আরবদের সিন্ধু আক্রমণ

আরবদের সিন্ধু আক্রমণ

অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় আরবদের সিন্ধু অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতে মুসলমানদের আবির্ভাবের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় । ভারতের বিরুদ্ধে আরব আক্রমণগুলি প্রাথমিক ভাবে সফল হয়নি । কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক অনৈক্য এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের অভাব শেষ পর্যন্ত আরবদের সাফল্য এনে দেয় ।  

রাজনৈতিক অনৈক্য 

আরবদের সিন্ধু আক্রমণের প্রাক্কালে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের একাধিক ক্ষুদ্র ও অসংহত রাজ্য গড়ে উঠেছিল । অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে হিমালয়ের পাদদেশে বৃহৎ রাজ্য বলতে ছিল আফগানিস্তান , নেপাল ও কাশ্মীর । এদের মধ্যে কাশ্মীর রাজ্য ললিতাদিত্য এর রাজত্বকালে ( ৭২২-৫৫ খ্রীঃ ) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল । প্রায় একই সময়ে যশোবর্মনের নেতৃত্বে কনৌজও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও সামরিক শক্তিতে যথেষ্ট বলীয়ান হয়ে উঠেছিল ।  

বাংলাদেশে শশাঙ্কের মৃত্যুর পরও পূর্বের ‘ মাৎস্যন্যায় ’ ( অরাজকতা ) অব্যাহত ছিল । পরে পাল বংশের নেতৃত্বে ঐ অঞ্চলে কিছুটা সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয় । উত্তর-পূর্ব ভারতের কামরূপ রাজ্য ছিল খুবই দুর্বল ও গুরুত্বহীন । উত্তর-পশ্চিমে সিন্ধু রাজ্য ছিল দাহির নামক একজন রাজার শাসনাধীন । উত্তর ভারতের মত দক্ষিণ ভারতেও একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল । এদের মধ্যে চোল , চের , পাণ্ড্য , পল্লব , রাষ্ট্রকূট , চালুক্য প্রভৃতি রাজ্য ছিল উল্লেখযোগ্য । এদের মধ্যেও কোন মিত্রতা ছিল না এবং পারস্পরিক সংঘাত ছিল নিত্যকার ঘটনা । 

এইভাবে দেখা যায় , আলোচ্য সময়ে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও আঞ্চলিক সংকীর্ণতাবাদের প্রাবল্যের অনিবার্য ফল স্বরূপ ভারতে কেন্দ্রীয় শক্তি বলে কিছুই ছিল না । এর ফলে দেশের অর্থনীতিও পঙ্গু হয়ে পড়েছিল । এইরূপ বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে আরব দেশ সিন্ধু আক্রমণ করে খুব সহজেই কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয় ।  

আরবদের সিন্ধু আক্রমণের কারণ

আরবদের সিন্ধু আক্রমণের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঐতিহাসিকেরা একাধিক তত্ত্বের অবতারণা করেছেন ।  

এ. এল. শ্রীবাস্তবের মতে , আরবদের সিন্ধু আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ধর্মের বিস্তার । খলিফাদের আমলে আরবরা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের যে কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল , সিন্ধু আক্রমণ ছিল তারই অঙ্গ । কিন্তু সমসাময়িক তথ্যাদি থেকে জানা যায় যে , সিন্ধু বিজয়ের পরে ঐ রাজ্যে ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধদের যথেষ্ট ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল । এই কারণে উপরিলিখিত যুক্তি সম্বন্ধে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ।  

ঐতিহাসিক আর্নল্ড ( Arnold ) প্রমুখের মতে , ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন করাই ছিল আরব আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য । পরে ভারতে তারা রাজ্য স্থাপনে উদ্যোগী হয় ।  

যাই হোক , অষ্টম শতকের প্রারম্ভে একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিন্ধুর বিরুদ্ধে আরবদের আক্রমণ ঘটে । সিংহলের রাজা পারস্যের শাসনকর্তা হজ্জাজের কাছে উপঢৌকন স্বরূপ কিছু দ্রব্য ও রমণী একটি জাহাজে প্রেরণ করেছিলেন । কিন্তু সিন্ধু প্রদেশের দেবল বন্দরে জাহাজটি জলদস্যুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয় । ফলে হজ্জাজ সিন্ধুরাজের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন । কিন্তু দাহির তা দিতে অস্বীকার করলে ক্ষুব্ধ হজ্জাজ সিন্ধু আক্রমণ করেন ।  

আরবদের সিন্ধু অভিযান

প্রথমে ওবেদুল্লা ও পরে বুদাইল নামক দুই সেনাপতির নেতৃত্বে প্রেরিত আরবদের দুটি অভিযানই ব্যর্থ হয় । অতঃপর মহম্মদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে তৃতীয় অভিযান প্রেরিত হয় ( ৭১২ খ্রীঃ ) । কাশিম বিনা বাধায় দেবল বন্দর দখল করে বহু সিন্ধুবাসীকে হত্যা করেন । অতঃপর আরবরা ‘ নিরুন ’ ও ‘ সেওয়ান ’ দখল করে । এই সময়ে রাজা দাহিরের অযোগ্যতা ও আরবদের মিত্ৰতাপূর্ণ ব্যবহারের ফলে বহু দেশীয় সামন্ত ও সাধারণ মানুষ আরবদের পক্ষ অবলম্বন করে । ইতিমধ্যে দাহির ‘ রাওর ’ দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন । আরব বাহিনী রাওর আক্রমণ করলে দাহির যুদ্ধ শুরু করেন এবং নিহত হন । অতঃপর তার পুত্র জয়সিংহ বিক্রমের সাথে আরবদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকেন । কিন্তু তিনিও পরাজিত হয়ে রাওর ত্যাগ করে পলায়ন করেন । এরপর কাশিম ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মূলতান দখল করে বিজিত অঞ্চলে শাসন প্রবর্তন করেন ।  

ভারতে আরব শাসন ব্যবস্থা 

আরব শাসনাধীন সিন্ধুদেশকে কয়েকটি জেলা বা ‘ ইকতা’য় বিভক্ত করা হয় । প্রতি জেলায় একজন করে আরবীয় শাসক নিযুক্ত ছিলেন । স্থানীয় শাসনভার সিন্ধুবাসীদের হাতেই ন্যস্ত ছিল । সরকারী কর্মচারী ও সৈন্যগণ নগদ অর্থের পরিবর্তে জায়গির ভোগ করত ।  

হিন্দু শাসনকালের বহু আইন আরব শাসনকালেও প্রচলিত ছিল । রাজস্ব নির্ধারণে কোরানের নির্দেশ পালিত হত । ভূমি কর ও অ-মুসলমানদের কাছ থেকে আদায়ীকৃত জিজিয়া কর ছিল রাজস্বের প্রধান উৎস । তবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কোনরকম কর দিতে হত না । বিচারকার্য পরিচালনা করতেন বিভিন্ন স্তরের প্রশাসকরা । তবে বড় বড় শহরে কাজী বিচার করতেন । ঐ সময়ে অন্য ধর্মাবলম্বী বহু ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করলেও তখন ধর্মপালনের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল । 

ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে , আরবীয়দের এহেন ধর্মীয় উদারতার প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন ভারতবাসীর ধর্মের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ । তাঁর ভাষায় ” অ-মুসলমান নাগরিকদের নানাপ্রকার বোঝা বহন করতে হত । বহিরাগত মুসলমানদের তিনদিন ভরণ পোষণ , জিজিয়া কর প্রদান ইত্যাদি তাদের মেনে নিতে হয়েছিল । বিচারের ক্ষেত্রেও মুসলিম আইন অনুসৃত হত । আইনের সাম্য স্বীকৃত ছিল না ।  

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল

সিন্ধুদেশে আরব আক্রমণের ফলাফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না । 

রাজনৈতিক ফল : ভারতে আরব কর্তৃত্ব মূলতঃ সিন্ধুদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল । মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে হিন্দু শাসিত রাজ্যগুলি থেকে সিন্ধু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল । কুচ , রাজস্থান , গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে অভিযান চালালেও , শেষ পর্যন্ত আরবরা ঐসব অঞ্চল দখলে ব্যর্থ হয়েছিল । সীমিত অঞ্চলে বিস্তৃত এবং স্বল্পস্থায়ী হওয়ার ফলে ভারতে আরব আক্রমণের রাজনৈতিক ফল ছিল শূন্য । 

সাংস্কৃতিক প্রভাব : ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে আরবরা প্রভাবিত হয় । হিন্দু দর্শন , জ্যোতিষ শাস্ত্র , শিল্পরীতি , চিকিৎসা শাস্ত্র প্রভৃতি বহু বিষয়ে আরবরা জ্ঞানলাভ করে এবং নিজ দেশে তা প্রচার করে । খলিফা মনসুরের আগ্রহে ব্রহ্মসিদ্ধান্তখণ্ডখাদ্যক নামক সংস্কৃত গ্রন্থদ্বয় আরবী ভাষায় অনূদিত হয়েছিল । খলিফা হারুনের ( ৭৮৬-৮০৮ খ্রীঃ ) আমন্ত্রণে বহু ভারতীয় পণ্ডিত আরবদেশে গমন করেছিলেন ।

error: Content is protected !!