ভক্তিবাদ কী

ভক্তিবাদ কী

সুলতানি তথা মধ্যযুগে একশ্রেণীর সন্ন্যাসীগণ ঈশ্বর আরাধনার মাধ্যম হিসাবে ভক্তিকে অবলম্বন করেছিলেন এবং প্রচার করেছিলেন । এটিই ইতিহাসে ভক্তিবাদ বা ভক্তি আন্দোলন নামে পরিচিত ।

ভক্তি আন্দোলনের উদ্ভবের কারণ 

দ্বাদশ শতকে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক সহজ সরল ধর্ম আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে । ভক্তি কেন্দ্রিক এই আন্দোলন ভক্তিবাদী ধর্ম আন্দোলন নামে পরিচিত । ভক্তি আন্দোলন উদ্ভবের কারণ হিসেবে একাধিক উপাদানের কথা জানা যায় ।

ইসলামের সাম্যভাবের প্রভাব :

অনেকের মতে , ইসলামের একেশ্বরবাদ হিন্দুদের মনে ভক্তিবাদের জন্ম দেয় । ইসলামের ধর্মীয় সাম্য , সৌভ্রাতৃত্ব ও জাতিভেদ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা হিন্দু সংস্কারকদের আকৃষ্ট করে । মুসলিম সুফি সাধকদের ভক্তি তত্ত্ব ও নৈতিক আচরণ দ্বারা ঈশ্বর লাভের উপায় সম্পর্কিত প্রচার হিন্দু সংস্কারকদের পথ দেখায় । তাই ঐতিহাসিক কে. এম. পানিক্কর লিখেছেন , ইসলামের একেশ্বরবাদের পরিপ্রেক্ষিতে ভক্তিবাদকে হিন্দুধর্মের নতুন ব্যাখ্যা বলা যায় । 

হিন্দু ভক্তিবাদের প্রভাব :

অনেকে মনে করেন , হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের মধ্যেই ভক্তিবাদের আদর্শ নিহিত আছে । বৈদিক সাহিত্যে ইন্দ্র বা বরুণের স্তবে ভক্তির প্রাধান্য দেখা যায় । গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীরের বাণীর মধ্যেও ভক্তির প্রাধান্য আছে । সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক সূচনা ঘটে । এ প্রসঙ্গে শৈব ‘ নায়নার ’ ও ‘ আলবার ‘ সম্প্রদায়ের নাম স্মরণ করা যায় । 

আর্থসামাজিক শোষণের প্রতিক্রিয়া :

সুলতানি আমলে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কৃষক , কারিগর প্রভৃতি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ঘৃণা করতেন । আবার জমিদার বা রাজস্ব কর্মচারী হিসেবে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বিনা দ্বিধায় শোষণও করতেন । অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর শাসক মুসলমানদের শোষণ এবং প্রলোভন অব্যাহত ছিল । এরূপ পটভূমিতে ভক্তিবাদী সংস্কারকগণ ধর্মীয় ও সামাজিক সাম্যের কথা প্রচার করেন । শোষিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষ খুব সহজেই ভক্তিবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় । 

ভক্তিবাদের বিকাশ 

ভক্তি আন্দোলনের প্রধান প্রচারক ছিলেন রামানন্দ , কবীর , নানক , শ্রীচৈতন্প্রমুখ । এঁরা বিশুদ্ধ ভক্তি , প্রেম ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঈশ্বর সাধনার কথা প্রচার করেন । 

রামানন্দ : 

ভক্তিবাদের আদি প্রচারক ছিলেন সাধক রামানুজ । রামানুজের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে চতুর্দশ শতকে রামানন্দ উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলন শুরু করেন । তিনি জাতিভেদ বা বর্ণভেদ মানতেন না । তিনি বলতেন , ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান । তাঁর প্রতি অবিচল ভক্তিই মানুষকে মুক্তির সন্ধান দেয় । হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন । রামানন্দের বারোজন প্রধান শিষ্যের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাধক কবীর । 

কবীর : 

কথিত আছে যে , কবীর কাশীর এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তবে তিনি মুসলমান তাঁতি বা জোলা পরিবারে লালিত পালিত হন । কবীর প্রচার করেন যে , মানুষ নানা নামে ডাকলেও আল্লাহ বা ঈশ্বর এক । তাঁর অবস্থান মানুষের অন্তরে । কবীর বিশ্বাস করতেন , ঈশ্বর সাধনার জন্য মূর্তি পূজা বা নামাজের প্রয়োজন নেই । সন্ন্যাস জীবনেরও দরকার নেই । গৃহে অবস্থান করেই তাঁকে পাওয়া সম্ভব । নিজের অন্তরের অন্তঃস্থলেই ঈশ্বরের আসন পাতা আছে । হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে । ছোটো ছোটো কবিতা বা শ্লোক রচনা করে তিনি নিজের বক্তব্য সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারতেন । এগুলি ‘ কবীরের দোহা ‘ নামে খ্যাত । 

দাদু  : 

কবীরপন্থার অন্যতম অনুসারী ছিলেন দাদু ( ১৫৪৪-১৬০৩ খ্রি. ) । তাঁর জন্ম গুজরাটে । দাদুর লক্ষ্য ছিল সর্বধর্ম সমন্বয় । এই উদ্দেশ্যে তিনি পরমব্রহ্ম সম্প্রদায় স্থাপন করেন । তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের ভক্তিমূলক রচনা সংকলিত হয় । তিনি মনে করতেন , ঈশ্বর মানুষের অন্তরে বিরাজ করেন । তাই মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই । দাদুর অনুগামীরা দাদুপন্থী নামে পরিচিত হন । 

নানক  :

ভক্তিবাদের আর এক প্রধান প্রবক্তা ছিলেন গুরু নানক ( ১৪৬৯-১৫৩৮ খ্রি. ) । তিনি ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোরের সন্নিকটে তালওয়ান্দী নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন । নানকের ধর্মের প্রধান তিনটি সূত্র হল — এক ঈশ্বর , গুরু এবং নামজপ । তাঁর মতে , ঈশ্বর অমর , সত্যদ্রষ্টা , নির্ভীক , শত্রুহীন , অজ ও স্বয়ং প্রকাশ । তিনিও কবীরের মতো জাতিভেদ বা অস্পৃশ্যতার বিরোধী ছিলেন । তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার বাণী প্রচার করে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের চেষ্টা করেন । নানা ধর্মের লোক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে । নানক প্রচারিত ধর্মমত পরে ‘ শিখ ধর্ম ‘ নামে পরিচিত হয় । তাই তাঁর শিষ্যগণ ‘ শিখ ’ নামে অভিহিত হন । 

মীরাবাঈ : 

ভক্তিবাদের স্মরণীয় প্রচারক ছিলেন রাজপুত রাজকন্যা ও শিশোদীয় রাজবংশের কুলবধূ মীরাবাঈ । অল্প বয়সে তিনি কৃষ্ণপ্রেমে আকৃষ্ট হন । তাঁর উপাস্য দেবতা ছিলেন গিরিধারীলাল । ব্রজবুলিতে রচিত ভজন গানের মধ্য দিয়ে তিনি কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি নিবেদন করতেন । মীরার ভজন নামে পরিচিত তাঁর ভক্তিগীতিগুলি ভারতীয় সাহিত্য ও সংগীতের অমূল্য সম্পদ ।

শ্রীচৈতন্য : 

বাংলা দেশে ভক্তিবাদের আদর্শে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন চৈতন্যদেব ( ১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি. ) । তিনি নদিয়া জেলায় এক শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাল্যনাম ছিল নিমাই । চব্বিশ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন । তিনি বিভিন্ন শাস্ত্র ও দর্শনে সুপণ্ডিত ছিলেন । তাঁর মতে , জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষই আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী হতে পারে । বৈরাগ্য ও কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি জীবের মুক্তি আনবে , —তিনি এই তত্ত্ব প্রচার করেন । চৈতন্য প্রচারিত ধর্মের তিনটি মূলকথা ছিল— ( a ) জীবে দয়া , ( b ) ঈশ্বরে ঐকান্তিক ভক্তি এবং ( c ) নাম সংকীর্তন । অধ্যাপক রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় এর মতে , চৈতন্য বৈষ্ণব আন্দোলন ভারতের জীবনধারায় নৈতিকতা ও শুভবোধের সংযোজন ঘটায় ।

error: Content is protected !!