প্রথম মহেন্দ্র বর্মন এর কৃতিত্ব

প্রথম মহেন্দ্র বর্মন এর কৃতিত্ব  

পিতা সিংহ বিষ্ণুর মৃত্যুর পর মহেন্দ্র বর্মন কাঞ্চির সিংহাসনে বসেন । তাঁর রাজ্যসীমা ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত , উত্তরে কৃষ্ণা নদী থেকে দক্ষিণে কাবেরী নদী পর্যন্ত । উত্তর ভারতে পুষ্যভূতি রাজ হর্ষবর্ধন এবং দক্ষিণ ভারতে শক্তিশালী চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশী ছিলেন মহেন্দ্র বর্মনের সমসাময়িক । তবে হর্ষবর্ধনের রাজ্য বহুদূরে হবার কারণে মহেন্দ্র বর্মনের সাথে তাঁর মৈত্রী বা শত্রুতা ছিল না । কিন্তু চালুক্যদের সাথে পল্লবদের বৈরিতা ছিল তীব্র । পল্লবদের সাথে চালুক্যদের এই শত্রুতা ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পিছনে একাধিক কারণ ছিল । যেমন— 

( ক ) উভয় রাজ্যই দক্ষিণ ভারতে ভৌমিক সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করেছিল । তাই উভয়ের সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য । 

( খ ) চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর পূর্বপুরুষগণ কদম্বদের অধীন সামন্ত ছিলেন । বর্তমানে চালুক্য ও কদম্বদের মধ্যে ছিল শত্রুতার সম্পর্ক । কিন্তু পল্লবদের সাথে কদম্বদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হবার ফলে পল্লবদের উপর চালুক্যরা রুষ্ট হয় । 

( গ ) পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলে চালুক্য রাজ্য অবস্থিত ছিল । আর পল্লব রাজ্য ছিল নীচের দিকে উপকূল অঞ্চলে । এখানকার নদীগুলি পশ্চিমদিক থেকে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছিল । এই নদীগুলির মধ্যে কৃষ্ণা ও গোদাবরী ব-দ্বীপের উপর স্থাপিত বেঙ্গীকে প্রদক্ষিণ করে সমুদ্রে এসে পড়েছিল । এই দুটি মূল নদীর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে আগ্রহী ছিল দুটি রাজ্যই । তাই এদের সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য । বেঙ্গীর এই ভৌগোলিক গুরুত্বের জন্য ভবিষ্যতেও এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে রাজনীতির তপ্ত হাওয়া প্রবাহিত হতে দেখা গেছে ।  

সাধারণভাবে মনে করা হয় যে , পল্লবরাজ মহেন্দ্র বর্মনের সম্প্রসারণ নীতি এবং বেঙ্গীর উপর আধিপত্য স্থাপনের প্রচেষ্টার পাল্টা হিসেবে চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশী কাঞ্চী আক্রমণ করেন । কাঞ্চীপুরমের ১৫ মাইল উত্তরে লুল্ললুর যুদ্ধে মহেন্দ্র বর্মন পরাজিত হন । কাঞ্চী রক্ষা করতে সমর্থ হলেও মহেন্দ্র বর্মন পরাজিত হয়ে তাঁর রাজ্যের উত্তরাংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন । দ্বিতীয় পুলকেশীর মারুতুন দানপত্র এবং আইহোল প্রশস্তির বক্তব্য থেকে এই যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা করা হয়েছে । কিন্তু মহেন্দ্র বর্মনের কাশাকুড়ি পট্টে বলা হয়েছে যে , মহেন্দ্র বর্মন তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন ।  

তাই ড. টি. ভি. মহালিঙ্গন এই যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । তার মতে , আইহোল প্রশস্তিতে মহেন্দ্র বর্মনের নাম উল্লেখ নেই । আছে ‘ পল্লবদের রাজা ’ কথাটি । সম্ভবত পরবর্তী রাজা প্রথম নরসিংহ বর্মনের রাজত্বের গোড়ার দিকে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল । 

বিচিত্র চিত্ত ‘, ‘ সত্যসন্ধ’ , ‘ চৈত্যকারী শত্রুমল্ল’ প্রভৃতি অসংখ্য অভিধার অধিকারী মহেন্দ্র বর্মন বিবিধ গুণের অধিকারী ছিলেন । তাঁর সময় দক্ষিণ ভারতীয় শিল্পে নবযুগের সূচনা ঘটেছিল । সাহিত্য ও ধর্মের ক্ষেত্রেও তার উদারতা ছিল নবজাগরণের অন্যান্য গুণাবলী বার্তাবাহী ।  

তিনিই প্রথম প্রচলিত ইট ও কাঠের পরিবর্তে পাহাড় কেটে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন । তাঁর আমলে নির্মিত গুহা মন্দিরগুলির মধ্যে ত্রিচিনোপল্লী বল্লম , দলবানুর নাম উল্লেখযোগ্য । তিনিই প্রথম পাহাড় কেটে লেখা খোদাই করেন । তাঁর আমলে দক্ষিণ ভারতে সাহিত্যেরও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল ।  

তিনি নিজে ছিলেন কবি ও নাট্যকার । তাঁর রচিত ব্যঙ্গ নাটক ‘ মত্তবিলাস প্রহসন’ সংস্কৃত ভাষার এক অমূল্য সম্পদ । সঙ্গীত শাস্ত্রের উপরে ও তাঁর যথেষ্ট দখল ছিল । ভারবি , দণ্ডির প্রমুখ বহু গুণী ব্যক্তি মহেন্দ্র বর্মনের পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেছিলেন । তাঁর আমলে সৃষ্ট ভাস্কর্য কর্মগুলির মধ্যে তিরুচিরপল্লীর গুহায় উৎকীর্ণ গঙ্গাবতরণ চিত্র বিখ্যাত । কৈলাশনাথ , মুক্তেশ্বর , মুতঙ্গেশ্বর মন্দিরে ভাস্কর্য কর্ম সম্পাদিত হলেও , সেগুলি গুণমানে ছিল নিকৃষ্ট ।  

তাঁর ধর্মীয় উদারতার অভাব ছিল না । প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন জৈন । পরে শৈব ধর্ম গ্রহণ করেন । এই যুগে আলবার ও নায়নার সম্প্রদায়ের সংস্কার আন্দোলনের ফলে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল । 

error: Content is protected !!