সুফি আন্দোলন

সুফি আন্দোলন

সুফিবাদ খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতাব্দীতে ইসলাম ধর্মে এক সংস্কারকামী উদার মতবাদের উদ্ভব ও প্রসার ঘটে । এই আন্দোলন সুফিবাদ নামে পরিচিত । আরবি শব্দ ‘ সুফ ’ এর অর্থ পশম বা উল । বিশেষজ্ঞদের মতে , এই মতবাদের প্রচারক সন্তগণ এক বিশেষ ধরনের পশমের পোশাক পরতেন । সম্ভবত সেই থেকেই এঁরা সুফি নামে পরিচিতি লাভ করেন । এঁদের মতবাদ ‘ সুফিবাদ ‘ নামে অভিহিত হয় । 

সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ 

সুফিবাদের উৎস হল কোরান ও হজরত মহম্মদের বাণীইউসুফ হুসেন লিখেছেন , ইসলামের বক্ষদেশ থেকেই সুফিবাদের জন্ম ( Sufism was born in the bosom of Islam ) । পবিত্র কোরানে ত্যাগ , তিতিক্ষা , বৈরাগ্য ও আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । হজরত স্বয়ং ছিলেন অতীন্দ্রিয়বাদী এবং মরমি ( Mystic ) । সংযমী হওয়াকে হজরত ঈশ্বর লাভের অন্যতম শর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন । কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভোগ বিলাসের প্রাচুর্য দেখা যায় । এতে শঙ্কিত হয়ে কিছু সংস্কারক ইসলামের নিগূঢ় তত্ত্ব প্রচারে আগ্রহী হন এবং সুফিবাদের প্রচার শুরু করেন । 

ড. ইউসুফ হোসেন লিখেছেন , সুফিবাদ ইসলামধর্মের একটি অংশ । তফাৎ এই যে , গোঁড়া মুসলমানরা ধর্মাচরণের উপর জোর দেন , কিন্তু সুফিরা গুরুত্ব দেন অন্তরের শুদ্ধতাকে । ড. জাকারিয়া আনসারির মতে , সুফিবাদ শিক্ষা দেয় অনন্ত শান্তি লাভের জন্য কীভাবে আচরণ করতে হয় । সুফিবাদের মূল বিষয় হল আত্মার শুদ্ধি এবং প্রধান লক্ষ্য হল স্বর্গীয় আশীর্বাদ লাভ করা । 

সুফিবাদের সঙ্গে বৌদ্ধ ও হিন্দু যোগীদের মিল লক্ষ করা যায় । ড. সতীশচন্দ্রের মতে , ইসলামের আবির্ভাবের আগেই মধ্য এশিয়াতে বৌদ্ধধর্ম জনপ্রিয় ছিল । বুদ্ধের বহু কাহিনি ইসলামের লোকগাথায় প্রচলিত ছিল । ‘ অমৃত কুণ্ড ’ নামক যোগ সাধনার বই ফারসিতে অনূদিত হয়েছিল । সুফিবাদের আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে এগুলির সমাবেশ ঘটে । 

সুফিবাদের মূল কথা 

সুফিবাদের মতে , ত্যাগ ও ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বর লাভ সম্ভব । 

( i ) সুফিরা পৌত্তলিকতার বিরোধী এবং একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী । এঁদের মতে , ঈশ্বর হলেন এক এবং সবকিছুই ঈশ্বরের অংশ । এঁরা প্রচার করেন ‘ আসক্তি ’ থেকেই আসে ভোগ প্রবণতা ; এবং ভোগ প্রবণতা পাপের জন্ম দেয় , যার জন্য ব্যক্তি ক্লেশ ভোগ করে । এজন্য সুফি সন্তরা সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করতেন । তবে তাঁরা নির্জন পাহাড়ে না থেকে লোকালয়ে থেকেই নিজেদের বাণী প্রচার করতেন । 

( ii ) একটি মত অনুসারে সুফি সাধনার দশটি স্তর ছিল , যথা— তওবা ( অনুশোচনা ) , ওয়ারা ( নিবৃত্তি ) , জুহদ ( ধার্মিকতা ) , ফকর ( দারিদ্র্য ) ) , সবর ( সহ্য করা ) , শুকর ( কৃতজ্ঞতা ) , খুফ ( অন্যায়কে ভয় ) , রজা ( ঈশ্বরের করুণালাভের ইচ্ছা ) , তওয়াস্কূল ( আনন্দে – বিষাদে অচঞ্চল থাকা ) এবং রিজা ( ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ ) । এই স্তরগুলি অতিক্রম করলে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া যায় । 

( iii ) হিন্দুধর্মের ন্যায় সুফিধর্মে গুরুশিষ্যর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ । গুরুকে কেন্দ্র করেই সুফি সন্ন্যাস জীবন আবর্তিত হয় । গুরুকে বলা হয় পির বা খাজা । পিরদের কর্মকেন্দ্রকে বলা হয় দরগা বা খানকা । 

বিভিন্ন সুফি সম্প্রদায় 

দ্বাদশ শতকের মধ্যে সুফিরা প্রায় বারোটি ‘ সম্প্রদায় ’ বা ‘ সিলসিলা ‘ য় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল । তার মধ্যে ‘ চিশতী ’ ও ‘ সুরাবর্দী ’ সম্প্রদায় সুলতানি যুগে বিশেষ প্রাধান্য লাভ করেছিল । 

চিশতী সম্প্রদায় : ভারতে ‘ চিশতী ’ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মইনুদ্দিন চিশতি । তাঁর প্রধান কর্মকেন্দ্র ছিল আজমীর । তবে মইনুদ্দিন নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি । ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন । তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বখতিয়ার কাকী । এই সম্প্রদায়ের নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ( ১২৩৮-১৩২৫ খ্রি . ) ছিলেন কিংবদন্তি পুরুষ । তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ও উদার মতামতে আকৃষ্ট হয়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন । বিখ্যাত কবি আমীর খসরু ও ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনী তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন । 

সুরাবর্দী সম্প্রদায় : সুরাবর্দী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ শিবাহউদ্দিন সুরাবর্দী । এই সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তা ছিল পাঞ্জাব , মুলতান ও পূর্ববঙ্গে । চিশতী সম্প্রদায়ের সঙ্গে এঁদের নীতিগত ও কার্যপদ্ধতিগত কিছু প্রভেদ ছিল । যেমন , এঁরা রাজ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা সরকারি পদ গ্রহণ করতেন । এই গোষ্ঠীর আর এক জনপ্রিয় সাধক ছিলেন হামিদ উদ্দিন নাগরী । 

অন্যান্য সম্প্রদায় : আল কাদেরীফিরদৌসি নামক আরও দুটি সুফি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ভারতে ছিল । তবে এঁদের অনুগামীদের সংখ্যা ছিল খুব কম । 

সুফিবাদের প্রভাব 

ভারতীয় সমাজ ও জনজীবনে সুফিবাদের গভীর প্রভাব ছিল । 

( i ) সুফিদের সহজ সরল জীবনযাত্রা , নীতিবোধ ও সাম্যচেতনা নানাস্তরের মানুষকে একত্রিত হতে উদ্বুদ্ধ করে । জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের সমাবেশ সামাজিক উত্তেজনার অবসান ঘটায় । 

( ii ) সুফিবাদের সহনশীল ধর্মনীতি বহু হিন্দুকে ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে । ইসলাম ধর্মের সহিষ্ণুতার সুফিতত্ত্ব সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভেদ দূর করে সহাবস্থানের পটভূমি তৈরি করে দেয় । 

( iii ) সুফি সাধকরা ‘ ইসলামের ভারতীয়করণ ’ করেন । সুফিবাদের সংস্পর্শে এসে বহু মুসলিম শাসক ও অভিজাত ধর্মক্ষেত্রে সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেন । ফলে রাষ্ট্রীয় ঐক্য সুদৃঢ় হয় । মোগল সম্রাট আকবরের আমলে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার যে প্রকাশ দেখা যায় তার সূচনা সুলতানি আমলে সুফিবাদের দ্বারাই ঘটেছিল । 

( iv ) অধ্যাপক সিদ্দিকির মতে , সামাজিক সচলতার ( Mobility ) উপাদান ছিল সুফি দর্শনে । সুফিবাদের সাম্যভাবনা সামাজিক দিক থেকে নিম্নস্তরের বহু মানুষকে উচ্চক্রমে উত্তরণে সাহায্য করেছিল । 

( v ) শিক্ষা ও সাহিত্যের বিকাশে সুফিবাদের বিশেষ অবদান ছিল । সুফিদের খানকা গুলি বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞান অর্জনের বিশেষ কেন্দ্র ছিল । এখানে সমবেত হয়ে দীন-দরিদ্রসহ বহু মানুষ শিক্ষা নিতে পারত । 

( vi ) সুফি সাধকরা হিন্দি ভাষায় তাঁদের কথা প্রচার করতেন । কবিতা ও গান লিখতেন হিন্দিতে । ফলে তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় । হিন্দি ভাষার বিকাশে সুফিদের অবদান অনস্বীকার্য ।

error: Content is protected !!