১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন

১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন

বড়লাট লর্ড উইলিংডন কঠোর দমননীতি দ্বারা কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনকে দমন করতে বদ্ধপরিকর হন । অবশ্য ব্রিটিশ সরকার এটাও উপলব্ধি করেন যে , কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে যেমন ভারত সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হবে না , তেমনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে শুধুমাত্র ভ্রান্তনীতি দ্বারা বশীভূত করাও যাবে না ।  

তাই কংগ্রেস বর্জিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকের ( ১৯৩২ খ্রিঃ ) সুপারিশের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার একটি ‘ শ্বেত পত্র ’ প্ৰকাশ করেন ( ১৯৩৩ খ্রিঃ ) । এই শ্বেতপত্রের প্রস্তাবগুলির ভিত্তিতে ভারতের সাংবিধানিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার জন্য সংসদের একটি যৌথ কমিটির ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় । এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ‘ ভারত শাসন আইন ’ গৃহীত হয় । ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের দুটি উল্লেখযোগ্য অংশ হল– 

( ১ ) ব্রিটিশ ভারতীয় প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলি নিয়ে গঠিত একটি কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন এবং 

( ২ ) প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন । 

কেন্দ্রীয় যুক্তরাষ্ট্র 

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় বলা হল যে , যুক্তরাষ্ট্রের শাসনভার গভর্নর জেনারেল ও একটি মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত থাকবে । মন্ত্রীরা আইনসভার সদস্যদের মধ্যে থেকে গভর্নর জেনারেল মনোনীত হবেন । কেন্দ্রীয় সরকারের কাজগুলিকে ‘ সংরক্ষিত ” ( Reserved ) ও ‘ হস্তান্তরিত ’ ( Transferred ) –এই দু’ভাগে বিভক্ত করা হল । প্রতিরক্ষা , অভ্যন্তরীণ আইন শৃঙ্খলা , ধর্ম প্রভৃতি সুরক্ষিত বিষয়গুলি পরিচালনা করবেন স্বয়ং গভর্নর জেনারেল । হস্তান্তরিত বিষয়গুলি তত্ত্বাবধান করবেন বিভাগীয় মন্ত্রীগণ । এইভাবে কেন্দ্রে ‘ দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ‘ ( Dyarchy ) প্রবর্তিত হল ।  

প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্রে দেশীয় রাজ্যগুলির যোগদান স্বেচ্ছামূলক করা হয় । যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রণয়নের জন্য দুই কক্ষ যুক্ত আইনসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । ঊর্ধ্বকক্ষের সদস্যসংখ্যা নির্ধারিত হল ২৬০ জন । এর মধ্যে দেশীয় নৃপতিগণ ১০৪ জন সদস্য মনোনীত করবেন । গভর্নর জেনারেল মনোনীত করবেন ৬ জন এবং প্রদেশগুলি কর্তৃক নির্বাচিত হবেন ১৪০। অবশিষ্ট দশটি আসন খ্রিস্টান , অ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রভৃতি সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত রইল । নিম্নকক্ষের সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হল ৩৭৫ জন । 

এক্ষেত্রেও দেশীয় রাজ্য , সংখ্যালঘু সম্প্রদায় , তপশিলি সম্প্রদায় প্রমুখের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখা হল । উভয় কক্ষের সদস্যগণ নিজ নিজ সভার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নির্বাচনের অধিকার পেলেন । আইনসভা আহ্বান ও বাতিলের ক্ষমতা পেলেন বড়লাট । তার অনুমোদন ব্যতীত কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারবে না । প্রয়োজনে বড়লাট স্বয়ং অর্ডিন্যান্স জারি করে আইনবিধি তৈরি করতে পারবেন । তবে এর মেয়াদ হবে ৬ মাস । অবশ্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনুমোদন পেলে তা তিন বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকতে পারবে । 

প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন 

১৯৩৫ এর আইনে প্রদেশগুলিতে স্বায়ওশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয় । প্রদেশে গভর্নর ( ছোটো লাট ) একটি মন্ত্রিপরিষদের সাহায্যে শাসন পরিচালনার দায়িত্ব পান । স্থির হল , মন্ত্রীগণ আইনসভার সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত হবেন । বৃহৎ প্রদেশগুলিতে , যথা — বাংলা , আসাম , মাদ্রাজ , বোম্বাই , বিহার , যুক্তপ্রদেশে দুই কক্ষযুক্ত আইনসভা গঠিত হবে । ঊর্ধ্বকক্ষের নাম হল ‘ আইন পরিষদ ‘ ( Legislative Council ) এবং নিম্নকক্ষের নাম হল ‘ আইন সভা ‘ ( Legislative Assembly ) । অন্যান্য পাঁচটি প্রদেশে এক কক্ষযুক্ত আইন সভা গঠিত হবে । উপরোক্ত আইন সভাগুলির সদস্যপদ ‘ সাধারণ ‘ ও ‘ সাম্প্রদায়িক ‘ — এই দু’ভাগে বিভক্ত করা হল । 

সাধারণ আসনগুলির মধ্যে আবার তপশিলি অনুন্নত সম্প্রদায়ের জন্য কিছু আসন সংরক্ষিত রাখা হল । আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল ক্ষমতা ন্যস্ত হল আইন সভার হাতে । আইন পরিষদ কেবলমাত্র বিল সংশোধন ও অনুমোদনের অধিকার পেল । প্রাদেশিক আইন সভার ক্ষেত্রেও গভর্নরদের বিশেষ অধিকার দেওয়া হয় । যে কোনো অনুমোদিত বিল গভর্নরের অনুমতি ব্যতিরেকে আইনের মর্যাদা পাবে না । জরুরি প্রয়োজনে গভর্নর অর্ডিন্যান্স জারি করার অধিকার পেলেন । এমনকি দরকার মনে করলে আইনসভা ভেঙে দিয়ে গভর্নর নিজের হাতে প্রদেশের শাসনভার গ্রহণ করতেও পারবেন বলে স্থির হল । 

মূল্যায়ন 

১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন ভারতবাসীকে সন্তুষ্ট করতে পারে নি । বস্তুত এই আইনে এক অদ্ভুত ধরনের ‘ বিকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় ’ দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করা হয় । মুসলিম লিগ এই আইনকে সম্পূর্ণ অংশগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে এবং জানায় যে , “ এই আইন দ্বারা মুসলিম সমাজ অন্য যে কোনো সম্প্রদায়ের থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ”।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৩৫ এর আইন ছিল ইংরেজের কষ্ট কল্পনার ফসল । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , সুইজারল্যান্ড বা রাশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথে এই বিলের কোনো মিল ছিল না । ব্রিটিশ সরকার এই আইন দ্বারা কৌশলে ভারতে অনৈক্যের বীজ বপন করতে চেয়েছিল । এহেন যুক্তরাষ্ট্র কল্পনার পেছনে কোনোপ্রকার ভৌগোলিক , অর্থনৈতিক , জাতিগত বা ভাষাগত যুক্তি ছিল না ।  

স্বৈরাচারী রাজন্যবর্গের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার প্রদান করে সরকার ভারতবাসীর জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করতে এবং সাম্রাজ্যবাদকে পুষ্ট করতে প্রয়াসী হয়েছিল । প্রতিক্রিয়াশীল রাজ্যন্যবর্গকে গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীর আইন রচনায় দায়িত্ব দেওয়া ছিল বিড়ালকে মাছ পাহারার দায়িত্ব দেবার সমতুল্য ।  

১৯৩৫ এর আইনবিধি অনুযায়ী গঠিত মন্ত্রিসভাকে দায়িত্বশীল সরকার বলা যাবে না । কারণ আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পরাজিত হলেও মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হত না । আইন , আমলা ও সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা আইনসভার ছিল না । গভর্নর জেনারেল ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু । যে কোনো গৃহীত আইন বাতিল , সংশোধন , খুশি মতো আইন প্রণয়ন এবং আইনসভাকে বজায় রাখা বা বাতিল করা — সবই ছিল তার ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত ।  

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার তুলনায় প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় কিছু কিছু গ্রহণযোগ্য উপাদান ছিল । যেমন এখানে কোনো সংরক্ষিত বিষয় ছিল না বা আইন প্রণয়নে আইনসভার সামান্য কিছু স্বাধীনতা ছিল । তবে এক্ষেত্রেও গভর্নরদের হাতে অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রদান করে আইনসভাকে পঙ্গু করে রাখার চেষ্টা বজায় ছিল । অবশ্য জাতীয় কংগ্রেসের বামপন্থী গোষ্ঠী এই আইন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী আইনসভায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । নির্বাচনে জয়লাভ করে মন্ত্রিসভা গঠন করার পর দক্ষিণপন্থীরা বুঝেছিল যে , ১৯৩৫ এর স্বায়ত্ত শাসন অধিকার আসলে ছিল ‘ অন্তঃসারশূন্য ‘ উচ্চনাদ ।

error: Content is protected !!