উনিশ শতকে ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলন

উনিশ শতকে ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলন 

ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা ভারতবাসীর সামনে উন্মুক্ত হওয়ায় ভারতের শিক্ষিত মানুষ ইউরোপের যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে আকৃষ্ট হয় । বহু ভারতীয়র মনেই এই চিন্তা জেগে উঠেছিল যে , আধুনিক ধারায় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তথা জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিধানের জন্য ভারতবর্ষের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন । 

ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় জাগরণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছিল সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে । নতুন ধারায় শিক্ষিত সমাজের মানুষেরা অধিকতর সংখ্যায় কঠোর সামাজিক নিয়মকানুন ও অর্থহীন আচার অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল । বিংশ শতাব্দীতে এই সমাজ সংস্কারের কাজ জাতীয় আন্দোলনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল ।  

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্কারকদের সংস্কার আন্দোলনের সাথে লর্ড বেন্টিঙ্ক প্রমুখ ইংরেজ শাসক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । ফলে সতীদাহ প্রথা , গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন , শিশুবলির মতো নিষ্ঠুর অমানবিক ও জঘন্য কুসংস্কারের অবসান ঘটেছিল । 

ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কার আন্দোলনে প্রায় সব ধর্ম সংস্কারক কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন । কারণ জাতিভেদ প্রথা , নারী জাতির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রভৃতি সামাজিক ত্রুটিগুলির পেছনে অতীতের ধর্মীয় সমর্থন ছিল । অবশ্য পরবর্তীকালে সমাজ সংস্কার ক্রমশ ধর্মনিরপেক্ষ রূপে পরিচালিত হয়েছিল । এমনকি ধর্মবিষয়ে রক্ষণশীল এমন বহু ব্যক্তি সমাজসংস্কারের কাজে যোগ দিয়েছিলেন । আলোচ্য সময়ে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দ্বিবিধ । প্রথম লক্ষ্য ছিল স্ত্রী স্বাধীনতা ও তাদের পুরুষদের সঙ্গে সমান অধিকার দান । আর দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল জাতপাতের কঠোরতা হ্রাস ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ । 

স্ত্রীজাতির দুরবস্থা 

বহু শতাব্দী ধরে ভারতে স্ত্রী-জাতিকে পুরুষের অধীনতাপাশে বন্ধ রাখা হয়েছিল । প্রচলিত বিভিন্ন ধর্ম ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধর্মসম্মত আইনে নারীর স্থান ছিল পুরুষের নীচে । এ ব্যাপারে উচ্চতর শ্রেণির নারীদের তুলনায় কৃষকশ্রেণির নারীদের অবস্থা কিছুটা উন্নত ছিল । কারণ কায়িক শ্রম করার ফলে নিম্নশ্রেণির মহিলাদের কিছুটা পারিবারিক মর্যাদা ছিল । নিম্নশ্রেণির ক্ষেত্রে পর্দা প্রথারও বিশেষ বাধ্যবাধকতা ছিল না । সাধারণভাবে গৃহকোণের বাইরে মেয়েদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকৃত ছিল না । মুসলমান রমণীদের ক্ষেত্রে তা ছিল পুরুষের অর্ধেক । অর্থাৎ দুই সমাজেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে নারীদের পুরুষ শাসিত হয়ে জীবনযাপন করতে হত । 

স্ত্রীজাতির উন্নতি 

ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানবিকতাবাদ ও সামাজিক সুবিচার প্রবণতায় উদ্বুদ্ধ সমাজ সংস্কারকেরা নারীজাতির উন্নতির জন্য একটা প্রবল আন্দোলন জাগিয়ে তুলেছিলেন । মানবিকতার যুক্তি ছাড়াও এইসব সংস্কারকেরা শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেছিলেন যে , নারীজাতিকে অবনত করে রাখা শাস্ত্র বিরোধী । বহু ব্যক্তি নারীশিক্ষা বিস্তার , বিধবা বিবাহের প্রবর্তন , বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ , পর্দাপ্রথা বিলোপ প্রভৃতি কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন । 

জাতিভেদ 

নবযুগের গণতান্ত্রিক ও যুক্তিবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ভারতের শিক্ষিত সমাজ জাতিভেদ প্রথার অনিষ্টকারিতা বুঝতে পেরে এই প্রথার বিরুদ্ধে সজাগ হয়ে উঠেছিলেন । বিশেষত অস্পৃশ্যতার মতো অমানবিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে ছিল এদের আক্রমণ । সমাজ সংস্কারমূলক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃবৃন্দের দৃঢ় ধারণা জন্মেছিল যে , রাজনীতি , সমাজ , অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় উন্নতি সাধন দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষকে সসম্মানে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে , তা কখনোই সম্ভব হতে পারে না ।  

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বহু ব্যক্তি এবং বহু প্রতিষ্ঠান অস্পৃশ্যদের বিরুদ্ধে যেসব সামাজিক অবিচার ও যেসব ভেদনীতির শিকার , সেইসব অবিচার ও ভেদনীতি দূর করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন । সেই সঙ্গে শুরু হয়েছিল অস্পৃশ্যদের মধ্যে শিক্ষা ও জ্ঞান সঞ্চারের । সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষেরাও তাদের জন্মগত অধিকারগুলি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছিল এবং এই অধিকারগুলি অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল ।

error: Content is protected !!