ভারতে হুন আক্রমণ

ভারতে হুন আক্রমণ 

হুন জাতির পরিচয়  

হিয়ুং-নু বা হুনগণ ছিল মধ্য এশিয়ার এক দূর্ধর্ষ বর্বর জাতি । আনুমানিক খ্রীঃপূঃ দ্বিতীয় শতকে হুনরা চীন দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে অপর এক যাযাবর জাতি ইউ-চি দের বিতাড়িত করে ঐ স্থান দখল করে । এর কিছুদিন পরে তৃণভূমির সন্ধানে হুনরা আবার পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকে । এই সময় হুনরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায় । এদের একটি দল ইউরোপে প্রবেশ করে এবং রোমান সাম্রাজ্যকে বিধ্বস্ত করে । এরা ‘ কৃষ্ণ হুন ’ ( Black Hunas ) নামে পরিচিত হয় ।  

অপর দলটি এগিয়ে চলে ইক্ষু নদীর দিকে । এদের পরিচয় হয় ‘ শ্বেত হুন ’ ( White – Hunas ) নামে । শ্বেত হুনরা পারস্যের সাসানীয় বংশের সম্রাট ফিরোজকে পরাজিত করে ( ৪৮৫ খ্রীঃ ) পারস্য ও কাবুলে হুন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে । এই বিজয় হুন শক্তির দ্রুত প্রসারে সহায়ক হয় । বলখকে কেন্দ্র করে বিশাল হুন সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে । 

হুন আক্রমণের সূচনা

ভারতে হুন আক্রমণের সূচনা হয় গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্তের রাজত্বকালে । কিন্তু স্কন্দগুপ্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই দুর্ধর্ষ রক্তলোলুপ শ্বেত হুনদের আক্রমণ প্রতিহত করেন ( ৪৫৫ খ্রীঃ ) । ড. আর. কে. মুখার্জী এই কৃতিত্বের জন্য স্কন্দগুপ্তকে ‘ দিগ্বিজয়ী বীর ’ বলে অভিহিত করেছেন । ঐতিহাসিক কে. পি. জয়সওয়ালের মতে , এই অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের জন্য স্কন্দগুপ্তকে ‘ শ্রেষ্ঠ গুপ্ত সম্রাট’ বললেও অত্যুক্তি হবে না । যাই হোক , প্রাথমিক পরাজয়ের পর হুনরা কিছুকাল ভারত আক্রমণ থেকে বিরত ছিল ।  

তোরমান খাঁ এর ভারত আক্রমণ :

ষষ্ঠ শতকের প্রথমভাগে হুনরা পুনরায় ভারত আক্রমণ করে । এই সময় হুনদের নেতা ছিলেন তোরমান । পাঞ্জাবের পশ্চিমাংশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল হুনদের অধিকারভুক্ত হয় । এরান লিপি থেকে জানা যায় যে , ভানুগুপ্তের সেনাপতি গোপরাজ হুন আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে ব্যর্থ ও নিহত হয়েছিলেন ।’ কুবলয়নামা ’ নামক জৈন্য গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে , ৫১০ খ্রীষ্টাব্দে ভানুগুপ্তের কাছে তোরমান পরাজিত হয়েছিলেন ।  

মিহিরকুল এর ভারত আক্রমণ :

তোরমানের মৃত্যুর ( ৫১৫ খ্রীঃ ) পর তার পুত্র মিহিরকুল হুনদের নেতা হন । তার রাজধানী ছিল শকল বা শিয়ালকোট । পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান চালান । হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ , কলহনের রাজতরঙ্গিনী প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে , মিহিরকুল ছিলেন অত্যাচারী ও নৃশংস প্রকৃতির মানুষ । নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার চালিয়ে তিনি পৈশাচিক আনন্দ পেতেন । রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করে এটিলা যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলেন , মিহিরকুলের অত্যাচারও তার থেকে কম ছিল না । এই কারণে কেউ কেউ তাকে ‘ ভারতের এটিলা ’ বলে অভিহিত করেছেন । কাশ্মীর , গান্ধার , সিংহল ও দাক্ষিণাত্যের কিছু অংশ মিহিরকুলের রাজ্যভুক্ত হয়েছিল ।  

হুন আক্রমণের অবসান 

মিহিরকুলের অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে ভারতবর্ষকে রক্ষা করেন গুপ্তরাজ বালাদিত্য এবং মান্দাশোরের ( পশ্চিম মালব ) অধিপতি যশোধর্মন । যশোধর্মন সম্ভবত গুপ্তদের সামন্তরাজা ছিলেন । গুপ্ত সম্রাটের দুর্বলতার সুযোগে তিনি স্বাধীন রাজ্যের পত্তন করেন । যাই হোক , বালাদিত্য এবং যশোধর্মন একই সাথে মিহিরকুলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন , নাকি স্বতন্ত্রভাবে হুন নেতাকে পরাজিত করেছিলেন সে বিষয়ে মতভেদ আছে । মোটামুটিভাবে মনে করা হয় যে , ৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ মিহিরকুল পরাজিত ও বিতাড়িত হয়েছিলেন । মিহিরকুলের মৃত্যুর ( ৫৪২ খ্রঃ ) পর যোগ্য নেতার অভাবে হুনদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে ।  

কনৌজের মৌখরী ও থানেশ্বর এর পুষ্যভূতি রাজবংশের সাথে কিছু বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর ভারতে হুন আধিপত্যের সম্পূর্ণ অবসান ঘটে । তারপর এদেশে বসবাসকারী হুনরা ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে ভারতীয় সভ্যতার সাথে মিশে যায় ।  

ভারতে হুন আক্রমণের ফলাফল

পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের হুন আক্রমণ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বহুল পরিবর্তনের সূচনা করেছিল । 

প্রথমত , হুনদের আক্রমণ ও ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয় । ইউরোপে রোমান সাম্রাজ্যের মতই ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্য হুন আক্রমণের ফলে বিধ্বস্ত হয় এবং রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয় । অতঃপর ভারতে আবার গড়ে ওঠে একাধিক আঞ্চলিক রাজ্য ।  

দ্বিতীয়ত , হুনদের ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ ভারতের বহু প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছিল । বহু বৌদ্ধ ও জৈন মঠ , মৌর্য যুগের এবং গুপ্ত যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিল্প নিদর্শন হুনদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছে । এমনকি বহু ঐতিহাসিক দলিলপত্রও তারা বিনষ্ট করে দেয় ।  

তৃতীয়ত , হুন আক্রমণ দ্বারা ভারতের সামাজিক জীবন গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল । হুনদের সাথে মধ্য এশিয়া থেকে আরও অন্যান্য উপজাতির মানুষ ভারতে প্রবেশ করেছিল । হুনদের সাথে এরাও ভারতে স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করে । ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে ঐসব বিদেশীয়দের সভ্যতার সমন্বয়ে ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনে পরিবর্তন আসে ।  

চতুর্থত , বিদেশীদের সাথে ভারতীয়দের এবং বিদেশীয়দের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার ফলে ভারতে সংকর জাতির সৃষ্টি হয় ; যেমন — রাজপুতগণ । তা ছাড়া, এর ফলে ভারতীয় সমাজে বর্ণভেদের কঠোরতা অনেক হ্রাস পায়।

error: Content is protected !!