চরমপন্থী মতবাদ উদ্ভবের কারণ

চরমপন্থী মতবাদ উদ্ভবের কারণ 

জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ( ১৮৮৫ খ্রিঃ ) ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিশিষ্ট অধ্যায়ের সূচনা করেছিল । কিন্তু প্রথমদিকে নরমপন্থী নেতারা ‘ আবেদন নিবেদন ’ নীতির দ্বারা শাসন সংস্কারে পক্ষপাতী ছিলেন । এর প্রধান কারণ হল ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তাঁদের আস্থা । কিন্তু ক্রমে সরকারের বিভিন্ন কার্যকলাপ ভারতবাসীর আশা ভঙ্গ করতে থাকে ।

সরকারি নীতির প্রতি ক্ষোভ 

সরকার নরমপন্থীদের দাবি দাওয়া পূরণ করেননি , পরন্তু তারা বিভিন্ন প্রকার দমনমূলক আইন জারি করে ভারতবাসীকে জব্দ করতে অগ্রসর হন । যেমন , সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের জন্য গঠিত হয় ‘ সিক্রেট প্রেস কমিটি ’ ( ১৮৯৮ খ্রিঃ ) ‘ নিউজ পেপারস অ্যাক্ট ’ ( ১৯০৮ খ্রিঃ ) , ‘ ইন্ডিয়ান প্রেস অ্যাক্ট ‘ ( ১৯১০ খ্রিঃ ) ইত্যাদি । লোকমান্য তিলক সহ অনেক নেতাকে স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য কারাদণ্ডও দেওয়া হয় । জারি হয় ক্রিমিন্যাল ( অ্যামেন্ডমেন্ট ) অ্যাক্ট ( ১৯০৮ খ্রিঃ ) ।  

ভারতবাসী বুঝতে পারে যে , স্বাধিকার সম্প্রসারণ নয় , হরণ করতেই ব্রিটিশ সরকার বেশি আগ্রহী । লর্ড কার্জনের আমলে সুসভ্য ব্রিটিশ সরকারের নগ্নরূপ প্রকাশ হয়ে পড়ে । তিনি ঘোষণা করেন যে , জাতীয় কংগ্রেসকে ধ্বংস করাই হবে তাঁর জীবনের ব্রত । বিশ্ববিদ্যালয় আইন , কর্পোরেশন আইন প্রভৃতি দমনমূলক আইন জারি করে কার্জন ভারতের স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে পঙ্গু করে দিতে উদ্যত হন । ফলে কংগ্রেসের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠী এবং ভারতের যুবসম্প্রদায় প্রার্থনার পরিবর্তে জোরপূর্বক অধিকার অর্জনের স্থির লক্ষ্যে অগ্রসর হতে থাকেন । 

অর্থনৈতিক শোষণ 

ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশে ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক শোষণ ও তজনিত ক্ষোভ বিশেষভাবে দায়ী ছিল । কোম্পানির আমলে ইংরেজের যে ভারত শোষণ শুরু হয়েছিল , মহারানীর শাসনাধীনে এসেও ( ১৮৫৮ খ্রিঃ ) তা অব্যাহত ছিল । একের পর এক আইন জারি করে সরকার ভারতীয় বণিকদের ধ্বংস করছিল । 

ইংল্যান্ডের শিল্পদ্রব্যের স্বার্থরক্ষার জন্য সরকার এদেশে শিল্পগঠনেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি । পরন্তু সমস্ত কাঁচামাল সংগ্রহ করেও সস্তামূল্যে শিল্পজাত দ্রব্য আমদানি করে এদেশের ছোটো ছোটো হস্তশিল্পগুলিকেও ধ্বংস করেছিল । দাদাভাই নৌরজী ও রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁদের স্ব স্ব গ্রন্থে ভারতে ব্রিটিশ শোষণের নির্মম চিত্রটি তুলে ধরেন । ভারতবাসী বুঝতে পারেন যে , নরমপন্থী নীতি দ্বারা এই লোভী ও শোষক সরকারের চরিত্র পরিবর্তন সম্ভব হবে না । 

দার্শনিক প্রভাব 

চরমপন্থী মতবাদের উদ্ভবে মনস্তাত্ত্বিক বা দার্শনিক কারণও ছিল । আমেরিকা , রাশিয়া , ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের বৈপ্লবিক ভাবধারা বিকাশে ঐসব দেশের সাহিত্যিক দার্শনিকদের যেমন অবদান ছিল , ভারতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি । অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠির মতে , এদেশে চরমপন্থার বিকাশে আদর্শবাদ বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল ।  

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী , স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখের রচনা ভারতীয় আদর্শবাদের শক্তি ও গভীরতাকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছিল । বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ আনন্দমঠ ‘ গ্রন্থ ও ‘ বন্দে মাতরম ‘ ধ্বনি , বিবেকানন্দের ‘ জাগ্রত ভারত ’ গ্রন্থ প্রভৃতি দেশের যুবকদিগকে দেশমাতার শৃঙ্খলমোচনের জন্য আত্মবলিদানে উদ্বুদ্ধ করে তোলে ।  

যুবশক্তির হতাশা 

ভারতবাসীর দারিদ্র্য ও যুবসম্প্রদায়ের হতাশা চরমপন্থার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল । ইংরেজের স্বার্থপর অর্থনীতি ভারতবাসীকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে টেনে এনেছিল । এমনকি পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকেরাও উপযুক্ত বৃত্তিলাভে বঞ্চিত ছিলেন । আবার কাজ পেলেও ইংরেজের তুলনায় ভারতীয়দের বেতন ছিল অল্প । এই ক্ষোভ ভারতবাসীকে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে উৎসাহিত করে । 

আন্তর্জাতিক প্রভাব 

ভারতে চরমপন্থী মতবাদ প্রসারের ক্ষেত্রে কিছু কিছু বৈদেশিক ঘটনার প্রভাব বিদ্যমান । এগুলির মধ্যে ক্ষুদ্র দেশ জাপানের উত্থান , ইতালির আবিসিনিয়ার যুদ্ধ  ( ১৮৯৬ খ্রিঃ ) , বুয়র যুদ্ধ ( ১৮৯৯ খ্রিঃ ) , রুশ-জাপান যুদ্ধ ( ১৮০৫ খ্রিঃ ) উল্লেখযোগ্য । ক্ষুদ্রদেশ জাপান আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বৃহৎদেশ রাশিয়াকে পরাজিত করলে সারা বিশ্ব হতচকিত হয়ে যায় । এই দৃষ্টান্তকে মনে রেখে পত্রপত্রিকা লেখে জাপানের মতো ভারতও ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করতে সক্ষম ।  

এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলন , মিশর , তুরস্কের বিপ্লবী আন্দোলন প্রভৃতিও ভারতবাসীকে বৈপ্লবিক আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে । চরমপন্থী মতবাদ প্রধানত চারটি আদর্শকে সামনে রেখে এগিয়ে চলে । এগুলি হল —– 

( ১ ) সক্রিয় আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ভারতবাসীর ন্যায্য দাবি আদায় করা । 

( ২ ) ভারতীয় ঐতিহ্যের নিরিখে জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা । 

( ৩ ) শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পরিবর্তে প্রকৃত স্বরাজ অর্জনে চেষ্টা করা এবং 

( ৪ ) প্রয়োজনে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া ।

error: Content is protected !!