনের জন্ম হয় । পুরাতনের অবসান এবং নতুনের আবির্ভাব কেবল বৈপ্লবিক উপায়েই সম্ভব । বিপ্লব মানে কেবল ধ্বংস নয় । এ হল উন্নততর নতুনের আবির্ভাব ও বিকাশ । ক্রমবিকাশের ধারায় বস্তুর অত্যন্ত দ্রুতভাবে বা উল্লম্ফনের মাধ্যমে পুরাতন অবস্থাকে অস্বীকার ( negation ) করে নতুনের সৃষ্টি হয় । এই নতুন অবস্থার মধ্যেও স্ববিরোধ বা অন্তর্দ্বন্দ্ব বর্তমান থাকে । তার ফলে একে অস্বীকার করে ( negation of negation ) এক নতুনতর অবস্থার সৃষ্টি হয় । অর্থাৎ অস্বীকৃতি মানেই কেবল ধ্বংস নয় , এ হল এক নতুন অবস্থায় উন্নততর অগ্রগতি । 

এঙ্গেলস বলেছেন : “ Negation in dialectics does not mean simply saying no . ’ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নততর অবস্থার সৃষ্টি ও বিকাশ সম্ভব হয় । এইভাবে একটি ব্যবস্থার অস্বীকৃতির পর যে নতুন ব্যবস্থার উদ্ভব হয় তা পূর্ববর্তী ব্যবস্থা থেকে সব সময় উন্নততর । এই প্রক্রিয়াকে ‘ নেতির নেতিকরণ ’ বা ‘ অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি ‘ ( negation of negation ) বলে । 

ক্রমবিকাশের এই সূত্রকে ‘ বাদ ’ , ‘ প্রতিবাদ ’ এবং ‘ সম্বাদ ’ হিসাবেও প্রকাশ করা যায় । যেমন , সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে তাকে অস্বীকার করে উন্নততর ব্যবস্থা হিসাবে পুঁজিবাদের সৃষ্টি হয় । এ হল ‘ বাদ ‘ ( thesis ) -এর অস্বীকৃতি বা ‘ প্রতিবাদ ’ ( anti thesis ) । পুনরায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার স্ববিরোধসঞ্জাত অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে তা অস্বীকার করে উন্নততর ব্যবস্থা হিসাবে সমাজতন্ত্রের উদ্ভব হয় । এ হল ‘ অস্বীকৃতির অস্বীকৃতি বা সম্বাদ ( synthesis ) । হান্ট ( Carew Hunt ) বলেছেন : “ The synthesis negates the anti – thesis — the first negation — and is thus the nagation of the negation . ” 

মার্কসের দ্বন্দ্ববাদে শুধুমাত্র ভিন্নধর্মী দুটি শক্তির সংঘাত বা বিরোধিতার কথা বলা হয় নি । প্রকৃত প্রস্তাবে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতা হল মূলত পারস্পরিক প্রভাবজনিত এক প্রক্রিয়া । জন লিউইস এর মতানুসারে এই দ্বান্দ্বিকতা হল পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ( reciprocity ) – র সূত্রজনিত এক প্রবাহ বিশেষ ।  

মার্কসের দর্শন বস্তুবাদী

প্রকৃতি ও তার অংশ স্বরূপ মানবসমাজ সম্পর্কে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি বস্তুবাদ ( Material ism ) হিসাবে গণ্য হয় । মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টি বা দর্শনই হল বস্তুবাদ । বস্তুবাদ হল একটি বিশেষ দার্শনিক কাঠামো । এখানে পার্থিব জগৎ ও জীবনের বস্তুময়তাকেই প্রাণ ও ভূতির নিদর্শন হিসাবে মনে করা হয় । এই জগৎ ও জীবনের মূল সত্য হল বস্তুময়তা । বস্তুই প্রধান , ভাব বস্তুর অনুগামী । বস্তুময়তারই বিভিন্ন প্রকাশ হল অনুভূতি – আকাঙ্ক্ষা , চেতনা – ভাবনা , মন , সৌন্দর্যবোধ প্রভৃতি গৌণ মানবিক বৈশিষ্ট্যসমূহ । মার্কসের মতে ‘ আত্মা ’ বা ‘ মন ‘ সবকিছুর নির্ধারক হল বস্তু । বস্তু মননিরপেক্ষ ।  

ভাববাদী হেগেলের মতানুসারে মনই হল আদি সত্তা । বস্তুর যদি আদৌ কোন সত্তা থাকে তা গৌণ । এই পার্থিব জগৎকে ছাড়িয়ে এক শাশ্বত চেতনা ও মহাভাব ( Spirit and Idea ) এর জগৎ বর্তমান । সেই জগৎই হল মূল সত্য । আর এই পার্থিব জগৎ ও জীবনের বিভিন্ন রূপ হল , মূল সত্য যে চেতনা তারই বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র । এই হেগেলীয় ভাববাদকে মার্কস পুরোপুরি বর্জন করেছেন । মার্কস বস্তুজগতের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন । তাঁর মতানুসারে চেতনা সত্তাকে নির্ধারিত করে না , সত্তাই চেতনাকে নির্ধারিত করে ( Being determines consciousness , not the other way round ) । বস্তুজগতের এই প্রাথমিক অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হিসাবে গণ্য হয় । 

উপসংহার

মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কোন বিমূর্ত দার্শনিক তত্ত্ব নয় । এর সাহায্যে বিজ্ঞানের প্রত্যেক ক্ষেত্রে যাবতীয় তথ্য সম্যকভাবে অবগত হওয়া যায় । মানবসমাজের ক্রমবিকাশের ধারা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গভীর তাৎপর্য বিরোধ বিতর্কের ঊর্ধ্বে । এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের অগ্রগতির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয় , সমাজের অতীত ও বর্তমান রূপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায় এবং ভবিষ্যৎ গতি প্রকৃতি সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত ধারণা লাভ করা যায় ।  

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ একটি রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে চূড়ান্তভাবে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদী ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে । এই তত্ত্বচিন্তার ভিত্তিতে দাস সমাজ , সামন্ত সমাজ , পুঁজিবাদী সমাজ প্রভৃতি সামাজিক বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে । এমিল বার্নস এর মতানুসারে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাণ্ডারের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ।

error: Content is protected !!