কণিষ্কের কৃতিত্ব

কণিষ্কের কৃতিত্ব 

প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন প্রথম কণিষ্ক । বহিরাগত ভারতীয় শাসকদের মধ্যে তাকে শ্রেষ্ঠতম বলা যায় । কণিষ্কের আমলে কুষাণ সাম্রাজ্য কর্তৃত্ব ও গৌরবের শীর্ষে আরোহণ করে । মৌর্য বংশের পতনের পর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখান । রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক রূপেও তার অবদান স্মরণীয় ।  

কণিষ্কের তারিখ

কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । ড. ফ্লীট এর মতে , কণিষ্ক ৫৮ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন । কিন্তু এই মত গ্রহণযোগ্য নয় , কারণ প্রথম খ্রীষ্টপূর্বাব্দে গান্ধারে কুষাণ কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়নি । অথচ একথা সত্য যে , গান্ধার কণিষ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল । 

স্মিথ , মার্শাল প্রমুখের মতে , কণিষ্ক ১২৫ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন । কিন্তু এ মতও যুক্তিগ্রাহী নয় । কারণ দ্বিতীয় শতকে শকরাজ রুদ্রদামন নিম্নসিন্ধু অঞ্চলে রাজত্ব করতেন । একই অঞ্চলে একই সময়ে দুই বংশ কিভাবে শাসন করতেন তা পরিষ্কার নয় । তা ছাড়া , একথা প্রমাণিত যে , কণিষ্ক একটি অব্দের প্রচলন করেছিলেন । কিন্তু দ্বিতীয় শতকে কোন নতুন অব্দের প্রচলন হয়নি ।  

র‍্যাপসন , ফারগুসন প্রমুখের মতে , কণিষ্ক ৭৮ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন । এবং ঐ বৎসরই তিনি ‘ শকাব্দ’ প্রচলন করেছিলেন । এই তারিখটি অধিকাংশ পণ্ডিত গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন । অনেকের জিজ্ঞাসা কণিষ্ক শক নয় , তাহলে তার প্রবর্তিত অব্দের নাম ‘ শকাব্দ’ হল কেন ? সম্ভবত পশ্চিম ভারতে শকদের মধ্যে এই ‘ অব্দ’টি দীর্ঘকাল প্রচলিত থাকার ফলে এটি শকাব্দ নামে অভিহিত হয়েছে । 

কণিষ্কের রাজ্য জয়  

যুদ্ধ জয়ের দ্বারা কণিষ্ক সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃত করেন । সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি কাশ্মীর জয় করেন এবং গাঙ্গেয় উপত্যকায় কুষাণ কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করেন । কাশ্মীরে তিনি বহু সৌধ ও ‘ কণিষ্কপুর ’ নামে একটি শহরের পত্তন করেন । চৈনিক ও তিব্বতীয় সূত্র থেকে জানা যায় , কণিষ্ক পাটলিপুত্র দখল করেছিলেন । বৌদ্ধ কিংবদন্তী অনুসারে দার্শনিক অশ্বঘোষ কে এখান থেকে ধরে কণিষ্কের রাজধানী পুরুষপুরে আনা হয়েছিল । তিনি পহ্লবদেরও বশ্যতাস্বীকারে বাধ্য করেছিলেন ।  

তাঁর মুদ্রা থেকে জানা যায় , গাজীপুর , গোরক্ষপুর পর্যন্ত তাঁর রাজ্যসীমা বিস্তৃত ছিল । উজ্জয়িনীর শক ক্ষত্রপ চস্টন কণিষ্কের নিকট পরাজিত হয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন বলে অনুমিত হয় । কণিষ্ক মধ্য এশিয়ায় চীনা কর্তৃত্ব নাশের জন্য অভিযান চালান । তবে প্রথম যুদ্ধে তিনি চীনা সেনাপতি প্যান-চাও এর নিকট পরাজিত হয়ে করপ্রদানে স্বীকৃত হন । তবে প্যান-চাও এর মৃত্যুর পর কণিষ্ক চীনাদের পরাজিত করে কাশগড় , খোটান , ইয়ারখন্দ নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন ।  

কণিষ্কের শাসন ব্যবস্থা 

কণিষ্কের রাজধানী ছিল পুরুষপুর । ঐ সময়ে মথুরা দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে স্বীকৃত হত । সম্রাট স্বয়ং ছিলেন শাসনের সর্বোচ্চে । শাসনের সুবিধার জন্য কণিষ্ক ক্ষত্রপ ব্যবস্থার মাধ্যমে , অর্থাৎ বিকেন্দ্রীকৃত শাসন পরিচালনা করতেন । তখন পূর্বাঞ্চলে মহাক্ষত্রপ , ক্ষরপল্ল ও উত্তর ভারতে লালা , বস্পসি প্রভৃতি ক্ষত্রপের নাম শাসক হিসেবে পাওয়া যায় ।  

বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা

অশোকের মত কণিষ্ক ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ সেবক । কণিষ্ক প্রথম জীবনে শৈব ছিলেন । পরে তিনি বৌদ্ধধর্মে আকৃষ্ট হন । তাঁর প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম দেশ বিদেশে প্রসার লাভ করে । হিউয়েন সাং এর বিবরণ থেকে জানা যায় , তিনি পুরুষপুরে একটি বহুতল চৈত্য নির্মাণ করেছিলেন । সম্ভবত এজেসিলাস ( Agesilaos ) নামক জনৈক গ্রীক স্থপতি এই চৈত্যের নকশা তৈরি করেছিলেন । এছাড়া , কণিষ্ক বহু স্থূপও নির্মাণ করেন । তাঁর চেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম চীন ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রসার লাভ করেছিল ।  

কণিষ্কের আমলে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল ‘চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি‘ অনুষ্ঠান । ইতিপূর্বে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কিছু কিছু নীতিগত ও আচারগত মতভেদ দেখা দিয়েছিল । এই মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে কণিষ্ক কাশ্মীরে ( মতান্তরে জলন্ধরে ) একটি বৌদ্ধ ধর্ম সম্মেলন আহ্বান করেন । এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন বৌদ্ধ শাস্ত্রজ্ঞ বসুমিত্র । এছাড়া , পার্শ্বঅশ্বঘোষ প্রমুখ পণ্ডিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন । এখানেই বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিপিটকের উপর অসংখ্য টীকা রচিত হয়েছিল । এখানে বৌদ্ধ ধর্মমতের যথার্থ ব্যাখ্যা গৃহীত হয় এবং তা একটি তাম্রফলকে উৎকীর্ণ করে একটি স্কুপ রাখার ব্যবস্থা করা হয় । এই সম্মেলনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা হীনযান ও মহাযান এই দুই গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যান । এখানে মহাযান মত সরকারি ভাবে গৃহীত হয় । 

শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা 

কণিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প ও সাহিত্যের প্রভূত বিকাশ ঘটেছিল । কবি , সাহিত্যিক , দার্শনিক অশ্বঘোষ কণিষ্কের রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন । তার রচিত ‘ বুদ্ধচরিত ’ , ‘ সৌন্দরানন্দ কাব্য ’, ‘বজ্রসূচী ‘ প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য । এছাড়া , ‘ প্রজ্ঞা পারমিতা শত সহস্রিকা ‘ প্রণেতা নাগার্জুন , ‘ মহাবিভাষ্য ‘ গ্রন্থের রচয়িতা বসুমিত্র , ‘ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ’ প্রণেতা চরক প্রমুখ কণিষ্কের রাজত্বকালকে গৌরবমণ্ডিত করেছেন ।  

শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক রূপেও কণিষ্ক খ্যাতির অধিকারী ছিলেন । স্থাপত্য , ভাস্কর্য ও চিত্রকলার বিকাশে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল । পেশোয়ারে নির্মিত মঠ , মথুরা ও কণিষ্কের শিল্পকলার প্রমাণ বহন করে । কণিষ্কের রাজত্বকালেই গ্রীক ও ভারতীয় শিল্পরীতির সংমিশ্রণে উদ্ভূত ‘ গান্ধার শিল্প ’ উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল । গ্রীক ও রোমান শিল্পের সাথে ভারতীয় শিল্প ভাবনার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল এই গান্ধার শিল্পরীতি । পেশোয়ার ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গান্ধার রীতির নিদর্শন পাওয়া গেছে । পার্সি ব্রাউন , কুমার স্বামী , সরসী কুমার সরস্বতী প্রমুখ কলা সমালোচক গান্ধার শিল্পরীতিকে গ্রীক পদ্ধতিতে ‘ ভারতীয় মনের পরিস্ফুটন ’ বলে অভিহিত করেছেন ।  

উপরিলিখিত আলোচনা থেকে বলা যায় , কণিষ্ক ছিলেন প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ শাসকদের অন্যতম এবং বহিরাগত ভারতীয় শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম । কেবল সাম্রাজ্যের সংগঠন নয় , সুশাসন , শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে সেই সাম্রাজ্য এক পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল কণিষ্কের কৃতিত্বে ।

error: Content is protected !!