গিয়াস উদ্দিন বলবনের কৃতিত্ব

গিয়াস উদ্দিন বলবনের কৃতিত্ব

সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ এর মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুর তথা প্রধানমন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন বলবন দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন (১২৬৬ খ্রীঃ)। নাসিরুদ্দিন মাহমুদ এর প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই তিনি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন । 

বলবনের সিংহাসনে আরোহণের সময় দিল্লী সুলতানী বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত ছিল । ইলতুৎমিসের শুভ প্রয়াস সত্ত্বেও , তাঁর দুর্বল উত্তরাধিকারীদের আমলে সাম্রাজ্যের ভিত যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়ে । সিংহাসনে দুর্বল শাসকদের অযোগ্যতার সুযোগে তুর্কী অভিজাতদের ‘ চল্লিশ চক্র ‘ প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠে । মেওয়াটী দস্যুদের অত্যাচারে অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয়ে ছিল । মোঙ্গলদের আক্রমণের সম্ভাবনা বিঘ্নিত করেছিল সীমান্তের নিরাপত্তা । রাজকোষের অর্থাভাব এবং সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ইত্যাদিও প্রকট হয়ে সংকট সৃষ্টি করেছিল । 

বিদ্রোহ দমন

সিংহাসনে আরোহণ করেই বলবন অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনে উদ্যোগী হন । সেই সময়ে মেওয়াটী দস্যুরা দিল্লী ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ক্রমাগত লুঠতরাজ চালিয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল । এ ছাড়া দোয়াবের প্রজারাও বিদ্রোহী হয়ে অশান্তির সৃষ্টি করেছিল । এদের দৌরাত্ম্যে দোয়াব থেকে দিল্লী পর্যন্ত বাণিজ্যপথগুলি প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল । বলবন অত্যন্ত কঠোরতার সাথে এইসব বিদ্রোহীদের দমন করেন । মেওয়াটী দস্যুদের দমনের জন্য তিনি দিল্লীর সংলগ্ন অঞ্চলে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে সেনা শিবির স্থাপন করেন ।  

দোয়াবের অবাধ্য প্রজাদের দমনের উদ্দেশ্যে তিনি একাধিক গ্রাম জ্বালিয়ে দেন এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু মানুষকে হত্যা করেন । কয়েকজন শক্তিশালী ইকতাদারের মধ্যে উপদ্রুত অঞ্চল বণ্টন করে তাদের হাতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেন । ফতেহারের হিন্দু বিদ্রোহীদের দমনের জন্য তিনি চরম নৃশংসতার পরিচয় দেন । এছাড়া কামাপল , পাতিয়ালী , ভোজপুর প্রভৃতি স্থানে একাধিক দুর্গ নির্মাণ করে সেগুলিতে সৈন্য মোতায়েন করেন । এইভাবে বলবন দস্যুদের উপদ্রব থেকে রাজ্যকে রক্ষা করেন। 

অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস

ইলতুৎমিসের পরবর্তীকালে তুর্কী অভিজাতরা অনেক বেশি ক্ষমতাশালী ও স্বাধীনতাকামী হয়ে উঠেছিল । বলবন বুঝতে পেরেছিলেন যে , অভিজাতদের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস করতে না পারলে মসনদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাবে না । তাই এদের নির্মূল করতে বলবন যে কোন ধরনের নিষ্ঠুর প্রথা গ্রহণে দ্বিধানিত হননি । এই উদ্দেশ্যেই তিনি সুলতানের দৈব সত্ত্বের ( Divine Origin ) তত্ত্ব প্রচার করেন । চিহালগনির প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী অভিজাতদের একে একে হত্যা করেন । ইলতুৎমিসের পরিবারবর্গকে হত্যা করেন । এমনকি সামান্য সন্দেহের বশে সুদক্ষ সেনাপতি ও আত্মীয় শের খাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন । 

গুপ্তচর নিয়োগ 

আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় ও অরাজকতা দমনে বলবনের এক বিশেষ অস্ত্র ছিল তার সুদক্ষ গুপ্তচর বাহিনী । অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ লোকেদের তিনি গুপ্তচর বাহিনীতে নিযুক্ত করেন । লেনপুলের মতে , “ বলবনের রাজ্যে এমন কিছু ছিল না , গুপ্তচররা যার খবর পেত না । ” 

শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন

জার্মানীর চ্যান্সেলর বিসমার্কের ন্যায় বলবনও ‘ রক্ত ও লৌহ ’ ( blood and iron ) নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন । তাই সামরিক বাহিনীর আমূল সংস্কার করে তিনি একটি বৃহৎ , সুদক্ষ ও কার্যকরী সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন । কুতুবউদ্দিনের সময় থেকেই সৈন্যদের জায়গিরদানের ব্যবস্থা ছিল । বলবন বৃদ্ধ বা অক্ষমদের জায়গির কেড়ে নিয়ে ভাতাদানের ব্যবস্থা করেন । অবশ্য শেষ পর্যন্ত এই আদেশ কার্যকর হয়নি ।  

অভিজ্ঞ মালিকদের তত্ত্বাবধানে তিনি পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন এবং সৈন্যদের কার্যকারিতা তত্ত্বাবধানের জন্য ‘ কাল্ব-ই-আলা ’ নামক সরকারি কর্মী নিযুক্ত করেন । এ ছাড়া নিয়মিত কুচকাওয়াজেরও ব্যবস্থা করেন । সেনাবাহিনীর চলাচলের সময় যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয় , সেদিকে বলবনের তীক্ষ্ণ নজর ছিল । বলবনের সৈন্যবাহিনী সংগঠনে তার যুদ্ধ মন্ত্রী ( আর্জ-ই-মামালিক ) ইমাদ-উল-মুলকের বিশেষ অবদান ছিল । 

কঠোর শাসন ব্যবস্থা

সুশাসক হিসেবেও বলবন কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন । বিশৃঙ্খলা দমন করে সরকারি কর্মীদের কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার অধীনে আনেন । কর্মচারীদের তিনি স্বয়ং নিয়োগ করতেন । প্রাদেশিক শাসন সংক্রান্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠানো বাধ্যতামূলক ছিল । সুদক্ষ গুপ্তচর বাহিনী দ্বারা সারা দেশের খবর সুলতান নিয়মিত পেতেন । গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলিতে তিনি নিজ পুত্রদের নিযুক্ত করেন । কোন বিশেষ কর্মচারীর হাতে বলবন কখনও অধিক ক্ষমতা দিতেন না । 

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন 

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনেও বলবন তৎপর ছিলেন । বলবনের সময়ে বাংলার শাসনকর্তা তুঘান তুঘরিল খাঁ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । তুঘরিলের বিদ্রোহ দমনের জন্য বলবন সেনাপতিদের নেতৃত্বে দুটি অভিযান পাঠান । কিন্তু দু’বারই সুলতানী বাহিনী পরাজিত হয় । অতঃপর বলবন স্বয়ং বাংলাদেশ অভিযান করেন এবং তুঘরিলের পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে পরাজিত ও নিহত করেন । অতঃপর নিজ পুত্র বুগরা খাঁকে বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন । 

মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ

বহিরাগত মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধে বলবন যথেষ্ট দক্ষতার ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন । মোঙ্গল আক্রমণ রোধের জন্য তিনি কয়েকটি স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য বলবন মুলতান ও দীপালপুরে জ্যেষ্ঠ পুত্র মহম্মদ ও সামানা অঞ্চলে অপর পুত্র বুগরা খাঁকে সসৈন্যে মোতায়েন করেন । পুরানো দুর্গগুলির সংস্কার সাধন ও কিছু কিছু নতুন দুর্গও নির্মাণ করেন । উল্লেখ্য , মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়েই পুত্র মহম্মদ নিহত হন ( ১২৮৬ খ্রীঃ ) । প্রিয় পুত্রের আকস্মিক মৃত্যুর অল্পকালের মধ্যেই সুলতান বলবনের মৃত্যু হয় ( ১২৮৭ খ্রীঃ)।  

মূল্যায়ন 

কে. এ. নিজামী , এ. এল. শ্রীবাস্তব প্রমুখ কোন কোন ঐতিহাসিক বলবনের কৃতিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । শ্রীবাস্তবের মতে , বলবনের কোনরকম গঠনমূলক প্রতিভা ছিল না । তিনি কোন ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন নাই । নিজামীর মতে , বলবন এমন কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেননি যার জন্য তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা যেতে পারে ।  

একথা ঠিক , বলবন সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করেননি বা শাসন সংস্কারের ক্ষেত্রে কোন নতুন পদক্ষেপ নেননি । অভিজাতদের ক্ষমতা খর্ব করে এবং বংশ মর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়ে তুর্কী শাসনকে পরোক্ষে দুর্বল করে তুলেছিলেন । তবুও একথা অনস্বীকার্য যে , সেই মুহূর্তে বলবন কঠোরতা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সুলতানির ভিতকে সুরক্ষা করেছিলেন । 

error: Content is protected !!