মার্কসবাদ কি

মার্কসবাদ কি 

মার্কসবাদ কি — এক কথায় এর জবাব দেওয়া সহজ নয় । তবে লেনিন ( V. I. Lenin ) কে অনুসরণ করে বলা যেতে পারে যে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষামালাই হল মার্কসবাদ লেনিন  বলেছেন : “ Marxism is the system of the views and teachings of Marx . ” কার্ল মার্কসই হলেন মার্কসবাদের প্রধান রূপকার । মার্কস একটি মৌলিক ব্যবহারিক দর্শন ( Philosophy of Parxis ) গড়ে তোলার জন্য সারা জীবন ধরে আত্মত্যাগ করেছেন । ইতিহাসে এটি এক বিরল উদাহরণ । তবে এঙ্গেলসকে বাদ দিয়েও মার্কসবাদকে ভাবা যায় না । কারণ মার্কসের কর্মজীবনে এঙ্গেলস বৌদ্ধিক সহযোগিতা যেমন করেছেন , তেমনি আপদে-বিপদে , বন্ধু হয়ে সর্বদা পাশে থেকেছেন ।  

সমাজ সম্পর্কে সাধারণ তত্ব

এমিল বার্নস বলেছেন , “ মার্কসবাদ হল আমাদের এই জগৎ এবং তারই অংশ মানব সমাজ সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব । এর নামকরণ করা হয়েছে কার্ল মার্কসের নামানুসারে । ” মার্কসবাদ হল একটি সঠিক সমাজ দর্শন , একটি সামগ্রিক চিন্তাধারা । মার্কসবাদ হল দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ । এটি একটি সামগ্রিক তত্ত্ব চিন্তা । যে কোন জ্ঞান শৃঙ্খলাতেই এর প্রয়োগ সম্ভব । একে আলাদা করে কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা অর্থনীতি বা ইতিহাস বা দর্শনের তত্ত্ব বলা যায় না ।  

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র

মার্কস ও এঙ্গেলস মানব সমাজের উৎপত্তি , বিকাশ ও ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেছেন এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন । এঁদের মতানুসারে সামাজিক পরিবর্তন কোন আকস্মিক ব্যাপার নয় । সামাজিক পরিবর্তন বহিঃপ্রকৃতির পরিবর্তনের মত কয়েকটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে । মার্কস এই সত্যের ভিত্তিতে সমাজ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত মতবাদ গড়ে তুলেছেন । মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর এই মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত । এমিল বার্নসের মতে , “ মানুষ ও জড় পদার্থ — উভয়ের ক্ষেত্রে সার্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নিয়মগুলিকে আশ্রয় করেই মার্কসীয় বা বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি রূপায়িত হয়েছে । ”  

প্রলেতারিয়েতের মতাদর্শ

মার্কস বিশ্বাস করেছেন যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে মানব সমাজের অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান সমাজকে পরিবর্তনের কাজেও ব্যবহার করা যায় । মার্কস এর মতে দার্শনিকগণ এখনো পর্যন্ত পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে কেবল ব্যাখ্যাই করেছেন , কিন্তু আসল কথা হল এই পৃথিবীটাকে ( সমাজ ব্যবস্থাকে ) পাল্টে দেওয়া । তিনি বলেছেন : “ Philosophers have so far only interpreted the world in many ways , the point , however , is to change it . ” মার্কসবাদের মহান ঐতিহাসিক কীর্তি হল এই যে , মার্কসবাদ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতনের অনিবার্যতা এবং নতুন সমাজ ব্যবস্থা বা শোষণ পীড়ন থেকে মানব জাতির মুক্তির পথ অর্থাৎ সাম্যবাদের পথ উদ্ঘাটন করেছে । এ দিক থেকে মার্কসবাদ হল সর্বহারা শ্রেণী বা প্রলেতারিয়েতের মতাদর্শ ; তাদের মৌলিক স্বার্থের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ।  

প্রায়োগিক মতবাদ

মার্কসবাদ হল একটি প্রায়োগিক মতবাদ । মার্কস শোষিত সর্বহারা শ্রেণীর জীবনধারার মৌলিক পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশ্যে তাঁর মতাদর্শটি উপস্থাপিত করেছেন । মার্কসবাদ পৃথিবীর উপর আর একটি নিছক তত্ত্বের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় নি । এই তত্ত্বে এই পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে । বলা হয় যে , দর্শনের সঙ্গে তত্ত্বের এবং তত্ত্বের সঙ্গে প্রয়োগের যোগাযোগ থাকা বাঞ্ছনীয় । এর মধ্যেই যে কোন রাজনৈতিক তত্ত্বচিন্তার গুরুত্ব নিহিত থাকে । মার্কসবাদে এই যোগাযোগের বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট । মার্কসবাদে তত্ত্ব ও প্রয়োগের বা চিন্তা ও কর্মের ওতপ্রোত সম্পর্কটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।  

দ্বান্দ্বিক নীতি

লেনিনের মতে ‘ মার্কসবাদ সত্য তাই এ সর্বশক্তিমান ‘ । এমিল বার্নস বলেছেন : “ মার্কসবাদ স্বীকৃতি দাবি করে সত্য হিসাবে , কোন বিমূর্ত নৈতিক সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে নয় । যেহেতু তা সত্য , তাই আজকের পৃথিবীর সকল দুঃখ অভিশাপের ত্রাস থেকে মানবতাকে মুক্তি দানের কাজে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করা সম্ভব এবং কর্তব্য । ”  

মার্কসবাদ বস্তুগত অস্তিত্বের উপর জোর দেয় । তাই মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক নীতিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বলা হয় । মার্কস বলেছেন সত্তাই চেতনাকে নির্ধারিত করে , চেতনা সত্তাকে নির্ধারিত করে না ( Being determines consciousness , not the other way round . ) । মার্কসের মতে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছুর মধ্যেই একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে বর্তমান । এই দ্বান্দ্বিকতার অর্থ হল দুটি বিরোধী শক্তির মধ্যে অনবরত সংঘাত ও মিলনের প্রক্রিয়া । এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রতিটি বিষয়ের চরিত্র প্রকাশ পায় । মার্কসবাদ অস্তিত্ব সম্পর্কিত এই দ্বান্দ্বিক বিচারকে সার্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে । মানুষ ও জড় পদার্থ নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রে সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য নিয়মগুলিকে ভিত্তি করে মার্কসীয় দর্শন বা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে ।  

মার্কসবাদ হল একটি জীবন্ত বিপ্লবী শিক্ষা । এই শিক্ষা নিয়ত বিকশিত ও উন্নত হচ্ছে । নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তাকে ক্রমশ সমৃদ্ধ করছে । প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশ সম্পর্কিত নিয়মের বিজ্ঞান হিসাবে বা বিশ্বের বিপ্লবী রূপান্তরের বিজ্ঞান হিসাবে মার্কসবাদ থেমে থাকতে পারে না । মার্কস ও এঙ্গেলস এর মৃত্যুর পর লেনিন মার্কসবাদকে নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ ও অগ্রসর করার মহান দায়িত্ব পালন করেন । মার্কসের মৃত্যুর পর শতবর্ষ অতিক্রান্ত । এখনও মার্কসবাদ নিয়ে বিতর্ক ও বিচার চলছে । কারণ মার্কসীয় দর্শন চিন্তার নিয়মিত বিকাশ ঘটেছে । প্রত্যেক যুগে লেনিন বা মাও , রোজা লুক্সেমবর্গ বা কার্ল করশ , স্তালিন বা ট্রটস্কি , লুকাচ বা গ্রামসি প্রভৃতি বিভিন্ন বিপ্লবী তাত্ত্বিক টীকা ভাষ্য সংযোজনের মাধ্যমে মার্কসবাদের ক্রমবিকাশকে অব্যাহত রেখেছেন ।

error: Content is protected !!