স্বদেশী আন্দোলন

স্বদেশী আন্দোলন

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারি ভাবে ঘোষিত হলে সারা বাংলায় এক তীব্র ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় । সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও পত্রপত্রিকাগুলি এই দুরভিসন্ধিমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়  তাঁর ‘ বেঙ্গলী ‘ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে ‘ এক গুরুতর জাতীয় বিপর্যয় ‘ বলে মন্তব্য করেন । ‘ হিতবাদী ’ পত্রিকা মন্তব্য করে যে , ‘ বিগত ১৫০ বছরের মধ্যে বাঙালি জাতি এরকম দুর্দিনের সম্মুখীন হয়নি ।’ 

বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকাও এই সিদ্ধান্তের বিরূপ সমালোচনা করে । লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ ডেইলি নিউজ ‘ পত্রিকা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে ‘ অদূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তার ফসল ‘ বলে অভিহিত করে । বিভিন্ন সভা সমিতিতে এই পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয় । বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবে সম্মতি না দেবার জন্য ইংল্যান্ডের সেক্রেটারি অব স্টেট‌কে স্মারকলিপি পাঠানো হয় । প্রায় ষাট হাজার মানুষের স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি ব্রিটিশ কমন্সসভায় প্রেরণ করা হয় । জাতীয় কংগ্রেস বোম্বাই অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনাকে ‘বাঙালির জাতি সত্তাকে খণ্ডিত করার পরিকল্পনা ‘ বলে অভিহিত করে । 

বিশ্বকবির ক্ষোভ 

বঙ্গবাসীর সমস্ত প্রতিবাদকে অগ্রাহ্য করে সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ( ১৯ শে জুলাই , ১৯০৫ খ্রিঃ ) । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নরমপন্থী ভারতীয় নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে লেখেন , “ ইংরেজ সরকারের নিকট বঙ্গভঙ্গের সুবিচার আশা করা ‘ রাজদ্বারে মাথা খোঁড়া’র নামান্তর । ”  

কংগ্রেসের আবেদন নিবেদন নীতিকে লক্ষ্য করে তিনি ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলেনঃ “ তোমরা যদি আন্তরিক ভাবেই বিশ্বাস করো যে , বাংলাকে দুর্বল করার জন্যই এই পরিকল্পনা , তা হলে কার কাছে তোমরা সুবিচার চাইছ । ” একে তিনি ‘ নৈরাশ্যের ক্রন্দন ‘ বলে অভিহিত করেন । এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে কবিগুরু বলেন , “ সংঘাত ছাড়া কোনো বড়ো জিনিস গড়ে উঠতে পারে না । ” 

সঞ্জীবনী ’ কাগজের সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র দেশবাসীকে বিদেশি দ্রব্য বর্জন ও স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণের আহ্বান জানালে তা সমস্ত স্তরের মানুষের মধ্যে সাড়া জাগায় । 

রাখীবন্ধন উৎসব 

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ১৬ ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী হবে বলে সরকার ঘোষণা করে । সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলা । উদ্ধত ইংরেজ সরকার ঘোষণা করে , “ Partition is a settled fact . ” বঙ্গভঙ্গ হবেই প্রত্যুত্তরে সুরেন্দ্রনাথ বলেন , ” We shall unsettle the settled fact . ( বঙ্গভঙ্গ আমরা রুখবই ) । রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব অনুসারে এই দিনটি ‘ রাখীবন্ধন দিবস ’ রূপে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে শুরু হয় বিরাট শোভাযাত্রা । পথের দুধারে দণ্ডায়মান সকলের হাতে মৈত্রী ও একতার নিদর্শন স্বরূপ পরিয়ে দেওয়া হয় রাখী । অরন্ধন পালিত হয় ঘরে ঘরে । বন্ধ থাকে সমস্ত হাটবাজার ও দোকানপাট । 

স্বদেশী আন্দোলনের কর্মসূচি 

বিদেশি দ্রব্য বর্জনস্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ— এই দুটি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের প্রধান কর্মসূচি । বস্তুত বয়কট ও স্বদেশী একই ভাবধারার দুটি প্রকাশ । বয়কট ছিল নেতিবাচক এবং স্বদেশী ছিল ইতিবাচক দিক । এই নীতি দুটি ছিল পরস্পরের সম্পূরক । বিদেশি দ্রব্য বর্জন কার্যকরী না হলে যেমন স্বদেশী দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে না , তেমনি উপযুক্ত পরিমাণে স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদিত না হলে বিদেশি দ্রব্য সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করা সম্ভব হবে না । 

‘ বিদেশি ’ ( Boycott ) বলতে শুধুমাত্র বিদেশি দ্রব্য বর্জন নয় বিদেশি আদর্শ , আদব-কায়দা সবকিছুই বর্জন করার আদর্শ প্রচার করা হয় । ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার স্বদেশীর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন , “ কেবলমাত্র স্বদেশী দ্রব্য নয় , সমস্তরকম বিদেশি আদর্শের পরিবর্তে জাতীয় ভাষা , সাহিত্য , শিক্ষা এবং রাজনৈতিক আদর্শ , লক্ষ্য ও পদ্ধতি জনগণের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে । ” 

স্বদেশী আন্দোলনের প্রসার   

অল্পদিনের মধ্যেই স্বদেশী আন্দোলন সর্বাত্মক ও ব্যাপক আকার ধারণা করে । প্রতিষ্ঠিত হয় স্বদেশী কাপড়ের কল , ব্যাঙ্ক , গেঞ্জী, মোজা বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্যের কারখানা ইত্যাদি । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ বেঙ্গল কেমিক্যাল ’ , ডা. নীলরতন সরকার প্রতিষ্ঠা করেন ‘ জাতীয় সাবান কারখানা ‘ , জামসেদজী টাটা প্রতিষ্ঠা করেন ‘ লোহা কারখানা ’ । 

দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বদেশী দ্রব্য বিক্রয় করতে থাকেন । সেই সঙ্গে চলতে থাকে বিদেশি দ্রব্যের দোকানের সামনে লাগাতর পিকেটিং । পুড়িয়ে দেওয়া হয় বহু বিদেশি জিনিস । স্বদেশী আন্দোলনের প্রসারের ফলে বিলাতি দ্রব্যের চাহিদা ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে । বয়কট আন্দোলনের পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ‘ নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ ’ ( Passive Resistance ) আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয় । 

বিপিনচন্দ্রস্বদেশ ও স্বরাজ ’ গ্রন্থে সরকারের সঙ্গে সার্বিক অসহযোগিতার আহ্বান জানান । এক্ষেত্রেও মিলল অভূতপূর্ব সাড়া । বাঙালি ছাত্র-শিক্ষক বর্জন করল ইংরেজি বিদ্যালয় । উকিল-মুহুরী ত্যাগ করল ইংরেজের কোর্ট-কাছারি । এমনকি ধোপা , নাপিত , রাঁধুনি ইত্যাদি শ্রেণির কর্মীরাও বর্জন করল তাদের ইংরেজ মালিকদের । 

স্বদেশী আন্দোলনে সাহিত্যিকদের অবদান  

স্বদেশী আন্দোলনে প্রেরণা জোগাতে বাঙালি কবির লেখনী ঝলসে ওঠে । রচিত হয় বহু স্বদেশী আদর্শ ভিত্তিক কবিতা , গান ও নাটক । এগুলির মধ্যে কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল রবীন্দ্রনাথের গান ‘ যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে– । ‘বাংলার মাটি বাংলার জল , বাংলার মাটি , বাংলার ফল , পুণ্য হউক , হে ভগবান ‘ । রজনীকান্ত সেনের গান ‘ মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই ‘ । মুকুন্দ দাসের গান ‘ ফেলে দে রেশমি চুড়ি বঙ্গনারী কভু হাতে আর পরো না ‘ ইত্যাদি । দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচনা করেন ‘ মেবার পতন ’ , ‘ দুর্গাদাস ’ , ‘ প্রতাপ সিংহ ’ প্রভৃতি দেশাত্মবোধক নাটক । 

স্বদেশী আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান   

স্বদেশী আন্দোলনের ব্যাপকতা ব্রিটিশ সরকারকে চিন্তিত করে তোলে । সরকার নানাপ্রকার দমনমূলক ব্যবস্থার দ্বারা এই আন্দোলনকে বন্ধ করতে অগ্রসর হয় । এই আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের ব্যাপক যোগদানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মুখ্যসচিব কার্লাইল একটি সার্কুলার জারি করেন । এটি ‘ কার্লাইল সার্কুলার ‘ নামে খ্যাত ।  

এতে বলা হয় , বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি ছাত্রদের স্বদেশী আন্দোলন থেকে বিরত করতে না পারে , তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে । এই সার্কুলারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । এই নির্দেশ উপেক্ষা করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য গঠন করা হয় ‘ অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি ‘ ( Anti circular Society ) । এই সমিতির প্রধান কাজ ছিল শাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের বিকল্প শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা । এই কাজে এগিয়ে আসেন দেশের বহু ধনী ব্যক্তি ।  

শ্রী সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ ডন সোসাইটি ‘ ( ১৯০২ খ্রিঃ ) । এই সমিতির উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের কর্মসূচি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই নভেম্বর এক জনসভা আহূত হয় । এই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ‘ ( ১৯০৬ খ্রিঃ ) । এই পরিষদ বহু স্বদেশী শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজও বর্তমান । 

বাংলার বাইরে স্বদেশী আন্দোলন  

ক্রমে স্বদেশী আন্দোলন ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে । সরকারের গোপন রিপোর্ট থেকে জানা যায় , বোম্বাই , উত্তরপ্রদেশ , মধ্যপ্রদেশ , মাদ্রাজ , পাঞ্জাব , বিহার প্রভৃতি প্রদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল ।

error: Content is protected !!