সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্প ও চিত্রকলা

সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্প ও চিত্রকলা  

সুলতানি যুগের প্রথম পর্বে তুর্কি অভিযানকারীদের ‘ অসভ্য বর্বর ’ বলে আখ্যায়িত করার যে প্রবণতা ছিল , তা একেবারে অস্বাভাবিক ছিল না । কারণ যে নৃশংসতা , হত্যাকাণ্ড , লুণ্ঠন ও অত্যাচার দ্বারা তুর্কি যোদ্ধারা ভারত ভূমিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল , তাতে তাদের মধ্যে শিল্পীর উদারতা , সূক্ষ্মতা বা কোমলতার অস্তিত্ব কল্পনা করাও কষ্টকর ছিল । কিন্তু তাই বলে তুর্কো-আফগান জাতি ইসলামীয় শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন ছিল — এ কথা ঠিক নয় । ড. কুরেশী  দিল্লির সুলতানী রাষ্ট্রকে Cultural state বলে অভিহিত করেছেন । 

সুলতানি যুগের শাসকরা সাম্রাজ্য বিস্তার ও শাসন পরিচালনার পাশাপাশি শিল্প স্থাপত্যেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেন । তাঁদের উদ্যোগে দিল্লি , আগ্রা ও সন্নিহিত অঞ্চলে বহু দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ , মসজিদ , স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি নির্মিত হয় । 

সুলতানি যুগের স্থাপত্য শিল্প 

সুলতানি যুগে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়ে শিল্প বিকাশ ঘটে । স্যার জন মার্শাল লিখেছেন , হিন্দু ও মুসলমান প্রতিভার মিলনের ফলে সুলতানি আমলে এক নতুন স্থাপত্য শিল্পের উদ্ভব হয় । এই রীতি ইন্দো-সারাসেনিয়া ‘ বা ‘ ইন্দো-মুসলিম ‘ রীতি নামে পরিচিত । এই নতুন শিল্পধারাকে মুসলিম শিল্পরীতির ভারতীয় সংস্করণ কিংবা হিন্দু শিল্পরীতির পরিবর্তিত রূপ বলা ঠিক নয় । প্রকৃতপক্ষে দুটি ধারার মিলনের ফলেই এই উন্নত ও বলিষ্ঠ ধারার উদ্ভব ঘটেছে । 

হিন্দু-মুসলমান স্থাপত্য রীতির এই সমন্বয়ের পিছনে কয়েকটি কারণ ছিল । যেমন— 

( i ) সুলতানি যুগের স্থাপত্যকর্মে হিন্দু শিল্পীদের নিয়োগ করা হত । এই সকল শিল্পীর হাতের কাজে হিন্দু রীতির ছোঁয়া লেগে থাকা ছিল স্বাভাবিক । 

( ii ) সুলতানগণ হিন্দু ও জৈন মন্দিরকে সামান্য বদলে মসজিদে পরিণত করতেন , ফলে এই সকল শিল্পে হিন্দুরীতির ছাপ থেকে যায় । 

( iii ) মন্দির ও মসজিদ উভয়ের মধ্যে গঠনগত কিছু মিল ছিল । যেমন উভয় ক্ষেত্রেই মূল সৌধের চারপাশে উন্মুক্ত চত্বর থাকত । এই সাদৃশ্য থাকার জন্য উভয় রীতির মিলন ঘটে । 

সুলতানি শাসনের প্রাণকেন্দ্র ছিল দিল্লি । তাই ইন্দো-সারাসেনীয় শিল্পরীতির পূর্ণবিকাশ ঘটে দিল্লি নগরীতে । 

( i ) দিল্লি জয়ের স্মারক হিসেবে কুতুবউদ্দিন আইবক কুয়াৎ উল ইসলাম মসজিদ নির্মাণ করেন ( ১১৯৩ খ্রি. ) । এর প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল হিন্দুরীতি থেকে নেওয়া । পরবর্তীকালে তাতে মুসলিম উপাদান যোগ করা হয় । এ ছাড়া তিনি বাগদাদের প্রখ্যাত ধর্মগুরু খাজা কুতুবউদ্দিনের স্মৃতিরক্ষায় দিল্লিতে কুতুবমিনার নির্মাণ আরম্ভ করেন । এই মিনারের নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন ইলতুৎমিস । ফার্গুসন কুতুবমিনারকে বিশ্বের নিখুঁততম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম বলে বর্ণনা করেছেন । আজমীরের বিখ্যাত মসজিদ আড়াই দিনকা ঝোপড়া কুতুবউদ্দিনের শিল্পানুরাগের আর একটি নিদর্শন । 

( ii ) আলাউদ্দিন খলজির আমলে নির্মিত আলাই দরওয়াজা ইসলামি স্থাপত্য রীতির এক চিত্তাকর্ষক নিদর্শন । খলজি আমলের স্থাপত্যে অলংকরণ ও কারুকার্যের বাহুল্য ছিল । 

( iii ) তুঘলক বংশের শিল্পকর্মে শুচিশুভ্র সংযমের লক্ষণ দেখা যায় । আর্থিক সচ্ছলতার অভাব এবং গভীর ধর্মানুরাগের ফলে এই সময়ে স্থাপত্যে আড়ম্বর বাহুল্য বর্জন করা হয় । তুঘলক আমলের অন্যতম শিল্প সৃষ্টি ছিল আদিলাবাদ এর দুর্গ , ফিরোজাবাদের প্রাসাদ , গিয়াস উদ্দিনের সমাধি ভবন ইত্যাদি । 

( iv ) সৈয়দ ও লোদী বংশীয় সুলতানদের আমলে স্থাপত্য শিল্পে হিন্দু প্রতিভার স্পর্শে প্রাণ ও রসের সঞ্চার ঘটে । 

প্রাদেশিক স্থাপত্য :

প্রাদেশিক স্থাপত্যে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ দেখা যায় । তবে দিল্লির নিকটবর্তী অঞ্চলের স্থাপত্যে দিল্লির প্রভাব দেখা যায় । 

( i ) লাহোরের স্থাপত্যকর্মে গজনির স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব দেখা যায় । 

( ii ) মুলতানের ক্ষেত্রে আরব ও পারস্যের প্রভাব স্পষ্ট । 

( iii ) বাংলায় ইলিয়াস শাহি ও হুসেন শাহি আমলে আঞ্চলিক স্থাপত্যের অপূর্ব বিকাশ ঘটে । পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ , একলাখি মসজিদ , গৌড়ের তাঁতীপাড়া মসজিদ , ছোটো সোনা ও বড়ো সোনা মসজিদ প্রভৃতি স্বমহিমায় উজ্জ্বল । এ ছাড়া সূরা মসজিদ , মহাস্থানগড় মসজিদ প্রভৃতি বাংলার স্থাপত্য কীর্তি হিসেবে বন্দিত হয় । 

( iv ) জৌনপুরের অতলা মসজিদ , লাল দরওয়াজা মসজিদ , জামি মসজিদ স্থাপত্য কর্ম হিসেবে স্মরণীয় । 

( v ) সুলতানি যুগে গুজরাটের স্থাপত্যকর্ম হিসেবে জামি মসজিদ ( ভারুচ ) , ক্যাম্বে মসজিদ , তিন দরওয়াজা মসজিদ , রানি কা হুজরা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য । 

( vi ) মালবের আশরাফি মহল , হিন্দোলা মহল , জাহাজ মহল সে যুগের স্থাপত্যের সাক্ষ্য দেয় ।

সুলতানি যুগের চিত্রকলা   

সুলতানি যুগে চিত্রকলার আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি , কারণ ইসলামধর্মে চিত্রাঙ্কন নিষিদ্ধ ছিল । তাই সুলতানরা চিত্রশিল্পের বিকাশে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেননি । কিন্তু ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে হারম্যান গোয়েৎস নামে এক বিদেশি পণ্ডিত গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে , সুলতানি আমলে চিত্রকলার অনুশীলন চলত । সমকালীন পারসিক সাহিত্যেও সুলতানি যুগের চিত্রকলার উল্লেখ আছে । আঞ্চলিকভাবে চিত্র অঙ্কনের যে ধারা অব্যাহত ছিল , মোগল যুগে তা বিকাশ লাভ করে ।

error: Content is protected !!