তালিকোটার যুদ্ধ

তালিকোটার যুদ্ধ 

তালিকোটার যুদ্ধ ( ১৫৬৫ খ্রি: ) বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল । এই যুদ্ধ বাণিহাট্টির যুদ্ধ বা রাক্ষস তড়ঙ্গির যুদ্ধ নামেও পরিচিত । 

রাম রায়ের ভূমিকা 

তালিকোটার যুদ্ধের জন্য বিজয়নগরের ক্ষমতাবান অভিজাত রাম রায় দায়ী বলে অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন । কৃষ্ণদেব রায়ের মৃত্যুর পর বিজয়নগর রাজ্যে উপযুক্ত ব্যক্তিত্বের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে । রাজপরিবারের অন্তর্কলহের ফলে দরবারে দলীয় রাজনীতি বিস্তার লাভ করে । জনৈক রাম রায় ( অরবিডু ) অভিজাতদের একটি গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন । রাজা অচ্যুত রায় রাম রায়ের সাথে সমঝােতা করে কয়েকটা বছর কাটিয়ে দেন । নিজ দক্ষতা আর উচ্চাকাঙক্ষার সমন্বয় সাধন করে রাম রায় রাজ্যের প্রায় সব ক্ষমতাই হস্তগত করেন । রাজা রাম রায়ের ঔদ্ধত্য মেনে নিলেও , তাঁর দাপটে অন্যান্য অভিজাত ও উচ্চপদস্থ কর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন । কিন্তু সব বিদ্রোহকেই তিনি কঠোর হাতে দমন করেন । 

তালিকোটার যুদ্ধের কারণ

রাম রায় নিঃসন্দেহে উদ্যোগী পুরুষ ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে তিনি এমন কয়েকটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন , যা তাঁর ও সমগ্র সাম্রাজ্যের পক্ষে বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা দরকার যে ইতিমধ্যে বাহমনী সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে পাঁচটি স্বতন্ত্র মুসলমান রাজ্যের উদ্ভব হয়েছে । এগুলি হল বিজাপুর , গোলকুণ্ডা , আহম্মদ নগর , বেরারবিদর । 

রাম রায় এই সব নবগঠিত মুসলমান রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে থাকেন । তাঁর নীতি ছিল এই সব মুসলিম রাজ্যের পরস্পরের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রেখে তাদের উপর কর্তৃত্ব করা কিংবা তাদের দুর্বল করে তোলা । প্রথমে তিনি বিজাপুরকে পরাজিত করে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন । অতঃপর বিজাপুরের সাথে যুগ্মভাবে আহম্মদ নগর ও গোলকুণ্ডাকে পরাজিত করেন । তিনি সর্বদাই একটি রাজ্যের বিরুদ্ধে আর একটি রাজ্যকে প্ররোচিত করে চলেন । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই রাম রায়ের এই হীন কূটনীতি মুসলমান শাসকদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে । তাছাড়া রাম রায়ের ব্যক্তিগত আচার আচারণও ছিল খুব অমার্জনীয় । 

রবার্ট সিওয়েল ( R. Sewell ) লিখেছেন যে , রাম রায় দক্ষিণী সুলতানদের বসার অনুমতিও দিতেন না । পরন্তু রাম রায়ের বাহিনী যুদ্ধকালে মুসলমান বন্দীদের উপর খারাপ ব্যবহার করত । এই সব কারণে মুসলমান সুলতানেরা রাম রায়ের উপর ক্ষুব্ধ হন । রাম রায় বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে যখন বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার রাজ্যাংশ দখল করেন , তখনই সুলতানেরা রাম রায়ের বিরুদ্ধে মৈত্র সংঘ গঠন করেন ।  

যুদ্ধ ও ফলাফল 

বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহের নেতৃত্বে বিজাপুর , গোলকুণ্ডা , আহম্মদনগর ও বিদরের বাহিনী তালিকোটার প্রান্তরে বিজয়নগর বাহিনীর মুখোমুখি হয় । সম্মিলিত সুলতানি বাহিনীর কাছে রাম রায়ের বাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় । প্রায় একলক্ষ হিন্দু সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারায় । যুদ্ধ জয়ী মুসলমান সৈন্যরা চূড়ান্ত তাণ্ডব চালিয়ে বিজয়নগরীকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয় ।  

সিওয়েল  মনে করেন , সম্ভবত ইতিহাসে এতবড় তাণ্ডব আর হয়নি । বস্তুত সেনাবাহিনীর তাণ্ডবে সমগ্র নগরীর সুদৃশ্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নিদর্শন ধূলুণ্ঠিত হয়েছিল । তারা লুটপাট করেছিল খুশীমত । পুনরায় জেগে ওঠার মত কোন উপাদানই আর বিজয়নগরের অবশিষ্ট ছিল না । এইভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়ের মধ্য দিয়ে যে বিজয়নগরের প্রতিষ্ঠা নিয়তির পরিহাসে আর মানুষের হঠকারিতায় আবার মুসলমানদের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটে , এরপর আরো একশত বছর বিজয়নগর টিকেছিল ঠিকই কিন্তু তার গৌরবের দিন আর ফিরে আসেনি । দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতেও তার কোন বিশেষ ভূমিকা ছিল না ।

error: Content is protected !!