ভারত ছাড়ো আন্দোলন

ভারত ছাড়ো আন্দোলন 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতবাসীর সাহায্য ও সহানুভূতি অর্জনের জন্য ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এর নেতৃত্বে ভারতে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেছিল । ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে বহু আলাপ আলোচনার পর ক্রিপস যে প্রস্তাব করেন , তা ভারতীয়দের মনঃপূত হয়নি ।  

কংগ্রেস , মুসলিম লিগ , হিন্দু মহাসভা ইত্যাদি প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলই ক্রিপসের সূত্রগুলি প্রত্যাখ্যান করে । এই আলোচনা ভেঙে গেলে ভারতের রাজনীতিতে হতাশার ছায়া নেমে আসে । ব্রিটিশ সরকার জাতীয় সরকার গঠনের দাবি অগ্রাহ্য করলে কংগ্রেসের মনে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব ঘনীভূত হয় । ইংরেজের অনমনীয় মনোভাবে ক্ষুব্ধ গান্ধীজি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন ।  

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি গান্ধীজি সহ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের একাংশকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে প্ররোচিত করে । সিঙ্গাপুর , মালয় , ব্রহ্মদেশ , জাপানের পদানত হবার ফলে ভারতে জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে ওঠে । ভারতের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে । গান্ধীজি মনে করতেন যে , ভারতে ইংরেজের উপস্থিতিই এদেশে জাপানি আক্রমণের প্রধান কারণ । তাই তিনি কংগ্রেসের সামনে ‘ ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলনের প্রস্তাব উপস্থাপিত করেন । 

ভারত ছাড়ো প্রস্তাব 

গান্ধীজি ‘ হরিজন ‘ পত্রিকায় ( ২৬ এপ্রিল , ১৯৪২ ) প্রথম ‘ ভারত ছাড়ো ’ পরিকল্পনা প্রকাশ করেন । তিনি লিখেছিলেন , “ সময় মত সুশৃঙ্খলভাবে ভারতবর্ষ ত্যাগ করলেই ব্রিটেন নিরাপদ হতে পারে । ” হরিজন পত্রিকায় ‘ মে-জুন’ সংখ্যায় তিনি ‘ ভারত ছাড়ো ‘ নীতি ব্যাখ্যা করে লিখেন যে , ভারতে ইংরেজের কর্তৃত্ব জাপানকে ভারত আক্রমণে প্ররোচিত করবে । ইংরেজ ভারত ত্যাগ করলে জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে । এর পরেও জাপানি আক্রমণ ঘটলে ভারতবাসী মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আপ্রাণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে ।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে , বিদেশি আক্রমণের সুযোগে ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে স্বাধীনতা আদায় করা গান্ধীজির উদ্দেশ্য ছিল না । কিংবা নাৎসিবাদ , ফ্যাসিবাদ এবং সমরবাদকে সাহায্য করার কোনো ইচ্ছা ছিল না । বস্তুত ভারতের স্বার্থ , ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও বিশ্বশান্তির স্বার্থে গান্ধীজি এই পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন ।  

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ই জুলাই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ওয়ার্ধায় ‘ ভারত ছাড়ো ’ প্রস্তাব অনুমোদন করে । এক প্রস্তাব গ্রহণ করে কংগ্রেস সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে , যদি ইংরেজ সরকার কংগ্রেসের প্রস্তাব গ্রহণ না করে , তাহলে ভারতবাসী ব্যাপক ও বৃহত্তর আন্দোলনের শামিল হতে বাধ্য হবে । 

কংগ্রেসে দ্বিমত 

ভারত ছাড়ো প্রস্তাব অনুমোদন করলেও এই কর্মসূচি সম্পর্কে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের একাংশ দ্বিধান্বিত ছিলেন । জওহরলাল নেহরু , মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ প্রথম দিকে যুদ্ধ সম্পর্কে গান্ধীজির মূল্যায়ন সম্পর্কে একমত ছিলেন না । নেহরু , আজাদ প্রমুখ জাপানি আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য ভারতবাসীকে মিত্রশক্তিকে ( ইংল্যান্ড , ফ্রাল ইত্যাদি ) সর্বপ্রকার সহায়তা দানের জন্য আহ্বান জানান ।  

এঁদের মতে , এ অবস্থায় ভারতবাসীর সরকার বিরোধী আন্দোলন স্বৈরতান্ত্রিক অক্ষ শক্তিকেই সাহায্য করবে । অবশ্য গান্ধীজির অনমনীয় ও আপসহীন মনোভাবের ফলে , শেষ পর্যন্ত এঁরা গান্ধীজির প্রস্তাব মেনে নেন । 

করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে 

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ৮ ই আগস্ট বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ‘ ভারত ছাড়ো ’ প্রস্তাব অনুমোদিত হয় । স্থির হয় , গান্ধীজির নেতৃত্বে যথাসম্ভব অহিংসভাবে গণ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে । গান্ধীজি ঘোষণা করলেন , “ পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কিছুই তাঁকে সন্তুষ্ট করবে না । ” তিনি বলেন , “ করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে । হয় আমরা ভারতকে স্বাধীন করব অথবা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মৃত্যুবরণ করব ” ( “ We shall do or die . We shall either free India or die in the attempt . ” ) ।  

কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হল , “ ভারতবাসীর ন্যায় সংগত দাবি উপেক্ষিত হলে কংগ্রেস যে কোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত । কংগ্রেসের নিকট এ হল শেষ লড়াইয়ের অঙ্গীকার ”। প্রস্তাবের উপসংহারে বলা হল , “ জাতি আজ সাম্রাজ্যবাদী , স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের সংকল্পকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে ব্রতী । তাকে দমিয়ে রাখার কোনো চেষ্টাই সমর্থন করা যায় না । অহিংস এই গণ সংগ্রামের অবিসংবাদী নেতা গান্ধীজি । ” প্রস্তাব গৃহীত হবার অব্যবহিত করে গান্ধীজি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন , ‘ ..এই মুহূর্ত থেকে প্রত্যেক নরনারী নিজেকে স্বাধীন মনে করবে । মনে রাখতে হবে , আমরা কেউই সাম্রাজ্যবাদের পদানত নই । ” 

নেতাদের গ্রেপ্তার 

ব্রিটিশ সরকার ‘ ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলন সম্পর্কে প্রথম থেকেই খোঁজখবর রাখছিল । সরকার দমননীতির দ্বারা এই পরিকল্পনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে উদ্যোগী হয় । পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার ৮ ই আগস্টের মধ্যারাত্রে গান্ধীজি , আজাদ প্যাটেল , নেহরু প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে । কংগ্রেসকে ‘ বেআইনি সংগঠন ’ বলে ঘোষণা হয় । এক সপ্তাহের মধ্যে কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় । নেতাদের গ্রেপ্তারের সংবাদে সারা ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । ক্রমে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ভারতের সমস্ত অংশে । 

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিস্তৃতি

সরকার অধিকাংশ নেতাকে গ্রেপ্তার করলেও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ‘ ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে । ছাত্র , শিক্ষক , কর্মচারী , শ্রমিক , কৃষকসহ প্রায় সমস্ত স্তরের মানুষ আন্দোলনে শামিল হয়েছিল । আন্দোলনের গভীরতা ও ব্যাপকতা ১৮৫৭ -র মহাবিদ্রোহের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না ।  

ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে এক পত্রে জানিয়েছিলেন , “ আমি এখানে ১৮৫৭ -র পর সবথেকে গুরুতর বিদ্রোহ দমনে নিমগ্ন আছি , নিরাপত্তার কারণে এই বিদ্রোহের ব্যাপকতা ও গুরুত্ব বিশ্ববাসীর গোচরে আনছি না ” ( আগস্ট ১৯৪২ খ্রিঃ ) । বোম্বাই , আহমেদাবাদ , পুনা , দিল্লি প্রভৃতি অঞ্চল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয় । জামসেদপুর , গুজরাত , মহারাষ্ট্র প্রভৃতি স্থানে শ্রমিকরা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ধর্মঘট শুরু করেন । গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন । কলিকাতা সহ অধিকাংশ শহরে স্কুল , কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও যুবকেরা সক্রিয়ভাবে আন্দোলন যোগদান করে । 

গণ বিদ্রোহ 

প্রাথমিক পর্যায়ে সভা সমিতি , মিছিল , হরতাল প্রভৃতি চিরাচরিত পদ্ধতি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল । কিন্তু কালক্রমে এই আন্দোলন সশস্ত্র গণ অভ্যুত্থানের চরিত্র গ্রহণ করে । বিহার , মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চলকে সাময়িকভাবে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করা হয় । তমলুকে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন জাতীয় সরকার ।  

সুতাহাটা , নন্দীগ্রাম , মহিষাদল সহ তমলুকের অধিকাংশ অংশে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন । কোর্ট ও থানা দখল করতে গিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেন পুলিশের গুলিতে । বিদ্রোহীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন তুলে ফেলে , ভেঙে দেয় টেলিগ্রাফের লাইন । অগ্নি সংযোগ করা হয় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে । চেষ্টা করা হয় থানা দখলের । সারা ভারতে প্রায় ২০৮ টি থানা আক্রান্ত হয়েছিল । 

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অবসান

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ব্যাপকতার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশও তাদের দমন পীড়ন বৃদ্ধি করতে থাকে । পুলিশের গুলিতে প্রাণ গিয়েছিল বহু ভারতবাসীর । কারারুদ্ধ করা হয়েছিল হাজার হাজার ব্যক্তিকে । প্রায় সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছিল এক কারাগারে । ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকে এই আন্দোলনের তীব্রতা কমতে শুরু করেছিল । ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের আত্মসমর্পণ করার পরে আগস্ট আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে । 

ব্যর্থতার কারণ

ভারত ছাড়ো আন্দোলন যে পরিমাণ বিস্তৃতি লাভ করেছিল , সেই তুলনায় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি । এত বড়ো একটা গণ আন্দোনের ব্যর্থতার জন্য বেশ কয়েকটি কারণ নির্দেশ করা যায় ।  

প্রথমত , কঠোর সরকারি দমননীতি এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল । নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার মেশিন গানের মতো শক্তিশালী মারণাস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেনি । প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কারারুদ্ধ করে আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল । 

দ্বিতীয়ত , ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না । গান্ধীজি মনে করেছিলেন , যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় আন্দোলনকারীদের প্রতি এমন কোনো আচরণ করবে না , যা জাতীয় সংকট বৃদ্ধি করতে পারে । তাই তিনি পরিস্থিতির অগ্রগতি অনুযায়ী কর্মসূচি রচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । বাস্তব ক্ষেত্রে গান্ধীজির ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছিল ।  

তৃতীয়ত , আন্দোলনকারীদের মধ্যে কোনো সংহতি ছিল না । সংগঠন ও সমন্বয়ের অভাবেই এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল । এমনকি কংগ্রেসও একসময় এই আন্দোলনের দায়িত্ব অস্বীকার করে বিবৃতি দেয় । 

মূল্যায়ন  

১৯৪২ এর বিপ্লব অসফল হলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমবিকাশে এই আন্দোলন স্থায়ী অবদান রেখে গেছে । বস্তুত ১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহের পর এটিই ছিল ভারতবাসীর সার্বিক জাগরণের বহিঃপ্রকাশ । আন্দোলনের ব্যাপকতা ব্রিটিশ সরকারের মনে যথেষ্ট ভীতি সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিল ।  

বড়লাট লর্ড লিনলিথগো স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছিলেন যে , “ এই বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হলে ভারতে ব্রিটিশ স্বার্থ চিরতরে বিপন্ন হয়ে যাবে । ” বস্তুত এই আন্দোলন ভারতবাসীর মানসিক দৃঢ়তা ও স্বাধীনতা স্পৃহার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে ।  

আগস্ট আন্দোলনের গভীরতা দেখে ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল , ভারতে তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে । তাই বলা চলে , ১৯৪২ এর আন্দোলন বিফল হলেও নিস্ফল ছিল না ।

error: Content is protected !!