কৈবর্ত বিদ্রোহ

কৈবর্ত বিদ্রোহ

পালরাজ দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে ( ১০৭০-৭৫ খ্রীঃ ) দিব্য বা দিবোক নামে কোনো এক ব্যক্তির নেতৃত্বে বরেন্দ্র অঞ্চলে এক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল । এই বিদ্রোহ “ কৈবর্ত বিদ্রোহ ” নামে খ্যাত । এই বিদ্রোহের বিস্তারিত বিবরণ আছে সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘ রামচরিত ‘ গ্রন্থে । এ ছাড়াও বৈদ্যদেবের কামাউলী পট্ট , মদন পালের মানহালি দানপত্র এবং ভোজবর্মনের বেলবা দানপত্রে এই ঘটনার উল্লেখ আছে ।  

কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট 

তৃতীয় বিগ্রহ পালের রাজত্বকালে ( ১০৪৩-৭০ খ্রীঃ ) নানা দিক থেকে পাল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল । বৈদেশিক শক্তির আক্রমণে অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ভেঙে পড়েছিল এবং সেই সুযোগে সামন্তরাজাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা ।  

তার মৃত্যুর পর পাল বংশের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় মহীপাল ( ১০৭০-৭১ খ্রীঃ ) । তিনি ছিলেন অযোগ্য ও কুচক্রী শাসক । মহীপাল নিজ ভ্রাতাদ্বয় শূরপাল ও রামপালকে কারারুদ্ধ করে নিজেকে নিষ্কণ্টক করতে চান । কিন্তু তার কুশাসনের ফলে সামন্ত শ্রেণী বিদ্রোহ করে । কৈবর্ত নায়ক দিব্য বা দিব্যকের নেতৃত্বে বিদ্রোহী সামন্তরা বরেন্দ্রভূমিতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাসন প্রবর্তন করে । বিদ্রোহীদের হাতে মহীপাল নিহত হন । 

কৈবর্ত বিদ্রোহের কারণ

এই বিদ্রোহের কারণ সম্বন্ধে একাধিক মত প্রচলিত আছে ।  

ড. এস. পি. লাহিড়ীর মতে , চাষী কৈবর্ত শ্রেণীভুক্ত যশোদাস নামক কোনো এক ব্যক্তি রাজ্যপালের মন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার ফলে কৈবর্তদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছিল । যার ফলে কৈবর্তরা বিদ্রোহের মাধ্যমে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপনে সচেষ্ট হয়েছিল ।

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে , কৈবৰ্তরা ছিল বরেন্দ্র এর শক্তিশালী জাতি । দ্বিতীয় মহীপালের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা দিব্যর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেছিল ।  

ড. বি. সেনের মতে , মৎস্য হত্যা বৌদ্ধ ধর্মে নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের আমলে কৈবর্তদের সামাজিক অসুবিধা হচ্ছিল । দ্বিতীয় মহীপাল কঠোরভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করতে চাইলে কৈবর্তরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । তবে এই তত্ত্ব অনেকে অস্বীকার করেছেন । এঁদের মতে , ধর্ম বিষয়ে উদার ছিলেন পাল রাজারা । তাই ধর্মীয় অত্যাচারের সম্ভাবনা ছিল না ।  

কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রকৃতি 

সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর ‘ রামচরিত ‘ গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে ‘ অনিকম ধর্মবিপ্লব ’ বলে বর্ণনা করেছেন । অনিকম এর অর্থ হল অপবিত্র । তিনি আরও বলেছেন , রাজবাহিনী ‘ মিলনান্তক সামন্ত চক্রের ’ সম্মুখীন হয়েছিল । দিব্য ছিলেন রাজার পক্ষে । সম্ভবত , বন্ধুর ছদ্মবেশে রাজবাহিনীর সাথে ছিলেন দিব্য । রাজসিংহাসন দখল করা ছিল তার আসল লক্ষ্য । দিব্য জানতেন সামন্তদের সাথে রাজার সংঘর্ষ হলে রাজা ও সামন্ত উভয় পক্ষের শক্তি ক্ষয় হবে । সেই সুযোগে তিনি রাজক্ষমতা দখল করবেন । দ্বিতীয় মহীপালের নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিব্য বরেন্দ্রকে নিজ অধীনে এনেছিলেন । 

ড. উপেন্দ্রনাথ ঘোষাল , যদুনাথ সরকার প্রমুখ এই বিদ্রোহের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন । এঁদের মতে , কৈবর্ত শ্রেণীভুক্ত দিব্য নেতৃত্ব দিলেও এটি শুধুমাত্র কৈবর্তদের বিদ্রোহ ছিল না । বাংলার কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা এবং রাজপরিবারের অন্তর্বিবাদের সুযোগে উত্তরবঙ্গের সামন্ত রাজাগণ একসাথে এই বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন । দিব্য তার দক্ষতা ও যোগ্যতার দ্বারা  এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল । 

এই বিদ্রোহের ফলও সুদূরপ্রসারী ছিল না । সামন্তরা মিলিতভাবে বিদ্রোহ করলেও খুব শীঘ্রই তাদের মধ্যে অন্তর্বিবাদ দেখা দিয়েছিল । তাই ক্ষমতা পুনর্দখল করতে রামপালের অসুবিধা হয়নি ।  

রামপালের সিংহাসন লাভ

সামন্তদের বিদ্রোহজনিত অস্থিরতার সুযোগে শূরপাল ও রামপাল কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন । তারা সম্ভবত মগধে গিয়ে পাল শাসনের সূচনা করেন । প্রথমে সিংহাসনে বসেন শূরপাল । তারপরে রাজা হন রামপাল । মগধে রামপালের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দিব্যক ক্ষুব্ধ হন এবং সম্ভবত মগধ আক্রমণের পরিকল্পনা করেন । অবশ্য এই যুদ্ধ আদৌ হয়েছিল কিনা কিংবা যুদ্ধের পরিণতি কি হয়েছিল তা জানা যায়নি । 

বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার 

দিব্যকের মৃত্যুর পর তার ভাই রুদ্দোক ও পুত্র ভীম যথাক্রমে বরেন্দ্রর সিংহাসনে বসেন । ভীম ছিলেন তুলনামূলক ভাবে দুর্বল শাসক । সেই সময়ে রামপাল বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন । ভূমি ও অর্থের বিনিময়ে তিনি বহু সামন্তরাজাকে নিজপক্ষে আনতে সক্ষম হন । রামচরিতে এই ধরনের সামন্তদের একটি তালিকা পাওয়া যায় ।  

এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাল বলভী ( মেদিনীপুর ) -র রাজা বিক্রম ; দণ্ডভুক্তি ( দাঁতন ) -র রাজা জয়সিংহ ; উচ্ছাল ( বীরভূম ) র রাজা ভাস্কর ; তৈলকম্পা ( মালভূম ) -র রাজা রুদ্রশিখর ; সংকটগ্রাম ( হুগলী ) এর রাজা চণ্ডাৰ্জুন ; কৌশাম্বি ( রাজশাহী ) -র রাজা দ্বোরপৰ্বন প্রমুখ । 

এখানে লক্ষণীয় যে , মূল বরেন্দ্রভূমির কোন সামন্ত ভীমের বিরুদ্ধে যাননি । যাই হোক , রামপাল ভীমকে পরাজিত ও হত্যা করে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন । সেখানে বহু অর্থব্যয়ে সজ্জিত রামাবতী নগরী প্রতিষ্ঠা করে নিজ রাজধানী স্থাপন করেন । তিনি বরেন্দ্রভূমিতে আইন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন ।  

রামপালের রাজ্য বিস্তার 

বরেন্দ্র উদ্ধারের পর রামপাল পাল বংশের হস্তচ্যুত অন্যান্য ভুখণ্ড পুনর্দখলে উদ্যোগী হন । বিক্রমপুর ও কামরূপের রাজারা রামপালের বশ্যতা স্বীকার করেন । উড়িষ্যার কিয়দংশও তার অধিকারে আসে । এই সূত্রেই চোলরাজ কুলতুঙ্গের সাথে রামপালের সংঘর্ষ হয়েছিল । তবে রামপালের আমলেই মিথিলা পাল রাজ্যচ্যুত হয়েছিল ।  

রামপালের কৃতিত্ব 

নির্বাসনে জীবন শুরু করেও অসীম মনোবলের দ্বারা রামপাল পাল সাম্রাজ্যের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন । খণ্ড বিখণ্ড ও অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ঘ সাম্রাজ্যকে তিনি গ্রথিত করে কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছেন । তিনিই ছিলেন পাল বংশের শেষ দক্ষ নৃপতি । এক অর্থে রামপালকে পাল বংশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় । কিন্তু তিনিও সেই সাফল্যকে স্থায়িত্ব দিতে পারেননি ।  

কারণ সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোন শাসন ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না । ব্যক্তিগত ত্রুটি ও অদূরদর্শিতার কারণে রামপালও শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারেননি । সামন্তশ্রেণীর শক্তি বৃদ্ধি অথবা বিনাশ সাধন , কোনটাই তিনি করেননি । কার্যকরী শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনও তিনি করেননি । তাই তার মৃত্যুর পরেই পাল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে ।

error: Content is protected !!