চোল শাসন ব্যবস্থা

চোল শাসন ব্যবস্থা

সুষ্ঠু ও উন্নত প্রশাসন ছিল চোল যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য । শতাধিক বছরের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই প্রশাসন গঠিত হয়েছিল । চোল নৃপতি রাজরাজ এবং কুলোতুঙ্গের মধ্যবর্তী সময়ে চোল প্রশাসন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল ।  

উপাদান  

সমসাময়িক শিলালিপি ও বড় বড় রাজাদের প্রশস্তি থেকে চোল প্রশাসন সম্পর্কে আমরা নানা তথ্য পেয়ে থাকি । সমসাময়িক মুদ্রা এবং শিল্প ভাস্কর্য থেকেও আমরা উন্নত চোল শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু অনুমান করতে পারি । তৎকালীন সাহিত্যও এই বিষয়ে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । এমনকি , চৈনিক লেখক চো-গু উয়া প্রমুখের রচনাও এই বিষয়ে আমাদের সাহায্য করে ।  

আড়ম্বরপূর্ণ রাজতন্ত্র 

চোল শাসন ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় , প্রাদেশিক ও স্থানীয় — এই তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল । কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে ছিল রাজার স্থান । ঐ যুগে রাজপদ ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত । তবে প্রথম যুগের অনাড়ম্বর রাজতন্ত্র পরবর্তী যুগে আড়ম্বরপূর্ণ হয়েছিল । গৌরবময় যুগের রাজারা একাধিক সুসজ্জিত প্রাসাদ নিয়ে বাস করতেন । চোল যুগে বিভিন্ন স্থানে অভিষেকের আয়োজন করা হত , যেমন — তাঞ্জোর , গঙ্গাইকোন্ড চোলপুরম , কাঞ্চীপুরম প্রভৃতি । চোল রাজাগণ বিভিন্ন বড় বড় উপাধি গ্রহণ করতেন । এই বিষয়ে তারা উত্তর ভারতীয় রীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । চোল যুগে একাধিক সামন্ত শাসকের অস্তিত্ব থাকলেও রাজার ক্ষমতাই ছিল চূড়ান্ত ।  

আমলাতন্ত্র

চোল যুগে একটি সুগঠিত ও শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে প্রশাসন চালিত হত । কেন্দ্রীয় কর্মচারীগণ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিয়ন্ত্রিত করলেও , তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেন না । সামরিক ও বেসামরিক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বলা হত ‘ আদিগারিগন ‘ । উচ্চপদস্থ কর্মীদের সাধারণত ‘ পেরুন্দর ’ এবং নিম্নপদস্থদের ‘ সিরুদন ’ বলা হত ।  

নিয়োগ পদ্ধতি 

সাধারণত জন্ম ও বংশ কৌলীন্যের বিচারে রাজকর্মচারীদের নিয়োগ করা হত । তবে কর্মজীবনে উন্নতির জন্য যোগ্যতাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত । কর্মচারীরা নগদ বেতনের পরিবর্তে জমি ভাগে দখল করতেন । চোল প্রশাসন অন্যান্য দক্ষিণ ভারতীয় প্রশাসন অপেক্ষা অধিকতর কঠোর ও কেন্দ্রীভূত ছিল ।  

শাসন ব্যবস্থার সর্বনিম্নে ছিল স্বশাসিত গ্রাম । কতকগুলি গ্রামের সমষ্টিকে বলা হত ‘ কুররম ’ বা ‘ নাড়ু’ বা ‘ কাট্টম ’ । বড় গ্রামগুলিকে বলা হত ‘ তনিয়ুর ‘। কয়েকটি কুররম নিয়ে গঠিত হত ‘ বলনাড়ু ’ । বলনাড়ুর উপরে ছিল ‘ প্রদেশ ’ বা ‘ মণ্ডল ‘ ।  

রাজস্ব ব্যবস্থা

চোল আমলে ভূমি করই ছিল আয়ের উৎস । এই কর নগদ অর্থে অথবা দ্রব্যের মাধ্যমে দেওয়া যেত । এ ছাড়া , আমদানি-রপ্তানি শুল্ক , নগরে প্রবেশ কর , শিল্প ও খনি থেকে গৃহীত রাজস্ব প্রভৃতিও আয়ের উৎস ছিল । ভূমি রাজস্বের হার ছিল সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ । তবে উৎপাদিকা শক্তির তারতম্য অনুসারে এই হার পরিবর্তিত হত । যুদ্ধ , মন্দির নির্মাণ , বন্যা প্রতিরোধ প্রভৃতির জন্য অতিরিক্ত কর ধার্যের রেওয়াজ ছিল । তবে এজন্য রাজার অনুমতি নিতে হত । প্রতি গ্রামে মন্দির , শ্মশান প্রভৃতি কিছু স্থান কর মুক্ত হিসেবে থাকত ।  

বিচার ব্যবস্থা

বিচারের কাজ সাধারণত স্থানীয়ভাবে করা হত । রাজকীয় আদালতগুলিকে বলা হত ‘ ধর্মাসন ’ । দেওয়ানি ও ফৌজদারী মামলায় পার্থক্য ছিল না । বিচারের কাজে গ্রাম সভাগুলির ব্যাপক ক্ষমতা ছিল । গ্রাম সভার বিচারে সন্তুষ্ট না হলে নাড়ুর ভারপ্রাপ্ত শাসকের কাছে আবেদন করা যেত । রাজদ্রোহের বিচার রাজা স্বয়ং করতেন । এই অপরাধে প্রাণদণ্ড দেওয়ার রীতি ছিল । রাজদ্রোহের বিচার রাজা স্বয়ং করতেন । এই অপরাধে প্রাণদণ্ড দেওয়ার রীতি ছিল । শাস্তি হিসেবে সাধারণত অপরাধীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত , জরিমানা , কারাদণ্ড প্রভৃতির বিধান ছিল ।  

স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন 

চোল শাসন পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন । তখন গ্রামীণ প্রতিষ্ঠাগুলি যেভাবে স্বাধীনতা ভাগে করত , তা আমাদের বিস্মিত করে । গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ভোটে নির্বাচিত প্রাথমিক সমিতির মাধ্যমে গ্রাম শাসন চলত । এই সমিতিগুলি ছাড়াও একাধিক ধর্মীয় , সামজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠী ছিল । গোষ্ঠীর তুলনায় গ্রাম সমিতির দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল অনেক বেশি । তবে গোষ্ঠীর সদস্যরাই অনেকে সমিতিরও সদস্য হতেন , ফলে উভয়ের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা ছিল না । 

গ্রাম সমিতি ছিল দু’ধরনের ; যথা — উর এবং সভা । তা ছাড়া , শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার জন্য নগর নামক এক ধরনের সমিতি ছিল । কর্মসূচী রূপায়ণে গ্রাম সভাগুলির পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল ।  

স্থানীয় সমিতিগুলির মধ্যে উপরে গঠনতন্ত্র ছিল সহজ । সাধারণভাবে গ্রামের করদাতাদের নিয়ে ‘ উর ’ গঠিত হত । প্রয়োজন অনুসারে উর এককভাবে বা সভার সাথে যৌথভাবে কাজ পরিচালনা করত । রাজারা তাদের দানের দ্বারা বহু মঙ্গলম সৃষ্টি করেছিলেন । 

সভার গঠন প্রণালী ছিল অনেক বেশি জটিল । বিভিন্ন গ্রামের ‘ কুড়ম্ব ’ বা পাড়া থেকে প্রথমে যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনীত করা হত । আর্থিক সঙ্গতি , বৈদিক জ্ঞান , চারিত্রিক শুদ্ধতা এবং বয়স প্রভৃতি যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হত । এইভাবে প্রতি কুড়ুম্ব থেকে মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজনকে মনোনীত করা হত ।  

একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় এইরকম ৩০ টি কুড়ুম্ব ছিল । এদের মধ্য থেকে যোগ্যতম ১২ জনকে নিয়ে সাম্বাৎসরিক সমিতি গঠিত হত । অবশিষ্ট ১২ জন উদ্যান সমিতি এবং ৬ জন পুষ্করিণী সমিতি গঠন করতেন । এঁদের কার্যকালের মেয়দা ছিল এক বৎসর । এঁরা কোন পারিশ্রমিক পেতেন না । ঢােল বাজিয়ে মহাসভার অধিবেশন আহ্বান করা হত । সাধারণত মন্দির প্রাঙ্গণে এই সভা বসত । প্রতিটি নাড়ুর একটি করে নিজস্ব সভা ছিল । এদের বলা হত নাত্তার । 

চোল যুগে গ্রামীণ শাসন ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট দু’জন সরকারি কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায় । এঁরা হলেন ‘ মধ্যস্থ ’ এবং ‘ করণত্তার ’ । মধ্যস্থ সম্ভবত গ্রাম সভার অধিবেশনে পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন । তবে তারা আলোচনায় অংশ নিতেন না । করণত্তার ছিলেন হিসাব পরীক্ষক । সম্ভবত ভূমি রাজস্বের বিষয়েও এঁরা নজর রাখতেন । এঁদের পারিশ্রমিক সভা কর্তৃক নির্ধারিত করা হত ।  

ঐতিহাসিক ব্যাসাম এর মতে , স্থানীয় লোকেরাই বেশি প্রাধান্য পেত । বৃত্তিহীন বা নারীদের এখানে কোন ভূমিকা ছিল না । যেহেতু সম্পত্তিহীন ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারত না । তাই দরিদ্র লোকেরা স্থানীয় শাসন থেকে কোন সুযোগ সুবিধা পেত না ।  

এইভাবে সুদক্ষ আমলাতন্ত্র , সক্রিয় ও স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং যোগ্য কেন্দ্রীয় প্রকারের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে চোল শাসন ব্যবস্থা এমন এক উন্নত মান লাভ করেছিল , যা অন্য কোন হিন্দু রাষ্ট্রে দেখা যায়নি । 

error: Content is protected !!