লোদী বংশ

লোদী বংশ

মুলতানের শাসনকর্তা বাহলুল লোদী সৈয়দ বংশের সুলতান আলাউদ্দিন শাহর অকর্মণ্যতার সুযোগে ও দিল্লীবাসীর সমর্থনে ১৪৫১ খ্রীষ্টাব্দে দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন । এঁরা জাতিতে ছিলেন আফগান । দিল্লী সুলতানির সূচনা থেকেই সামরিক বাহিনীতে আফগানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল । ফলে লোদী বংশ শাসন পরিচালনায় বিশেষ শক্তি লাভ করেছিল । এই বংশের শাসকরা প্রায় ৭৫ বছর রাজত্ব করেন । তবে কয়েকটি কারণে এঁরাও সুদৃঢ় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেননি । যেমন 一

( ১ ) দিল্লীর পার্শ্ববর্তী স্বাধীন রাজ্য সমূহের শাসকেরা লোদী বংশের আধিপত্য মানতে চাননি । ফলে লোদীদের সর্বদা প্রতিবেশী আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে । 

( ২ ) দিল্লী সুলতানির অব্যবস্থার ফলে অধিকাংশ আমীর মালিক ও জায়গিরদার প্রায় স্বাধীনভাবে জায়গির ভোগ করত । লোদী রাজারা তাদের উপর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব আরোপে সচেষ্ট হলে তারা রুষ্ট হয় । 

( ৩ ) যে আফগান অভিজাতদের সহায়তায় বাহলুল লোদী শাসনকে সুরক্ষিত করেছিলেন , পরবর্তীকালে তারাই কেন্দ্রীকরণ নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন । 

বাহলুল লোদী

সিংহাসনে আরোহণ করেই বাহলুল বিচ্ছিন্নতাকামী স্থানীয় শাসকদের দমন করতে সচেষ্ট হন । প্রথমে তিনি মুলতানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন , কিন্তু একই সময়ে জৌনপুরের শাসক মাহমুদ শাহ দিল্লী আক্রমণ করলে বাহলুল মুলতান অভিযান বন্ধ রেখে দিল্লী ফিরে আসেন এবং মাহমুদ শাহকে বিতাড়িত করেন । এরপর তিনি দোয়াবে দিল্লীর কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপিত করেন এবং জৌনপুরকে দিল্লী সাম্রাজ্যভুক্ত করেন । ১৪৮৯ খ্রীষ্টাব্দে গোয়ালিয়র জয় করে প্রত্যাবর্তনের কালে পথের মধ্যে অসুস্থ হয়ে বাহলুল মারা যান । যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকার ফলে তিনি অভ্যন্তরীণ শাসন সংরক্ষণে মনোযোগ দিতে পারেননি । 

সিকান্দার লোদী 

বাহলুল লোদীর মৃত্যুর পর তাঁর তৃতীয় পুত্র নিজাম খাঁ ‘ সিকান্দার লোদী ’ উপাধি নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন ( ১৪৮৯ খ্রীঃ ) । ক্ষমতালোভী আত্মীয় পরিজন ও প্রাদেশিক শাসকদের কঠোর হস্তে দমন করে তিনি সুলতানির মর্যাদা বহুলাংশে পুনরুদ্ধার করেন । তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তথা জৌনপুরের শাসনকর্তা বারবাক শাহ বিদ্রোহী হলে সিকান্দার তা দমন করেন । এই সুযোগে জৌনপুরের প্রাক্তন শাসক হুসেন শাহ শার্ক জৌনপুর পুনর্দখলের চেষ্টা করেন । সিকান্দার তাকে বারাণসীর যুদ্ধে পরাজিত করে বিহারে বিতাড়িত করেন । তিনি বিহার ও ত্রিহুত জয় করেন । বাংলার সুলতান হুসেন শাহর সঙ্গে সিকান্দার একটি সন্ধি স্থাপন করেন ।  

সিকান্দার শাহ রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপনে সমর্থ হয়েছিলেন । তিনি জায়গিরদারদের নিয়মিত হিসেবপত্র দাখিল করতে বাধ্য করেন । সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তিনি আমীর ওমরাহদের কতকগুলি নিয়মকানুন মেনে চলার নির্দেশ দেন । দরবারেও কয়েকটি আদব কায়দা প্রচলন করেন । বহুসংখ্যক গুপ্তচর নিয়োগ করে তিনি রাজ্যের খবর সংগ্রহের সুব্যবস্থা করেন । ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে তিনি ন্যায় বিচারের ব্যবস্থা করেন । তাঁর আমলে কৃষি ও বাণিজ্যের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল । তিনি শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । আগ্রা নগরীর নির্মাণ তাঁর অনন্য কীর্তি । তবে ধর্মীয় ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনুদার । তিনি বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেন । এমনকি থানেশ্বর হিন্দুদের পুণ্যস্নানও নিষিদ্ধ করে দেন । 

ইব্রাহিম লোদী 

সিকান্দার লোদীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইব্রাহিম লোদী সিংহাসনে রসেন ( ১৫১৭ খ্রীঃ ) । ইব্রাহিমের সাহসিকতা ও দক্ষতা ছিল , কিন্তু দূরদৃষ্টি ছিল না । যাই হোক , তাঁর সিংহাসনে আরোহণকালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা জালাল খাঁ জৌনপুরের শাসনকর্তা ছিলেন । কিন্তু এটি ইব্রাহিমের মনঃপূত ছিল না । তাই তিনি জৌনপুরের আফগান অভিজাতদের জালালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণায় প্ররোচিত করেন এবং সেই সুযোগে জালালকে বন্দী ও হত্যা করে নিশ্চিন্ত হন ।

রাষ্ট্র শাসন ব্যাপারে তিনি আফগান অভিজাতদের অতিরিক্ত সুযোগ ও মর্যাদা দানের বিরোধী ছিলেন । তাঁর রাজতন্ত্রের আদর্শ ছিল খলজী বা তুঘলকদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ । তিনি নিজ মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য কয়েকটি নিয়ম অবশ্য পালনীয় বলে ঘোষণা করেন । যেমন সুলতান দরবারে এলে সবাইকে করজোড়ে নতমস্তকে দাঁড়াতে হবে ইত্যাদি । ফলে আফগান অভিজাতশ্রেণী তার শত্রুতে পরিণত হয় । ইব্রাহিমকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য তারা ষড়ষন্ত্র লিপ্ত হয় এবং সুলতানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে । কারা থেকে কনৌজ , —এই বিস্তৃত অঞ্চলে আফগান সর্দাররা বিদ্রোহ ঘোষণা করে । ইব্রাহিম এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এই বিদ্রোহ দমন করেন । বহু আফগান নিহত হয় , অনেককে তিনি বন্দী করেন এবং অনেককে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন ।  

লোদী বংশের পতন 

ইব্রাহিম লোদীর আত্মগর্বী মানসিকতা অন্যান্য আফগান অভিজাতদের প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে । অতঃপর অভিজাতরা আরও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং বিদেশী শক্তির সাহায্যে তাঁর পতন ঘটাতে উদ্যোগী হন । পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ ও গুজরাটের শাসনকর্তা আলম খাঁ কাবুলের অধিপতি মুঘল বংশধর বাবরকে দিল্লী আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান । বাবর সসৈন্যে দিল্লী অভিমুখে রওনা হন । ইব্রাহিম পানিপথের প্রান্তরে বাবরকে বাধা দিলে উভয়পক্ষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় । এটিই পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ( ১৫২৬ খ্রীঃ ) নামে খ্যাত । আফগান অভিজাতদের সহায়তায় বাবর ইব্রাহিমকে পরাজিত করেন । যুদ্ধ ক্ষেত্রে ইব্রাহিম নিহত হন । অবশ্য পরিণামে ষড়যন্ত্রকারী আফগানদের কোন লাভ হল না । কারণ উচ্চাকাঙক্ষী বাবর অতঃপর দিল্লীর সিংহাসন দখল করে মুঘল শাসনের সূচনা করেন ।

error: Content is protected !!