গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান

গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান

গুপ্ত বংশের উত্থান ভারত ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের যে আশা কুষাণগণ জাগিয়েছিল , তা ও অচিরে বিলীন হয়ে গেল । এই সময় হতে শুরু করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের মধ্যবর্তী কালকে স্মিথ ভারত ইতিহাসের অন্ধকার যুগ ( Dark age ) বলে বর্ণনা করেছেন । এই সময়ে উত্তর ভারতে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল , যাদের মধ্যে না ছিল কোন শক্তি , না ছিল কোন ঐক্য । এই বহুধাবিচ্ছিন্ন ভারতভূমিকে এক পতাকাতলে সমবেত করে গুপ্ত রাজারা ভারত ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন । 

উপাদানসমূহ

গুপ্ত বংশের আদি ইতিহাস জানার জন্য একাধিক নির্ভরযোগ্য উপাদান পাওয়া যায় । এইসব লিখিত উপাদানের অন্যতম হল পুরাণ সমূহ । এগুলিতে গুপ্তরাজাদের নাম , রাজ্য সীমা , শাসন ব্যবস্থা প্রভৃতির বহু উল্লেখ পাওয়া যায় । এ ছাড়া গুপ্ত যুগে রচিত বিভিন্ন নাটক ও সাহিত্য থেকেও তৎকালীন বহু তথ্য জানা যায় । এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম হল ‘ কৌমুদী মহোৎসব ‘, ‘ দেবী চন্দ্রগুপ্ত ’, ‘ নাট্যদর্পণ ‘, ‘ মুদ্রারাক্ষস ‘ প্রভৃতি ।  

গুপ্ত যুগের ইতিহাস রচনার জন্য বহু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানও পাওয়া যায় । এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ রচিত এলাহাবাদ প্রশস্তি । এই ছাড়া মথুরা , ভিটারী ও সাঁচির শিলালিপি এবং উদয়গিরির গুহালিপি থেকেও বহু তথ্য জানা যায় । গুপ্ত যুগে প্রাপ্ত মুদ্রা ও তাম্ৰ শাসনগুলিও গুপ্ত যুগের উপাদান হিসেবে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় । সর্বোপরি চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এবং ই-সিং এর বিবরণী থেকেও গুপ্ত যুগের বহু তথ্য জানা যায় । 

গুপ্তদের পরিচয় 

উপাদানের প্রাচুর্য সত্ত্বেও গুপ্ত বংশের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি । শুঙ্গ ও সাতবাহন আমলে একাধিক ‘ গুপ্ত ’ নামীয় শাসকের উল্লেখ পাওয়া যায় । তবে এরা গুপ্ত রাজবংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি । ব্যাকরণবিদ চন্দ্রগোমিনের তথ্যের উপর নির্ভর করে জনৈক ঐতিহাসিক গুপ্তদের ‘ পাঞ্জাবের জাঠ সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষ ’ বলে বর্ণনা করেছেন ।  

ড. জয় সোয়ালের মতে , গুপ্তগণ নাগরাজাদের সামন্ত হিসেবে প্রয়াগ অঞ্চলে বাস করতেন । পরবর্তীকালে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন । ড. ডি. গাঙ্গুলীর মতে , গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল বাংলাদেশের মুর্শিদাবাদ অঞ্চল । চৈনিক পরিব্রাজক ই-সিং ও এই মত সমর্থন করেছেন । কিন্তু ড. এস. আর. গয়াল  এর মতে , গুপ্তগণ ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং তাদের আদি নিবাস ছিল প্রয়াগ , মথুরা ও কাশীর মধ্যবর্তী অঞ্চল ।  

গুপ্ত শাসনের প্রতিষ্ঠা

এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে প্রথম দুই গুপ্ত রাজা যথাক্রমে শ্রীগুপ্ত ও ঘটোৎকচ গুপ্তর ‘ মহারাজ ’ উপাধি গ্রহণের কথা জানা যায় । এই তথ্যের ভিত্তিতে এন. ঘোষ  মন্তব্য করেছেন যে , প্রাচীনকালে স্বাধীন রাজাগণ সাধারণ ‘ মহারাজাধিরাজ ’ উপাধি ধারণ করতেন ।’ মহারাজ’ ছিল মূলত সামন্তদের উপাধি । অতএব , প্রথমদিকে গুপ্তরা ছিলেন সামন্তরাজা । 

অবশ্য ড. রায়চৌধুরী এই বিভাজনকে অস্বীকার করে বলেছেন , সে যুগে স্বাধীন রাজাদেরও ‘ মহারাজ ’ উপাধি গ্রহণের রীতি ছিল । যাই হোক , প্রথম চন্দ্রগুপ্তের আমলেই গুপ্তগণ রাজনৈতিক প্রাধান্য অর্জন করেন এবং মগধকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্য গঠন করেন । পরবর্তী রাজা সমুদ্রগুপ্তের আমলে এই বংশ প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে ।  

প্রাক গুপ্ত যুগে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা

কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে উত্তর ভারতে একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল । এদের মধ্যে অনেকগুলি ছিল রাজতান্ত্রিক ও কিছু ছিল প্রজাতান্ত্রিক রাজ্য । তুলনামূলকভাবে প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলি ছিল দুর্বল । 

নাগ রাজ্য :  

রাজতান্ত্রিক রাজ্যগুলির মধ্যে নাগ রাজ্য ও বাকাটক রাজ্য ছিল গুপ্তদের মতই শক্তিশালী । এছাড়া , অযোধ্যা , কোশাম্বী , অহিচ্ছত্র প্রভৃতি রাজ্যও রাজতন্ত্র শাসিত ছিল । নাগগণ মথুরা , পদ্মাবতী , বিদিশা প্রভৃতি অঞ্চলে রাজত্ব করত । নাগ রাজাদের মধ্যে ভােগী , সদাচন্দ্র , ভবনাগ প্রভৃতি ছিলেন উল্লেখযোগ্য । নাগদের সাথে সমুদ্রগুপ্তের যুদ্ধ ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কথা জানা যায় । 

বাকাটক রাজ্য :  

বাকাটক রাজ্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিন্ধ্যশক্তি । তিনি নিজেকে ইন্দ্র ও বরুণের সাথে তুলনা করেছেন । কথিত আছে বাকাটকরাজ প্রবরসেন একাধিক রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন এবং ‘ সম্রাট ’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । বাকাটক ও নাগগণ পরস্পরের উপর নির্ভর করে শক্তি বৃদ্ধি করেছিল । বাকাটকদের সাথে গুপ্তদের বন্ধুত্ব সম্পর্ক দীর্ঘকাল বজায় ছিল । 

এ ছাড়া , অযোধ্যা , অহিচ্ছত্র , কোশাম্বী প্রভৃতি রাজ্যে একাধিক শক্তিশালী রাজার উত্থান ঘটলেও এই রাজ্যগুলি ছিল দুর্বল ও ক্ষুদ্র । 

প্রজাতান্ত্রিক রাজ্য সমূহ :  

প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলির অন্যতম ছিল মালব রাজ্য । আলেকজান্ডারের আক্রমণ কালে মালব রাজ্য যথেষ্ট সংহত ছিল । রাজস্থানের অন্তর্গত জয়পুরের নিকটবর্তী মালব নগর ছিল এদের রাজধানী । শকদের বিরুদ্ধে মালব রাজ্য যুদ্ধ করেছিল বলে জানা যায় । ভরতপুর ও আলেয়ার অঞ্চলে স্থাপিত অর্জুনায়ণ রাজ্য শকদের নিকট পরাজিত হলেও , পরবর্তী দীর্ঘকাল নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল । এ ছাড়া , কাবুল অঞ্চলের কুলাত রাজ্য , যমুনা ও শতদ্রু নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে কুনিদ রাজ্যও প্রজাতন্ত্র শাসিত ছিল । পরে এগুলি ও গুপ্তদের অধীনস্থ হয়ে যায় ।

error: Content is protected !!