স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এর অবদান

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এর অবদান

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে রাজা রামমোহন রায় যেমন যুক্তিবাদী চিন্তাধারা ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের দ্বারা হিন্দু সমাজের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা করেছিলেন , তেমনি স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ( ১৮১৭-১৮৯৮ খ্রিঃ ) ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে মুসলমান সমাজের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও যুক্তিবাদী ভাবধারার প্রসার ঘটিয়ে মুসলমানদের মধ্যে এক নতুন চেতনার সঞ্চার করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন ।

আধুনিক চেতনা 

১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারতের এক অভিজাত মুসলমান পরিবারে তাঁর জন্ম হয় । বাল্যকালে উচ্চশিক্ষা লাভ করে তিনি বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ও ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন । প্রথমদিকে তিনি ইসলামিক চিন্তা ভাবনার সাথে সংগতি রেখেই মুসলমানদের মধ্যে আধুনিকতার বিকাশ ঘটানোর তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন । তাঁর ধারণা হয়েছিল যে , ধর্মভীরু মুসলমান সমাজ আকস্মিক কোনো ঘোরতর পরিবর্তন বরদাস্ত করবে না ।  

তাই তিনি কোরানকে ইসলামের গ্রহণযোগ্য একমাত্র আধার গ্রন্থ বলে প্রচার করেন । তিনি আধুনিক যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের আলোকে কোরানের বিশ্লেষণ করেন । কোরানের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে তিনি ‘ কোরানের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা জনিত প্রমাদ ‘ বলে ঘোষণা করেন । কিন্তু এই পথে পিছিয়ে থাকা মুসলমান সমাজকে দ্রুত এগিয়ে আনা যে সম্ভব নয় , তা তিনি খুব শীঘ্রই উপলব্ধি করেন । 

ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব  

সৈয়দ আহমেদ বুঝেছিলেন , ভারতে মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ তাদের ইংরেজ বিদ্বেষ । মুঘল শাসনের অবসান ঘটানোর কারণে মুসলমান সমাজ ইংরেজের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন হয়েছিল । এই কারণে তারা ওয়াহাবি আন্দোলনকে সমর্থন করে এবং মহাবিদ্রোহের সময় ব্যাপক হারে সিপাহিদের পক্ষে যোগদান করে । প্রচণ্ড ইংরেজ বিদ্বেষ এর ফলে প্রায় সমগ্র মুসলমান সমাজ ইংরেজের সম্পর্ক বর্জন করে চলেছিল । এমনকি ইংরেজের জ্ঞান বিজ্ঞান বা আধুনিক শিক্ষাগ্রহণকেও তারা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে চলছিল ।  

মুসলমান সমাজের এহেন বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কথা ইংরেজদের অজ্ঞাত ছিল না । তাই তারা পরোক্ষভাবে হিন্দু তোষণ নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে । হিন্দুরাও পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব যথার্থ উপলব্ধি করতে পেরে তা গ্রহণ করতে এগিয়ে আসে । কলকাতা , বোম্বাই , মাদ্রাজ ও অন্যান্য শহরের অভিজাত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুরা পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতি গ্রহণ করে দ্রুত উন্নতির পথে অগ্রসর হতে থাকে । ইংরেজের অধীন বহু পেশাগত কাজ ও প্রশাসনের বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ হিন্দুদের হস্তগত হয় ।  

পক্ষান্তরে , মুসলমানগণ সব ক্ষেত্রেই অবহেলিত ও অনাদৃত থেকে যায় । সৈয়দ আহমেদ বুঝতে পারেন যে , অযৌক্তিক বিদ্বেষ পরিহার না করলে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ না করলে মুসলমান সমাজ ক্রমশই পিছিয়ে পড়বে । 

ইংরেজ তোষণের চেষ্টা

তারপর তিনি মহাবিদ্রোহের সময় মুসলমানদের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজদের মুসলিম বিদ্বেষ হ্রাস করার জন্য সচেষ্ট হন । ‘ On the Loyal Mohammedans of India ‘ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে সৈয়দ আহমেদ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে , মহাবিদ্রোহের সময় যত মুসলমান বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছিল , তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক মুসলমান ইংরেজ সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছিল ।  

তিনি মুসলমান সমাজকেও এ কথা বোঝান যে , ইংরেজ সরকারের সাথে সহযোগিতা এবং ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণের উপরেই তাদের উন্নতি একান্তভাবে নির্ভরশীল । ইংরেজ সরকারও একটি বিশেষ কারণে সৈয়দ আহমেদের আবেদনে সাড়া দেয় । ইতিমধ্যে হিন্দুগণ পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করে এক নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল । জাতীয়তাবোধের বীজ শিক্ষিত হিন্দুদের মনে রোপিত হচ্ছিল । এমতাবস্থায় মুসলমানদের কিছুটা এগিয়ে এনে হিন্দুদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেলিয়ে দিলে প্রশাসনের সুবিধা হবে — এই পরিকল্পনা ইংরেজ সরকার গ্রহণ করে । 

আলিগড় আন্দোলন 

মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য ভাবধারা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ প্রসারের জন্য সৈয়দ আহমেদ যে কর্মসূচি গ্রহণ করেন , তা সাধারণভাবে ‘ আলিগড় আন্দোলন ‘ নামে খ্যাত । এই উদ্দেশ্যে তিনি একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন । ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি গাজিপুরে একটি ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেন । পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি স্থাপন করেন ‘ ট্রান্সলেশন সোসাইটি ‘ নামে একটি সমিতি । পরে এটির নাম হয় ‘ সায়েন্টিফিক সোসাইটি অব আলিগড় ‘ ।  

এরপর তিনি স্বল্পকালের জন্য ইংল্যান্ডে যান । সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি ‘ তাহজিব উল আখলাক ‘ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন । প্রায় একই সময়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ কমিটি ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং ‘ নামে একটি সংস্থা । এই কমিটি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করে । এই সুপারিশের অন্যতম ছিল একটি স্বতন্ত্র মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা । এই সুপারিশ অনুযায়ী তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ আলিগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ ‘।  

অক্সফোর্ড এ কেম্বিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে গঠিত এই কলেজ পাশ্চাত্য শিক্ষার একটি শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল । এই কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সৈয়দ আহমেদ গোঁড়া মুসলমান ও উলেমাদের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন । তবে বহু উদারপন্থী মুসলমান ও হিন্দু যেমন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর , সৈয়দ আহমেদের সপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন । সৈয়দ আহমেদও আলিগড় কলেজকে ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামি মুক্ত একটি যথার্থ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করার সংকল্প ঘোষণা করেছিলেন ।  

ভারতের আদিপর্বের জাতীয়তাবাদীরা আলিগড় আন্দোলনের মধ্যে নবজাগ্রত ভারতের ছবি কল্পনা করেছিলেন । তাদের ধারণা ছিল আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করে মুসলমানদের মধ্যে জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষিত হিন্দু মুসলমান মিলিতভাবে ভারতীয় জাতীয় জাগরণের কর্মসূচিকে ত্বরান্বিত করবেন । কিন্তু দুর্ভাগ্য ভারতের , ঘটনা স্রোত বইল অন্য খাতে । 

রাজনৈতিক চিন্তা 

সৈয়দ আহমেদ প্রথম জীবনে কোনো প্রকার রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন । কিন্তু কালক্রমে তার চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে । মুসলমানদের আর্থিক দুরবস্থা , সরকারি চাকুরিতে হিন্দুদের প্রাধান্য , হিন্দুদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি মুসলমান সমাজকে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চান । তিনি নিজে দেশপ্রেমিক হলেও , জাতীয় কংগ্রেসকে তিনি চরম শত্রু বলে মনে করতে শুরু করেন । তাই তিনি মুসলমানদের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে সংগঠিত যে কোনো আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকার উপদেশ দেন । 

জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে এবং ‘ মহামেডান এডুকেশনাল কংগ্রেস ‘ ( ১৮৮৬ খ্রিঃ ) স্থাপন করেন । এটিই পরে ‘ মহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স ‘ নামে পরিচিত হয় । এরপর তিনি গঠন করেন ‘ ইউনাইটেড্ পেট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন ‘ ( ১৮৮৮ খ্রিঃ ) । এই সংস্থার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় কংগ্রেসের বিরোধিতা করা ।  

এরপর তিনি স্থাপন করেন ‘ মহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন ’ ( ১৮৯৩ খ্রিঃ ) । এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল— ( ১ ) মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করা , ( ২ ) ইংরেজ শাসনকে সমর্থন করা এবং ( ৩ ) ইংরেজ শাসনের প্রতি অধিকতর মুসলমানদের আনুগত্য সৃষ্টি করা প্রভৃতি । 

বিচ্ছিন্নতাবাদের সূচনা 

সৈয়দ আহমেদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ইংরেজ সরকারকে তোষণ করা , নিজেদের জন্য সরকারি সুযোগ সুবিধা লাভ করা , এবং জাতীয় কংগ্রেসের বিরোধিতা করা । তিনি মুসলমানদের মধ্যে এই আশঙ্কা প্রবেশ করিয়ে দেন যে , ভারতবর্ষে প্রতিনিধিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও উন্নততর হিন্দুগণ অধিক ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে , মুসলমান সম্প্রদায় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভে বঞ্চিত হবে । 

১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে , জাতীয় কংগ্রেস ভারতের সকল সম্প্রদায়ের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হতে পারে না । তাই তিনি নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মুসলমানদের ইংরেজ শাসনের প্রতি নির্ভরশীল হতে উপদেশ দেন । অথচ কর্মজীবনের প্রথমদিকে সৈয়দ আহমেদ হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ঐক্য ও সহযোগিতার কথা প্রচার করেন । তিনি এমনও বলেছিলেন যে , হিন্দু মুসলমান দুটি চক্ষু ; –এর একটি আঘাতপ্রাপ্ত হলে অপরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে । কিন্তু ক্রমশ তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মন্তব্য করেন , “ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় ( হিন্দু ) সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ( মুসলিম ) স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে জলাঞ্জলি দেবে । ” তাই তিনি মুসলমানদের জন্য পৃথক সুযোগ সুবিধা দানের সপক্ষে মতপ্রকাশ করেন ।  

এইভাবে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেন এবং হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতি এবং তাদের স্বার্থও পরস্পর বিরোধী , –এই ‘ দ্বিজাতি তত্ত্বে’র বীজ বপন করেন । দ্বিজাতি তত্ত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রসারে আলিগড় কলেজের অধ্যক্ষ থিওডোর বেক এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর অব্ল্যান্ড কল্ভিন বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন ।  

অনেকের মতে , সৈয়দ আহমেদ বেক কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছিলেন , কিন্তু এ মত সম্পূর্ণ ভাবে সমর্থনযোগ্য নয় । কারণ আলিগড় কলেজ প্রতিষ্ঠার পূর্বেই তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের বিরোধিতা করেছিলেন । তা ছাড়া , তাঁর মতো শিক্ষিত ও বিচক্ষণ ব্যক্তি অপরের দ্বারা প্রভাবিত হবেন — একথা স্বীকার করা যায় না । যাই হোক , সৈয়দ আহমেদ প্রচারিত নীতি ও আদর্শ মুসলমান সমাজকে কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল , এ বিষয়ে সন্দেহ নেই ।

error: Content is protected !!