উনিশ শতকে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন

উনিশ শতকে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন  

ঊনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত । কারণ ধর্মভিত্তিক ভারতীয় সমাজ ধর্মীয় সংস্কার ব্যতীত কার্যকরী সামাজিক সংস্কার করা সম্ভব ছিল না । আলোচ্য সময়ের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজ , আর্যসমাজ , রামকৃষ্ণ মিশন , প্রার্থনা সমাজ , থিওজফিক্যাল সোসাইটি প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । 

ব্রাহ্মসমাজ এর অবদান 

ধর্ম সংস্কার তথা সমাজ সংস্কার প্রসঙ্গে বাংলার সন্তান রাজা রামমোহন রায়ের নাম স্মরণীয় । ধর্মান্ধতা , রক্ষণশীলতা , কুসংস্কার ও অমানবিক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রামমোহন ছিলেন এক মূর্ত প্রতিবাদ । তার নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ , বেদ ও উপনিষদের ভিত্তিতে হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যায় অগ্রণী হয়েছিল । ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের দুই তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেশবচন্দ্র সেন ।  

দেবেন্দ্রনাথ ‘ তত্ত্ববোধিনী ‘ পত্রিকার মাধ্যমে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনকে ব্যাপক করে তোলেন । ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন । তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও বাগ্মিতায় এই সমাজের আদর্শ ভারতের নানা স্থানে প্রসারিত হয় ।  

কেশবচন্দ্র সেনের সাথে মতভেদ হওয়ার কারণে দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র স্বতন্ত্রভাবে ‘ আদি ব্রাহ্মসমাজ ’ ও ‘ ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজ‘ নামে দুটি পৃথক সংঘের নেতৃত্ব দিতে থাকেন । কেশবচন্দ্র ব্রাহ্মরীতি ও ভগবৎপ্রেমের সাথে যীশুবাদের সমন্বয় ঘটান । সাষ্টাঙ্গ প্রণামের রীতিও তিনি সমাজে চালু করেন । তিনি পৌত্তলিকতাকে প্রাধান্য দেবার কথা বলেন । খ্রিস্টধর্মের দীক্ষা গ্রহণ ( baptism ) -রীতির সাথে হিন্দুধর্মের ‘ হোম ’ করার রীতির সংমিশ্রণ ঘটান । 

প্রার্থনা সমাজ এর অবদান

আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোকে হিন্দু ধর্মচিন্তা ও আচার আচরণ সংস্কারের জন্য ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবেই বোম্বাইতে গড়ে উঠেছিল ‘ প্রার্থনা সমাজ ‘ । জাতিভেদ প্রথা দূরীকরণ ও পুরোহিত প্রাধান্য খর্ব করাও ছিল এই সমাজের লক্ষ্য । প্রার্থনা সমাজের দুজন মহান নেতার নাম রামকৃষ্ণ ভান্ডারকর এবং মহাদেব গোবিন্দ রানাডে । 

আর্যসমাজ এর অবদান 

বাংলাদেশে যখন ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন সমাজে সাড়া জাগিয়েছে , তখন তার পাশাপাশি হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের চেষ্টাও হয় । উত্তর ভারতে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের চেষ্টায় ব্রতী হয় আর্যসমাজ । ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে স্বামী দয়ানন্দ এই সমাজ প্রবর্তন করেন । সত্যধর্মকে খুঁজে পেতে দয়ানন্দ বেদের উপর নির্ভর করেছিলেন । তিনি জানতেন যে , বেদে ঈশ্বরের বাণী অভ্রান্ত এবং সর্বজ্ঞানের আধার । 

হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে চিন্তাজগতে তিনি একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন । ব্রাহ্মণ , পুরোহিত নিয়ন্ত্রিত প্রচলিত হিন্দুধর্মের মূর্তিপূজা , আচার অনুষ্ঠান এবং জাতিভেদ প্রথার তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন । ধর্মের ভ্রান্ত অনুসরণের থেকে বাস্তব জীবনের সমস্যার দিকে তিনি মানুষের মনকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন । তার সংস্কার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুধর্মের সংস্কার । 

হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান মিশনারিদের মিথ্যা প্রচার এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনের ব্যাপকতার হাত থেকে সনাতন হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার উপায় হিসেবে স্বামী দয়ানন্দ আর্যসমাজের মাধ্যমে হিন্দুধর্মের সংস্কারে ব্রতী হন । অবশ্য শুধুমাত্র বেদ নির্ভরতা ও সব অভ্রান্ততায় বিশ্বাসের জন্য দয়ানন্দের মতবাদে কিছু পরিমাণ রক্ষণশীলতার ছোঁয়া লেগেছিল । তা সত্বেও আর্যসমাজ আন্দোলনের প্রাসঙ্গিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না । 

আর্যসমাজের সদস্যরা সমাজ সংস্কারমূলক কাজে খুবই উৎসাহী ছিলেন । এঁরা সাম্যভাব দ্বারা সমাজকে সঙ্ঘবদ্ধ ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করতেন । অস্পৃশ্যতা ও জন্মসূত্রে জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে এঁরা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন । নারীদের অবস্থার উন্নতি তথা নারীশিক্ষার বিস্তারেও এঁদের চেষ্টা ছিল । পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনকল্পে এঁরা বহু স্কুল-কলেজ স্থাপন করেছিলেন । তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে দেশবাসীকে সচেতন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন । এই কারণে বিদেশি ইংরেজদের সাথে তাঁর একধরনের বিরোধ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় । স্বামী দয়ানন্দ ইংরেজ বিরোধী যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটান , তার ফলেই ভাই পরমানন্দ , লালা হরদয়ালের মতো বিশিষ্ট বিপ্লবীদের উত্থান সম্ভব হয়েছে । 

শ্রীরামকৃষ্ণের লোকশিক্ষা

হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের অপর একটি কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশ । পরম পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে এই ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল । রামকৃষ্ণ যে সংস্কারে ব্রতী হন , সেখানে ধনী-নির্ধন , উচ্চ-নীচ — সব সমান । তৎকালীন ধর্মীয় বৈষম্যের মাঝে এই ধর্মীয় সাম্যবাদ সহজেই সঙ্গতি খুঁজে পেয়েছিল । এই ঐক্যবোধ জাতীয় আন্দোলনের ছিল এক পরম সম্পদ । তাঁর ধর্মসমন্বয়ের নীতি ধর্মীয় বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে দূর করে জাতীয়তাবাদকে সুদৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করে । 

স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা 

শ্রীরামকৃষ্ণের মহান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে গঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন এই আন্দোলনকে ব্যাপকতা দান করে । তিনি দেশবাসীকে স্বাধীনতা , সাম্য ও মুক্ত বুদ্ধির অনুশীলন করতে আহ্বান জানান । দেশের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য , দুর্দশা ও যন্ত্রণা দেখে স্বামীজী বেদনাহত কণ্ঠে বলেছিলেন , “ আমি একমাত্র সেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করি , যে ঈশ্বর সমস্ত আত্মার আত্মীয়আমার ঈশ্বরের অধিষ্ঠান সর্বদেশের পাপী যন্ত্রণাক্লিষ্ট ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে । ” স্বামীজী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন । হতাশাগ্রস্ত অধঃপতিত জাতিকে জাতীয় মন্ত্রে দীক্ষিত করে স্বামীজী আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেন । ব্যক্তিগত মুক্তি বা মোক্ষের ঊর্ধ্বে তিনি সমাজকল্যাণ বা সমাজসেবাকে স্থান দিয়েছেন । তিনি যুব সমাজকে এক নতুন আদর্শে উজ্জীবিত করেন , —যা প্রেরণা দেয় সংগ্রামী জাতীয়তাবাদকে । 

মূল্যায়ন 

আলোচ্য ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যে এক ধরনের সাদৃশ্য লক্ষণীয় । এই আন্দোলনগুলির পেছনে দ্বিবিধ প্রেরণা কাজ করেছিল ; যথা — যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ । এই সংস্কার আন্দোলন স্বাভাবিক কারণে মধ্যবিত্তশ্রেণিকেই বেশি আকৃষ্ট করত । কারণ এতে তাদেরই আশা আকাঙ্ক্ষাগুলি রূপায়িত হত । প্রথমদিকে এইসব সংস্কারকগণ ধর্মদ্রোহী ও সমাজদ্রোহী রূপে নির্ণীত হয়েছিলেন ; রামমোহন , দয়ানন্দ বা সৈয়দ আহমদ কেউই রক্ষণশীল গোষ্ঠীর বিরোধিতা থেকে মুক্তি পাননি ।

error: Content is protected !!