রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দেওয়া সহজ নয় । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও ধারণা তার আলোচনাক্ষেত্রের পরিধির দ্বারাই নির্ধারিত হয় । অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানও হল একটি গতিশীল বিজ্ঞান । মানুষের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পরিধিও পরিমার্জিত এবং পরিবর্তিত হয়েছে । তার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্বন্ধে ধারণারও বিবর্তন ঘটেছে । এই কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন সংজ্ঞার সৃষ্টি হয়েছে । 

রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞা

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন । প্রখ্যাত সুইস দার্শনিক ব্লুণ্টসলি ( Bluntschli ) সহজভাবে বলেছেন যে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল ‘ রাষ্ট্রের বিজ্ঞান ’ । অনুরূপভাবে অধ্যাপক গার্নার ও বলেছেন – ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরু ও সমাপ্তি রাষ্ট্রকে নিয়েই ” । অর্থাৎ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পরিধি রাষ্ট্রের উৎপত্তি , প্রকৃতি , আদর্শ , লক্ষ্য প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । গ্যারিস এর মতানুসারে ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রের উদ্ভব , বিন্যাস , উদ্দেশ্য , নৈতিক তাৎপর্য , অর্থনৈতিক সমস্যা প্রভৃতির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রকে ক্ষমতার এক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিচার করে । ‘ জেলিনেকের মতানুসারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লক্ষ্য হল রাষ্ট্রের তত্ত্ব ও ব্যবহারিক জীবনে রাষ্ট্রের গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা করা । গেটেল ( R. G. Gettell ) বলেছেন : ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল রাষ্ট্র কি হয়েছে তার ঐতিহাসিক অনুসন্ধান , রাষ্ট্র কি তার বিশ্লেষণমূলক আলোচনা এবং রাষ্ট্রের কি হওয়া উচিত তার রাজনৈতিক ও নীতিগত আলোচনা ” ।

সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা

কিন্তু সীলি ( Seeley ) , ক্যাটলিন ( Catlin ) প্রমুখ দার্শনিকগণ সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন । তাঁদের অভিমত হল , সরকার বা শাসন যন্ত্রই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একমাত্র আলোচ্য বিষয় । সীলি বলেছেন – ‘ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি যেমন সম্পদ , জীববিদ্যা যেমন জীবন , বীজগণিত যেমন সংখ্যা এবং জ্যামিতি যেমন আয়তন ও বিস্তৃতি সম্পর্কে আলোচনা করে , রাষ্ট্রবিজ্ঞান তেমনি সরকার সম্পর্কিত বিষয়ে অনুসন্ধান চালায় ‘ । 

রাষ্ট্র ও সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা

তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অধিকাংশের মতে রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার অন্তর্ভুক্ত । অধ্যাপক গিলক্রিস্ট ( Gilchrist ) এর মতে ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র ও সরকার নিয়ে আলোচনা করে ’। পল জানে ( Paul Janet ) বলেছেন – ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজ বিজ্ঞানের সেই অংশ যা রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সরকারের নীতি সমূহের আলোচনা করে ‘। রাষ্ট্র ও নাগরিকদের বহুবিধ পারস্পরিক সম্পর্কের যথার্থ বিশ্লেষণের জন্য সরকার সম্পর্কে আলোচনাও আবশ্যক । কারণ সরকারই হল রাষ্ট্রের মূর্ত প্রকাশ । প্রকৃত প্রস্তাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের কিছুটা তত্ত্বগত এবং বাকিটা প্রতিষ্ঠানগত । রাষ্ট্রের তত্ত্বগত আলোচনার সঙ্গে সরকারের প্রতিষ্ঠানগত আলোচনার সামঞ্জস্য বিধানের মধ্যেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সার্থকতা প্রতিপন্ন হয় । 

উদ্দেশ্যমূলক সংজ্ঞা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান কেবল অতীত ও বর্তমানকে নিয়ে আলোচনা করে না । অতীত ও বর্তমানের আলোচনার আলোকে রাষ্ট্রীয় জীবনের গতিপথ নির্ধারণেও রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাহায্য করে । এই কারণে গেটেল ( Gettell ) বলেছেন , রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রের অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে ’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে যে আলোচনা থাকে তার কিছু ঐতিহাসিক এবং কিছু সমসাময়িক । আবার অতীতের আলোচনা এবং বর্তমানের সমালোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও ইঙ্গিত থাকে । তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনা উদ্দেশ্যমূলক । 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞা

তবে ব্লুণ্টসলি , গার্নার , গেটেল প্রভৃতি দার্শনিকগণ কর্তৃক প্রদত্ত উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গতিশীল প্রকৃতিকে ধরতে পারেনি । বর্তমানকালে আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের উপর নানাক্ষেত্রে কার্যকরী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে । এই কারণে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি নিরপেক্ষ হতে পারে না । আবার সমাজবদ্ধ মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্বন্ধ বা রাষ্ট্রের অধীনে ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক , ব্যক্তির সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য পরিধির অন্তর্ভুক্ত ।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলির সমর্থন করেন না । অধ্যাপক অ্যালান বল ( Alan R. Ball ) , লাসওয়েল ( Lasswell ) , রবসন ( Robson ) প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতানুসারে এই সমস্ত সংজ্ঞা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এবং সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনার ধারাকে ম্যাকেঞ্জি ( W. J. M. Mackenzie ) ‘ আইনমুখী ’ , ‘ কৃত্রিম ’ এবং ‘ খামখেয়ালীপূর্ণ ’ বলে অভিযুক্ত করেছেন । 

আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনাকে সমর্থন করেন না । কারণ এই ধরনের আলোচনায় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণকে কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না । আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র ছাড়াও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান , কোন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও আচার আচরণ , রাজনৈতিক দল , চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী প্রভৃতিকে নিয়ে আলোচনা করে । ইস্টনের  মতানুসারে রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল ‘ ক্ষমতার বণ্টন ও ব্যবহারের দ্বারা প্রভাবিত মূল্যের কর্তৃত্ব সম্পন্ন বণ্টনের আলোচনা ’ । সাম্প্রতিক কালের মার্কিন লেখক ওয়ার্বি ( S. L. Wasby )-র মতানুসারে রাজনীতি , সরকার সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি ও তার আলোচনা থেকে উদ্ভূত সহায়ক বিষয় সমূহের আলোচনা হল রাষ্ট্রবিজ্ঞান । 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মার্কসবাদী সংজ্ঞা

আবার মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে সমাজের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রনীতি ও সরকারের আলোচনা করা দরকার । সুতরাং মার্কসীয় দৃষ্টিতে সংক্ষেপে রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজের শ্রেণী সম্পর্ক এবং শ্রেণী সংগ্রাম সম্পর্কিত আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ ৷

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিবর্তনশীল পরিধির কথা স্মরণ করে একটি ব্যাপকতর সংজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে :- ‘ রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল এমন এক সামাজিক বিজ্ঞান যেখানে রাষ্ট্র ও রাজনীতির দার্শনিক , সাংগঠনিক , প্রশাসনিক প্রসঙ্গ ,  জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও সাংগঠনিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ এবং বহুবিধ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তুলনামূলক প্রসঙ্গের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা ও পর্যালোচনা চলে ’ । 

বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা প্রশাখার বিশেষ সংযোগ সাধিত হয়েছে । তার ফলে এই সামাজিক বিজ্ঞানটির প্রকৃতি ও পরিধি পরিবর্তিত হয়েছে । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই পরিবর্তনশীল প্রকৃতি হল সদা পরিবর্তনশীল ইতিহাস ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ফল ।

error: Content is protected !!