রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য

রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তীকালে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে অনেকগুলি আঞ্চলিক রাজ্য গড়ে উঠেছিল । দক্ষিণ ভারতে গড়ে ওঠা রাজ্যগুলির মধ্যে বিশেষ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রকূট বংশের শাসনাধীন অঞ্চলটি । চালুক্য বংশের দুর্বলতার সুযোগে অষ্টম শতকের মধ্যভাগে রাষ্ট্রকূটগণ দক্ষিণ ভারতে প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে । 

আদি পরিচয় 

রাষ্ট্রকূটদের আদি পরিচয় সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে । নিজেদের অনুশাসন লিপিতে রাষ্ট্রকূটদের মহাভারতের যদুবংশীয় সাত্যকির বংশধর বলে বর্ণনা করা হয়েছে । কেউ কেউ রাষ্ট্রকূটদের অশোকের লিপিতে উল্লিখিত ‘ রাষ্ট্রিক’দের সাথে অভিন্ন বলে মনে করেন । বার্নেল এর মতে , এরা ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের ‘ রাড্ডি ’ দ্রাবিড়দের বংশধর । অনন্ত আলতেকরের মতে , রাষ্ট্রকূটগণ ছিল কর্ণাটক অঞ্চলের অধিবাসী এবং তাদের মাতৃভাষা ছিল কানাড়ি । 

রাষ্ট্রকূট শাসনের সূচনা 

আনুমানিক ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দে দন্তী দুর্গ চালুক্যদের পরাজিত করে রাষ্ট্রকূট কর্তৃত্বের সূচনা করেন । বর্তমানে শোলাপুরের নিকটবর্তী ‘ মালখেদ ’ ছিল তার রাজধানী । তিনি আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করেন । তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য দন্তি দুর্গকে ‘ পৃথিবী বল্লভ ‘ উপাধিতে ভূষিত করেন । মালব , গুজরাট , মধ্যপ্রদেশ , বেরার প্রভৃতি অঞ্চলের দন্তি দুর্গ নিজ কর্তৃত্ব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন ।  

পরবর্তী শাসক প্রথম কৃষ্ণের আমলে মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশের অবশিষ্টাংশ রাষ্ট্রকূটদের কর্তৃত্বে আসে । এর রাজত্বকালেই ইলোরার বিখ্যাত কৈলাসনাথ মন্দির নির্মিত হয়েছিল । অতঃপর সিংহাসনে বসেন কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিতীয় গোবিন্দ । কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে পরাজিত করে কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধ্রুব সিংহাসন দখল করেন ( ৭৭৩ খ্রীঃ ) ।  

রাজা ধ্রুব

ধ্রুবর রাজত্বকালে রাষ্ট্রকূট বংশ যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে । তিনি চালুক্য , পল্লব , ও গঙ্গবংশীয় রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে স্বীয় কর্তৃত্ব বিস্তার করেন । অতঃপর তিনি উত্তর ভারত বিজয়ে অগ্রসর হন । এই সূত্রে প্রতিহার ও পাল বংশের সাথে রাষ্ট্রকূটদের সংঘর্ষ শুরু হয় । ধ্রুব , প্রতিহার রাজ , বৎস রাজ এবং পাল রাজা ধর্মপালকে পরাজিত করে গাঙ্গেয়-দোয়াব অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন । 

তৃতীয় গোবিন্দ 

ধ্রুবের পর সিংহাসনে বসেন তাঁর ভ্রাতা তৃতীয় গোবিন্দ । পিতার ন্যায় তিনিও ছিলেন ক্ষমতাবান শাসক । সিংহাসনে বসেই তিনি কয়েকটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে নিজ হাতকে দৃঢ় করেন । ইনিও দক্ষিণ ভারতে পল্লব ও বেঙ্গীদের পরাজিত করে উত্তর ভারত বিজয়ে অগ্রসর হন ।  

কনৌজের কর্তৃত্বের প্রশ্নে প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভট্টকে তিনি পরাজিত করেন । কনৌজ রাজ চক্ৰায়ুধ ও পাল রাজ ধর্মপাল বিনা যুদ্ধেই তৃতীয় গোবিন্দের বশ্যতা স্বীকার করেন । ইতিমধ্যে দক্ষিণ ভারতে চোল , পাণ্ড্য , কেরল , প্রভৃতি রাজ্যগুলি এক রাষ্ট্রকূট বিরোধী সংঘ গঠন করে । তৃতীয় গোবিন্দ দক্ষিণ ভারতে প্রত্যাবর্তন করে একে একে দক্ষিণী রাজ্যগুলিকে পরাজিত করেন । 

প্রথম অমোঘবর্ষ 

তৃতীয় গোবিন্দর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র প্রথম অমোঘবর্ষ ( ৮১৪-৮৭৮ খ্রীঃ ) । তাঁর নাবালকত্বের সুযোগে দেশব্যাপী বিদ্রোহ ও কলহ শুরু হলে রাষ্ট্রকূট রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে । অবশ্য রাজ্য বিস্তার করতে না পারলেও তিনি ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । ধর্ম ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক রূপে তিনি খ্যাত ছিলেন । জৈনধর্মাবলম্বী হলেও তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু । তাঁর রচিত ‘ কবিরাজ মার্গ ’ও ‘ রত্নমালিকা ’ গ্রন্থ কানাড়ি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ । বৃদ্ধ বয়সে পুত্র দ্বিতীয় কৃষ্ণকে সিংহাসন দান করে তিনি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন ।  

পরবর্তী রাজাগণ 

অতঃপর দ্বিতীয় কৃষ্ণ ( ৮৭৮-৯১৪ খ্রীঃ ) , ও তৃতীয় ইন্দ্র ( ৯১৪ ৯২২ খ্রীঃ ) সিংহাসনে আরোহণ করেন । এঁদের রাজত্বকালে প্রতিহার ও চোল বংশের সাথে রাষ্ট্রকূটদের সংঘর্ষ লেগেই ছিল । রাষ্ট্রকূটদের শেষ উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন তৃতীয় কৃষ্ণ । তিনি প্রতিহার , চোল , পাণ্ড্য ও কেরল রাজ্যকে পরাজিত করে নিজেদের হৃত কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন । তিনি রামেশ্বরমে এই বিজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন । কিন্তু ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফলে রাষ্ট্রকূটদের শক্তি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে । আনুমানিক ৯৭৫ খ্রীষ্টাব্দে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় তৈল বা তৈলপ রাষ্ট্রকূট শাসনের অবসান ঘটান । 

রাষ্ট্রকূট শাসন ব্যবস্থা 

রাষ্ট্রকূট শাসন ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ প্রশাসক । তিনি প্রতিদিন রাজদরবারে উপস্থিত থেকে শাসন পরিচালনা করতেন । রাজা কর্তৃক মনোনীত মন্ত্রীগণ শাসনকার্যে সহায়তা করতেন । যুবরাজ ও অন্যান্য কুমারগণ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত হতেন । মন্ত্রীদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী , পররাষ্ট্রমন্ত্রী , রাজস্ব মন্ত্রী ছিলেন বিশেষ ক্ষমতাশালী । 

শাসনতান্ত্রিক বিভাগ :

প্রত্যক্ষ শাসিত অঞ্চল ‘ প্রদেশ’ , ‘ বিষয় ’ ও ‘ ভুক্তি ’ – এই তিনভাগে বিভক্ত ছিল । শাসন ব্যবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল ‘ গ্রাম ‘। প্রদেশ বা রাষ্ট্রের শাসন কর্তাকে বলা হত ‘ রাষ্ট্রপতি ‘। নিজ এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রিত করা প্রভৃতি কাজ রাষ্ট্রপতিকে করতে হত ।’ বিষয় ’ – এর প্রধান শাসককে বলা হত ‘ বিষয়পতি ‘ , গ্রামগুলির শাসনভার ছিল গ্রাম প্রধানের উপর । শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য গ্রাম প্রধানদের অধীনে একটি সুশিক্ষিত লাঠিয়াল বাহিনী থাকত । ‘ গ্রাম মহাজন ’ বা ‘ গ্রাম মহাত্তার ’ নামক গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের পরামর্শে গ্রাম প্রধান গ্রাম শাসন করত । এই পদ ছিল বংশানুক্রমিক । গ্রামের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক কাজও গ্রাম প্রধানকে করতে হত । 

রাজস্ব ব্যবস্থা :  

রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব । উৎপন্ন ফসলের এক চতুর্থাংশ কর হিসেবে গৃহীত হত । এ ছাড়া , জল কর , খনিজ দ্রব্যের উপর কর প্রভৃতিও আদায় করা হত ।’ দেশ-গ্রামুক্ত ’ নামক রাজস্ব কর্মচারীগণ রাজস্ব আদায়ের ভারপ্রাপ্ত ছিল । এই পদগুলিও ছিল বংশানুক্রমিক ।  

সামন্ত রাজ্য সমূহ :  

রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যে সামন্ত রাজ্যেরও অস্তিত্ব ছিল । শাসন ব্যাপারে সামন্তরাজাগণ ছিলেন স্বাধীন । তারা রাষ্ট্রকূট রাজাদের নিয়মিত কর প্রদান করতেন এবং যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেন । 

error: Content is protected !!