আলাউদ্দিন খলজীর কৃতিত্ব

আলাউদ্দিন খলজীর কৃতিত্ব

খলজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা তথা পিতৃব্য জালালউদ্দিন খলজীকে হত্যা করে আলাউদ্দিন দিল্লীর সিংহাসনে বসেন ( ১২৯৬ খ্রীঃ ) । অতঃপর চতুরতা ও কঠোরতার সংমিশ্রণে খলজী মালিকদের বশীভূত করে তিনি নিজ সিংহাসনকে সুনিশ্চিত করেন । আলাউদ্দিন ছিলেন সুযোদ্ধা ও সুদক্ষ প্রশাসক । একই সাথে রাজ্যজয় এবং প্রশাসনিক সংস্কার প্রবর্তনে তিনি যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন , তা সত্যই অভূতপূর্ব ।  

সাম্রাজ্যবাদের আদর্শ ও উদ্দেশ্য

ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্যবাদের সূচনা আলাউদ্দিনের সময় থেকেই ঘটে । বলবন কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন সামরিক বিধিব্যবস্থা আলাউদ্দিনের বিজয় অভিযানকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল । এমনকি নিজের সুদক্ষ ও বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে আলাউদ্দিন গ্রীকবীর আলেকজাণ্ডারের মত বিশ্ববিজয়েরও স্বপ্ন দেখতেন । তিনি সিকান্দার ই সানি অর্থাৎ দ্বিতীয় আলেকজান্ডার উপাধিও গ্রহণ করেছিলেন । অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিজয়ের পরিকল্পনা ত্যাগ করে তিনি ভারত বিজয়ে মনোনিবেশ করেন ।  

দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারত এর একাধিক রাজ্যের বিরুদ্ধে আলাউদ্দিন সমরাভিযান চালিয়েছেন । তবে নিছক সাম্রাজ্য সীমা বিস্তারের কারণেই এইসব অভিযান রচিত হয়নি । রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সম্পূর্ণতা লাভ করার উদ্দেশ্যও তাঁর ছিল ।  

রণথম্ভোর , চিতোর প্রভৃতি দুর্গগুলির উপর উত্তর ভারতের নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভর করত । তা ছাড়া , গুজরাট ও মালবের বন্দরগুলির সাথে বহির্ভারতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল । এই অঞ্চলের ভূমি ছিল উর্বর এবং সুফসলী । আবার দক্ষিণ ভারত ছিল ধনৈশ্বর্যে পরিপূর্ণ । ঐ বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য । তাই উত্তর ভারতের বিজিত অঞ্চলগুলিকে তিনি সরাসরি সুলতানি কর্তৃত্বে এনেছিলেন , কিন্তু দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিকে বার্ষিক কর প্রদানের শর্তে স্ব স্ব রাজাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । 

আলাউদ্দিন খলজির উত্তর ভারত বিজয়

আলাউদ্দিন প্রথম অভিযান করেন গুজরাটের রাজা কর্ণদেবের বিরুদ্ধে ( ১২৯৭ খ্রীঃ ) । সুলতানি বাহিনী খুব সহজেই গুজরাট দখল করে । এই সময় সোমনাথ মন্দির লুন্ঠিত হয় । এই সময় ক্যাম্বে বন্দরও লুন্ঠিত হয় । এখান থেকেই এক সুদর্শন যোদ্ধা মালিক কাফুরকে দিল্লীতে আনা হয়েছিল । এই মালিক কাফুরই গুজরাট পরবর্তীকালে আলাউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন ।  

অতঃপর আলাউদ্দিন রণথম্ভোর আক্রমণ করেন ( ১২৯৯ খ্রীঃ ) রণথম্ভোরের অধিপতি হামিরদেব কিছু বিদ্রোহী নব মুসলমানকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আলাউদ্দিনের বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন । প্রথম আক্রমণে সুলতানি বাহিনী পরাজিত হলে আলাউদ্দিন স্বয়ং দ্বিতীয় আক্রমণের নেতৃত্ব দেন । দীর্ঘ তিনমাস পরে রণথম্ভোর দুর্গের পতন ঘটে । আলাউদ্দিনের সঙ্গী কবি আমীর খসরু এই যুদ্ধে রাজপুত বীরদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন । মুসলমানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বহু রাজপুত রমণী অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন করেন ।  

আলাউদ্দিনের পরবর্তী অভিযান হল শক্তিশালী রাজপুত রাজ্য মেবারের বিরুদ্ধে ( ১৩০৩ খ্রীঃ ) । মেবারের রাজধানী চিতোর এর দুর্গটি ছিল দুর্ভেদ্য । মেবার প্রকাশ্যে মুসলিম শাসনের বিরোধিতা করে আসছিল । পরন্তু মেবারের রানা রতন সিংহ তার রাজ্যের মধ্য দিয়ে আলাউদ্দিনকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে গুজরাট যেতে দিতে অসম্মত হওয়ায় আলাউদ্দিন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ।  

আবার কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে , রানী মেবারের পদ্মিনীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে লাভ করার জন্য আলাউদ্দিন মেবার আক্রমণ করেছিলেন । যাই হোক , ঐতিহাসিক জি. ওঝা , কে. এস. লাল  প্রমুখের মতে , এ কাহিনী ঠিক নয় । কারণ সমসাময়িক লেখক বরণী , খসরু বা ইসামীর রচনায় পদ্মিনী কাহিনী পাওয়া যায় না ।  

দীর্ঘ সাত মাস যুদ্ধের পর চিতোরের পতন ঘটে । অতঃপর আলাউদ্দিন নিজপুত্র খিজির খা’কে মেবারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন । অবশ্য রাজপুতদের ক্রমাগত বাধাদানে বিরক্ত হয়ে খিজির খাঁ মেবার ছেড়ে চলে আসেন । আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর মেবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে ।  

এরপর আলাউদ্দিন মালব , মাড়াবার ও জলোর দখল করেন । তবে নিয়মিত কর প্রদানের শর্তে এইসব স্থানের রাজপুত রাজাদের শাসনভার অক্ষুন্ন রাখা হয়েছিল । অন্যান্য রাজ্য এইভাবে কাশ্মীর , অসম ও পাঞ্জাবের একাংশ বাদে সমগ্র উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্য স্থাপিত হয়েছিল । 

আলাউদ্দিন খলজির দক্ষিণ ভারত অভিযান 

উত্তর ভারত বিজয় সম্পূর্ণ করে আলাউদ্দিন দক্ষিণ ভারত বিজয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন । পূর্ববর্তী সুলতান জালালউদ্দিনের রাজত্বকালে আলাউদ্দিন আকস্মিকভাবে দেবগিরি আক্রমণ করে প্রচুর ধনরত্ন লাভ করেছিলেন । তাই নিজে সুলতান হয়ে দক্ষিণ ভারতের প্রভূত ধন সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যেই প্রধানত তিনি দক্ষিণ ভারতে একাধিক অভিযানে ব্রতী হয়েছিলেন । যাই হোক , সেই সময়ে দক্ষিণ ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের বিরুদ্ধে আলাউদ্দিন যুদ্ধযাত্রা করেন ।  

১৩০৬-০৭ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দেবগিরি রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন । তখন দেবগিরির রাজা ছিলেন রামচন্দ্র দেব । গুজরাটের রাজা কর্ণদেবকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য এবং বাৎসরিক কর নিয়মিত প্রেরণ না করার দেবগিরি জন্য রামচন্দ্র দেব আলাউদ্দিনের বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন । কাফুর খুব সহজেই দেবগিরি দখল করেন এবং রামচন্দ্র আলাউদ্দিনের বশ্যতা স্বীকার করেন । তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিল্লীতে আনা হয় । সুলতান তাকে ‘ রায় রায়ন ’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং এক লক্ষ তঙ্কা দান করেন । উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় । নিজ রাজ্য ছাড়াও আলাউদ্দিন তাকে গুজরাটের একটি জেলার শাসন দায়িত্ব দান করেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , এখান থেকেই কর্ণদেবের কন্যা দেবলা দেবীকে দিল্লীতে আনা হয় এবং আলাউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র খিজির খার সাথে বিবাহ দেওয়া হয় ।  

বরঙ্গলের বিরুদ্ধে তাঁর প্রথম অভিযান ( ১৩০২ খ্রীঃ ) ব্যর্থ হয়েছিল । তাই এবার পূর্ণশক্তি নিয়ে তিনি প্রথম পরাজয়ের গ্লানি মোছার উদ্যোগ নেন । মালিক কাফুর বরঙ্গলের কাতকীয় বংশের রাজা প্রতাপ রুদ্রদেবের বিরুদ্ধে অভিযান করেন । প্রতাপ রুদ্রদেব পরাজিত হয়ে ( ১৩০৯ খ্রীঃ ) আত্মসমর্পণ করেন এবং বার্ষিক করদানে স্বীকৃত হন । যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদও আলাউদ্দিন বহু অর্থ লাভ করেন । 

পরবৎসর আলাউদ্দিন মালিক কাফুরের নেতৃত্বে সুদূর দক্ষিণের মাবার বা পান্ড্য রাজ্যে অভিযান প্রেরণ করেন । দেবগিরি থেকে মাবার যাওয়ার পথে সুলতানি বাহিনী হোয়সল বংশীয় রাজা বীর বল্লালের রাজ্য দ্বার সমুদ্র আক্রমণ করে । বীর বল্লাল হোয়সল রাজ্য সুলতানকে বার্ষিক কর প্রদানের শর্তে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখেন । অবশ্য সুলতানি বাহিনী এখানেও লুঠতরাজ করতে ভুল করেনি । এরপর সুলতানি বাহিনী পান্ড্য রাজ্যের দিকে অগ্রসর হয় । এক্ষেত্রে দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র দেবের অনুচর সুলতানি বাহিনীর পথপ্রদর্শকের কাজ করেন । ঐ সময় পাণ্ড্য রাজপরিবারের মধ্যে এক ভ্রাতৃবিরোধ চলতে থাকায় কাফুর খুব সহজেই জয়লাভ করেন । সুলতানের বাহিনী এখানে বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে ও ধনৈশ্বর্য লুঠ করে । সেই সময়েই বিখ্যাত চিদাম্বরম মন্দিরটি বিধ্বস্ত হয় ।  

১৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে আলাউদ্দিন দেবগিরির বিরুদ্ধে আর একটি অভিযান প্রেরণ করেন । রামচন্দ্র দেবের পুত্র শঙ্কর দেব প্রতিশ্রুত অর্থপ্রদানে অস্বীকৃত হলে কাফুরের নেতৃত্বে অভিযান পাঠানো হয় । শংকর দেব পরাজিত ও নিহত হন । এইভাবে দক্ষিণ ভারতের চারটি বৃহৎ রাজ্য আলাউদ্দিনের কর্তৃত্বাধীনে স্থাপিত হয় । 

আলাউদ্দিনের দক্ষিণ ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । কে. এস. লালের  মতে , “ উত্তর ভারতে সুলতান মামুদের যা উদ্দেশ্য ছিল , দক্ষিণে আলাউদ্দিনের তাই ছিল । ” অর্থাৎ লুণ্ঠনই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য । কিন্তু অনেকে এই মতের বিরোধিতা করে বলেন যে , কেবল লুণ্ঠন নয় , দক্ষিণ ভারতকে করদ রাজ্যে পরিণত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য । 

আবার কেউ কেউ মনে করেন , দক্ষিণ ভারতের হিন্দুধর্মের প্রাধান্য নাশ করে ইসলামের প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল । কিন্তু সমকালীন লেখকেরা এই প্রসঙ্গে নীরব থেকেছেন । তাই এই বক্তব্যকে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না । যাই হোক , আলাউদ্দিন দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রে সমঝােতার নীতি অবলম্বন করেছিলেন ; এবং বিজিত রাজ্যগুলিকে সংযুক্তিকরণের পরিবর্তে বশ্যতা স্বীকারের শর্তে মুক্তি দিয়েছিলেন ।

error: Content is protected !!