কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব

কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব 

দিল্লী সুলতানির প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন জাতিতে তুর্কী এবং তুর্কীস্থানের অধিবাসী । বাল্যকালে তিনি ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রীত হন । নিশাপুরের কাজী তাকে ক্রয় করে সাহিত্য ও সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলেন । কাজীর মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় ক্রীতদাস রূপে বিক্রীত হন । এবারে এক বণিক কুতুবউদ্দিনকে ক্রয় করে গজনীতে নিয়ে আসেন । অতঃপর তার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে মহম্মদ ঘোরী কুতুবউদ্দিনকে ক্রয় করেন । দেখতে কুৎসিত হলেও কুতুবউদ্দিন ছিলেন সাহসী , বিশ্বস্ত এবং সুদক্ষ যোদ্ধা । তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মহম্মদ ঘোরীর আস্থা অর্জন করেন এবং সেনাবাহিনীর একটি শাখার অধিনায়ক পদে নিযুক্ত হন । 

ক্ষমতায় উত্তরণ

ভারতে কুতুবউদ্দিনের কার্যকলাপকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে । ১১৯২-১২০৬ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি মহম্মদ ঘোরীর সেনাপতি রূপে উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য বিজয়ে তাকে সাহায্য করেন । রাজপুত রাজা জয়চাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ( ১১৯৪ খ্রীঃ ) তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন ।  

১১৯৭-৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কালিঞ্জর ও কনৌজ দখল করেন । এ ছাড়া হান্সি , মিরাট , দিল্লী , রনথম্বাের ও বারাণসী সহ উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তিনি তুর্কী আধিপত্য স্থাপন করেন । মৃত্যুর পূর্বেই মহম্মদ ঘোরী কুতুবউদ্দিনকে তাঁর ভারতস্থ সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি মনোনীত করেছিলেন । তাই ঘোরীর মৃত্যুর পর লাহোরে তুর্কী অভিজাতদের আমন্ত্রণে কুতুবউদ্দিন দিল্লীর সিংহাসন আরোহণ করে ( ১২০৬ খ্রীঃ ) । ১২০৮ খ্রীষ্টাব্দে গজনীর সুলতান কুতুবউদ্দিনকে ‘ সুলতান ’ উপাধিতে ভূষিত করেন ।  

একাধিক বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের দ্বারা তিনি নিজ কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন । কুতুবউদ্দিন স্বীয় ভগিনীকে মুলতান ও উচের শাসনকর্তা নাসিরুদ্দিন কুবাচার সাথে বিবাহ দেন এবং তিনি নিজে গজনীর শাসনকর্তা ইলদিজের কন্যাকে বিবাহ করেন । 

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন 

কুতুবউদ্দিনের শাসনকাল নিরূপদ্রব ছিল না । কুবাচা এবং ইলদিজ উভয়েই কুতুবউদ্দিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন । তবে শেষ পর্যন্ত কুতুবের সাথে পেরে উঠেননি । চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খারাজম এর শাহ-র সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য তিনি দিল্লী থেকে লাহোরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন । বাংলার শাসক আলিমরদান কুতুবের সহায়তায় বাংলার সিংহাসনে বসে তাকে বাৎসরিক করদানে স্বীকৃত হয়েছিলেন । 

কৃতিত্ব বিচার 

কুতুবউদ্দিনের শাসনকাল ছিল খুবই সীমিত , মাত্র চার বৎসর । এই সময়ে রাজ্য বিস্তারের পরিবর্তে তিনি বিজিত রাজ্যকে সংহত করতেই অধিক মনোযোগী হয়েছিলেন । তাঁর শাসনের ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি ।  

ড. নিজামীর ভাষায় : উদ্ভাবনী সংগঠনী প্রতিভা তাঁর ছিল না , ফলে নবগঠিত দিল্লী সুলতানিতে তিনি কেন শাসনতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেননি , যা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারত । ভূমি রাজস্ব বা কর ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও তিনি ছিলেন উদাসীন ।  

তাই বলা চলে যে , সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করলেও আইবক সেই সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বিধানের কোন ব্যবস্থাই নেননি । অবশ্য ব্যক্তি হিসেবে তিনি বহু গুণের অধিকারী ছিলেন । তার অন্তর ছিল উদার । দানশীলতার কারণে লোকে তাকে ‘ লাখ বক্স ‘ নামে অভিহিত করত ।  

সিংহাসনারোহণের চতুর্থ বৎসরে ‘ চৌগান ‘ খেলতে গিয়ে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন ( ১২১০ খ্রীঃ ) । এইভাবে অসীম সাহস ও অনন্য সামরিক প্রতিভার সাহায্যে কুতুবউদ্দিন ভারতবর্ষে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন ।

error: Content is protected !!