গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য  

গুপ্ত যুগে শিল্পের তিনধারা — স্থাপত্য , ভাস্কর্য ও চিত্রকলার বিস্ময়কর উন্নতি ঘটেছিল । গুপ্ত যুগে শিল্পকলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এগুলির ভারতীয়তা এবং সহজ সরল গঠন পদ্ধতি । ভারতীয় শিল্পকলা দীর্ঘদিনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে গুপ্ত যুগে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রতিভাত হতে পেরেছিল । গুপ্ত যুগের স্থাপত্য শিল্পের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হল তিগোয়ার বিষ্ণুমন্দির , কুবীরের পার্বতী মন্দির , দেওগড়ের দশাবতার মন্দির , সাঁচী ও বৌদ্ধ গয়ার বৌদ্ধ স্তুপ প্রভৃতি । এই যুগে মন্দির শিল্পের দারুন উন্নতি হয়েছিল । মন্দিরগুলি সাধারণত ইট বা কাঠ দিয়ে নির্মিত হত । মন্দিরগুলির চারপাশে ছিল প্রাঙ্গণ ও মাঝখানে ছিল গর্ভগৃহ। 

গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য

গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যের বহু নিদর্শন পৌরাণিক দেব-দেবীর মূর্তি গঠনের মাধ্যমে পাওয়া গেছে । সারনাথে আবিষ্কৃত বুদ্ধমূর্তিগুলি এই যুগের ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন । মূর্তিগুলি ছিল আশ্চর্য রকমের সাবলীল এবং রেখার স্পষ্টতা ছিল লক্ষণীয় । গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যকে মথুরা ও অমরাবতীর ভাস্কর্যের পরিণত রূপ বলা যায় । তবে এখানকার মূর্তিগুলির অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এদের আধ্যাত্মিকতা , যা প্রতিটি মুখমণ্ডলে উদ্ভাসিত । তবে বেঙ্গী ও অমরাবতীর ইন্দ্রিয় পরায়ণতা বা পার্থিবতা গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যে অনুপস্থিত ।  

অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়অধ্যাপক সরসী কুমার সরস্বতী উল্লেখ করেছেন যে , গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য শিল্পীরা অতীন্দ্রিয় শিল্প সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন এবং সে কাজে তারা সফলও হয়েছেন । প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যের ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে , বরং অতীতের আদর্শবোধের সাথে বর্তমানের আধ্যাত্মিকতা , সৌন্দর্যবোধ ও বাস্তবতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে এই যুগের শিল্পীরা তিল তিল করে তিলোত্তমা সৃষ্টি করেছেন । সব থেকে বড় কথা , এগুলির নির্মাণ কৌশলী ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় । ড. রমেশচন্দ্রের ভাষায় ও “ Indeed the Gupta sculpture may be regarded as typically Indian and classic in every sense of the term . ” মথুরা , বারাণসী , উজ্জয়িনী প্রভৃতি স্থানে এই যুগের বহু ভাস্কর্য নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে । 

গুপ্ত যুগের চিত্রকলা

ভাস্কর্যের মত গুপ্ত চিত্রকলাও ছিল প্রাণবন্ত । অজন্তা গুহার দেওয়ালে আঁকা চিত্রগুলি যেমন সজীব তেমনি স্বাভাবিক । এখানে রাজা , রানী , রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অপ্সরা , কিন্নরী , ভূত-প্রেত সবই বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর সমপানির মূর্তিতে জীবনের দুঃখ , বেদনা , আশা-নিরাশার কথা এত স্পষ্টভাবে অঙ্কিত , যা দেখলে বিস্ময়ের উদ্রেক করে । তাই অজন্তার গুহাচিত্র পরিদর্শন করে বিস্ময়াবিভূত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বলেছেন , ‘ যা কিছু মহৎ , যা কিছু ক্ষুদ্র ‘ সবই অজন্তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে । অজন্তা ছাড়া মধ্যপ্রদেশের বাঘ গুহাচিত্রের নিদর্শনগুলিও গুপ্ত যুগের শিল্পীদের চিন্তার গভীরতা ও তুলির সূক্ষ্মতার অপূর্ব নিদর্শন । রঙের ব্যবহার এত নিখুঁত যে আজও তা অম্লান আছে ।

error: Content is protected !!