ইলিয়াস শাহী বংশের অবদান

ইলিয়াস শাহী বংশের অবদান 

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন । তাঁর সময় থেকে ইলিয়াস শাহী বংশের অভ্যুত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলার শাসকেরা কখনো স্বাধীন থেকেছেন কখনো দিল্লী সুলতানির অধীনে থেকেছেন । ইলতুৎমিস বা বলবনের মত দক্ষ শাসকদের আমলে বাংলায় দিল্লীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল । তবে দিল্লীর সুলতানগণ কখনও বাংলাকে কার্যকরীভাবে দিল্লীর অধীনে আনতে পারেননি । ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দে মহম্মদ বিন তুঘলক মুসলিম অধিকৃত বাংলাকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করে প্রতিটি অঞ্চলে একজন করে শাসক নিযুক্ত করেন । এই তিনটি বিভাগ ছিল — লক্ষ্মণাবতী বা লখনৌতি , সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও ।  

সোনারগাঁও এর শাসনকর্তা বাহরাম শাহ এর মৃত্যু হলে ( ১৩৩৮ খ্রীঃ ) তাঁর একজন অনুচর ফকরউদ্দিন সোনারগাঁও এর শাসন ক্ষমতা দখল করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । এই অবস্থায় অপর দুটি বিভাগে শাসন কর্তাদ্বয় কাদর খাঁ ইজুদ্দিন যুগ্মভাবে ফরউদ্দিনকে আক্রমণ ও বিতাড়িত করেন । কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই কাদর খাঁ’র মৃত্যু হলে তাঁর জনৈক অনুচর আলি মোবারক লক্ষ্মণাবতীর শাসন ক্ষমতা দখল করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন । ইতিমধ্যে মহম্মদ তুঘলকের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে । এই সুযোগে হাজী ইলিয়াস শাহ মোবারককে পরাজিত করে লক্ষ্মণাবতীর সিংহাসন দখল করেন ( ১৩৪২ খ্রীঃ ) । পরের বছরই তিনি সোনারগাঁও দখল করে নেন । এইভাবে বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন শুরু হয় ।  

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ

বাংলার সিংহাসনে বসে ইলিয়াস শাহ ( ১৩৪২-৫৭ খ্রীঃ ) শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ উপাধি ধারণ করেন । যদুনাথ সরকারের  ভাষায়ঃ “ ইলিয়াস শাহ লক্ষ্মণাবতীর সিংহাসনে বসার সাথে সাথে বাংলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল । ” অধ্যাপক নুরুল হাসানের  মতে , ইলিয়াস শাহ বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ যুগের সূত্রপাত করেন ।  

এক কথায় ইলিয়াস শাহ বাংলার ইতিহাসে দুশো বছরের স্বাধীন ও গৌরবময় সুলতানির সূচনা করেন । সিংহাসনে বসার পর ইলিয়াস শাহ রাজ্য বিস্তারে মন দেন । সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও দখলের পর তিনি বিহারের ত্রিহূত আক্রমণ করেন এবং দখল করেন । তারপর একে একে গোরক্ষপুর , চম্পারণ ও বারাণসী অধিকার করেন । অতঃপর তিনি নেপাল আক্রমণ করেন ( ১৩৪৬ খ্রীঃ ) । তাঁর বাহিনী নেপালের কাঠমাণ্ডু দখল করে অবাধ লুণ্ঠন চালায় । এরপর উড়িষ্যা আক্রমণ করেও তিনি প্রচুর ধন সম্পদ লাভ করেন ।  

ইলিয়াস শাহের সাফল্যে ও ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলাদেশ আক্রমণ করেন ( ১৩৫৩ খ্রীঃ ) । কিন্তু ইলিয়াস শাহ সুলতানকে কোনরূপ বাধা দিয়ে দিনাজপুরের একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন । ফিরোজ শাহ বিনা বাধায় বাংলার রাজধানী দখল করার পর একডালা দুর্গ অবরোধ করেন । এই দুর্গটি ছিল দুর্ভেদ্য এবং চতুর্দিকে নদী দ্বারা বেষ্টিত । দীর্ঘদিন অবস্থান করেও একডালায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরোজ দিল্লী ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন । দুর্গ দখল করতে না পারলেও এই অবরোধের ফলে বাংলার প্রভূত ক্ষতি হয়েছিল ।  

যাই হোক , শেষ পর্যন্ত ইলিয়াসের সাথে ফিরোজ শাহর সন্ধি স্থাপিত হয়েছিল । ইলিয়াস বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ দু’বার দিল্লীতে নজরানা প্রেরণ করেছিলেন । দিল্লীর সাথে শান্তি স্থাপনের পর ইলিয়াস শাহ কামরূপ আক্রমণ করেন ( ১৩৫৭ খ্রীঃ ) । তবে এই অভিযানের ফলাফল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি ।  

ইলিয়াস শাহ সুশাসক ছিলেন । তাঁর আমলে কেন্দ্রীয় শাসন যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠেছিল । তিনি পাণ্ডুয়াতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন । ঐ সময় পাণ্ডুয়া শিল্প স্থাপত্যে বিখ্যাত হয়ে ওঠে । তিনি হাজীপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন এবং ফিরোজাবাদে একটি সুবিশাল জলাধার নির্মাণ করেন । তাঁর মৃত্যুর তারিখ সম্বন্ধে মতভেদ আছে । তারিখ ই মোবারক শাহী নামক গ্রন্থ অনুযায়ী ১৩৫৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মারা যান । কিন্তু মুদ্রা ইত্যাদি থেকে অনুমিত হয় ১৩৫৭ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর জীবনাবসান হয়েছিল । 

সিকান্দার শাহ  

ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন । পিতার ন্যায় তিনিও ছিলেন সুযোদ্ধা , বিচক্ষণ ও সুদক্ষ প্রশাসক । তিনিও দিল্লীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন । এই উদ্দেশ্যে তিনি একাধিকবার উপঢৌকন সহ দিল্লীতে দূত প্রেরণ করেন ।  

তৎসত্ত্বেও দিল্লীর সাথে তাঁর সংঘাত ঘটেছিল । দিল্লীর সুলতান বাংলার উপর ক্ষুব্ধই ছিলেন । ইলিয়াস শাহের আমলে বাংলা অভিযানের ব্যর্থতা তিনি ভুলতে পারেননি । সে উদ্দেশ্যে সোনারগাঁও এর ভূতপূর্ব শাসনকর্তার জামাতা জাফর খাঁ সুলতানকে বাংলা অভিযানে প্ররোচিত করতে থাকেন । এই অবস্থায় পূর্ব ব্যর্থতার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ফিরোজ বিরাট বাহিনী সহ বাংলা অভিযান করেন ( ১৩৫৯ খ্রীঃ ) । সিকান্দার পিতার মতই একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন । এবারেও দীর্ঘদিন অবরোধের পর ফিরোজ ফিরে যেতে বাধ্য হন । অবশ্য সিকান্দার ফিরোজ শাহকে কিছু উপঢৌকন প্রেরণ করে বন্ধুত্ব বজায় রাখেন । এরপর দীর্ঘকাল বাংলাদেশ দিল্লী সুলতানির অধীনতা মুক্ত থাকে ।  

সিকান্দারের শেষ জীবন খুব কষ্টে কাটে । তাঁর পুত্রদের মধ্যে আত্মকলহ শুরু হয় । শেষ পর্যন্ত নিজ কনিষ্ঠ পুত্রের হাতেই তিনি নিহত হন ( ১২৮৯ খ্রীঃ ) ।  

সিকান্দারের শিল্পানুরাগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তিনি পাণ্ডুয়াকে বহু সুদৃশ্য মসজিদ ও প্রাসাদ সুসজ্জিত করেন । পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ তার এক অনবদ্য কীর্তি । ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে , আদিনা মসজিদের মত এত বড় মসজিদ ভারতে আর কখনো নির্মিত হয়নি । এটি দামাস্কাসের বিশ্বখ্যাত মসজিদের সমতুল্য ছিল । এছাড়া গৌড়ের কোতোয়ালী দরওয়াজা , হুগলীর মোল্লা সিমলা প্রভৃতি মসজিদ সিকান্দারের শিল্প প্রীতির পরিচয় বহন করে ।  

ইলিয়াস শাহী বংশের পতন 

সিকান্দারের পরে সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ । তিনি ছিলেন বিশেষ জনপ্রিয় সুলতান । কামতাপুরের বিরুদ্ধে অভিযান করে তিনি ব্যর্থ হন । তবে চীন দেশের সাথে তাঁর দূত বিনিময় হয় । তাঁর আমলেই চৈনিক দোভাষী মা হুয়ান বাংলাদেশে আসেন । মা হুয়ানের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে তৎকালীন বাংলার নানা বৃত্তান্ত জানা যায় ।

গিয়াস উদ্দিনের পর দুর্বল বংশধরদের আমলে সামন্তরাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে । এইরূপ পরিস্থিতিতে ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান শিহাব উদ্দিন বায়েজিদ শাহকে ক্ষমতা চ্যুত করে দিনাজপুরের একজন সামন্ত গণেশ বাংলার সিংহাসন দখল করেন ( ১৪১৪ খ্রীঃ ) । প্রায় আঠাশ বছর পর নাসিরুদ্দিন মামুদ বাংলাদেশে ইলিয়াস শাহী শাসনের পুনঃ সূচনা করেন । ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে এই বংশের শেষ সুলতান জালালউদ্দিন ফতেশাহকে হত্যা করে একজন হাবসী ক্রীতদাস বাংলার সিংহাসন দখল করলে বাংলার গৌরবময় ইলিয়াস শাহী বংশের শাসনের অবসান ঘটে ।

error: Content is protected !!