ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ফলাফল

ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ফলাফল 

কোনো কোনো পণ্ডিত অষ্টাদশ শতককে ভারত ইতিহাসের ‘ অন্ধকার যুগ ’ ( Dark Age ) বলে চিহ্নিত করেছেন । বস্তুত মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের ফলে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবনে যে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সূচনা ঘটেছিল , তার প্রভাব ছিল সর্বব্যাপী । ভারতবাসীর সামাজিক , ধর্মনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিমজ্জিত হয়েছিল গভীর অন্ধকারে । শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড স্বরূপ । অথচ সেই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবহেলিত থাকার অনিবার্য ফলস্বরূপ ভারতবাসী ক্রমশ জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে পড়তে থাকে ।  

ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে তিনটি উদ্দেশ্য

পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পশ্চাতে তিনটি পৃথক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল , যথা— 

( ১ ) খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্দেশ্য ছিল পাশ্চাত্য যুক্তিবাদে ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে তাদের খ্রিস্টানধর্মের প্রতি আগ্রহী করে তোলা । তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেকাংশ জুড়ে ছিল এদেশের ধর্মবিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠানের সমালোচনা এবং খ্রিস্টধর্মের গুণকীর্তন । 

( ২ ) কোম্পানির ডাইরেক্টর সভা চেয়েছিলেন কিছু সংখ্যক ভারতবাসীকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে এদেশে কোম্পানির শাসন পরিচালনার জন্য কিছু করণিক তৈরি করতে । 

( ৩ ) ব্যক্তিগতভাবে উদার ও মহৎ চরিত্রের কিছু মানুষ পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান প্রসারের দ্বারা ভারতবাসীর সামগ্রিক কল্যাণ ঘটাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন । 

যুক্তিবাদের উন্মেষ

ভারতবাসীর জীবনে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব ছিল সর্বাত্মক । পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী দর্শনের সংস্পর্শে আসার ফলে ভারতবাসীর জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল । অন্ধবিশ্বাস এবং যুক্তিহীন আচার অনুষ্ঠানের অসারতা উপলব্ধি করার ফলে ভারতবাসীর সমাজ জীবনে নানা পরিবর্তন ঘটেছিল । সতীদাহ প্রথা , গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন , নরবলি দেওয়া , বাল্য বিবাহ , বহু বিবাহ প্রভৃতি ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস এদেশের সমাজ জীবনে যে অভিশাপ ডেকে এনেছিল , পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে তা দূর হবার পথ প্রশস্ত হয় ।  

পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দ্বারা সনাতন হিন্দু ধর্মকে স্বমহিমায় বিরাজমান হতে সাহায্য করে । মনে রাখা দরকার , ভারতীয় সমাজ ধর্ম নির্ভর । আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রণালী বহুলাংশে ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । সেই ধর্ম ভাবনা যদি ভ্রান্ত হয় , তাহলে দৈনন্দিন জীবনের মাধুর্য ক্ষুণ্ন হতে বাধ্য । হয়েও ছিল তাই । 

কিন্তু পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ প্রচারিত হবার ফলে ভারতীয় যুক্তিবাদের বিকাশ সম্ভব হয় । এইভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা আমাদের জাতীয় জীবনের অভিশাপ মুছে দিয়ে , সুস্থ ও সুন্দর জীবনের পথ উন্মুক্ত করে দেয় । 

সীমাবদ্ধতা 

প্রসঙ্গত স্মরণীয় , অষ্টাদশ শতকে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন ঘটলেও তার প্রসার ছিল খুবই সীমিত । আধুনিক শিক্ষা বিষয়ে গ্রামাঞ্চল ছিল খুবই অবহেলিত । পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন ঘটেছিল মূলত শহরাঞ্চলে । আবার শহরের সমস্ত শ্রেণির মানুষ এই শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আসেনি । বাস্তবে ইংরেজি শিক্ষা কেবলমাত্র মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । প্রাথমিক পর্যায়ে এই মধ্যবিত্তশ্রেণি ইংরেজি শিক্ষাকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী হননি ।  

বলা যেতে পারে , ব্যক্তিগত ভাবে উন্নতির সোপান হিসেবে এঁরা নিজেদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে আগ্রহী । ইংরেজি শিক্ষায় বঞ্চিত থাকার ফলে এই শিক্ষার তাৎক্ষণিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি । অবশ্য এই কারণে পাশ্চাত্য শিক্ষা ভারতীয় জীবনকে আদৌ প্রভাবিত করেনি , —একথা বলা যাবে না । তবে এই প্রভাব ছিল কম ব্যাপক । 

নব্যবঙ্গ আন্দোলন 

সবাই না হলেও বেশ কিছু নব্য শিক্ষিত যুবক ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে ভারতীয় সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল । পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবে ওদের মন অন্ধসংস্কারে ভরা হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । এই যুবকদল ‘ নব্যবঙ্গ ‘ ( Young Bengal ) নামে খ্যাতিলাভ করে ।  

লুই ডিরোজিও’র নেতৃত্বে এই যুবকদল এদেশের পচনশীল রীতিনীতি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় । স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তিবাদে বিশ্বাসী এই যুবকেরা বিনা যুক্তিতে কোনো কিছু গ্রহণ করাকে অপরাধ বলে প্রচার করে । এদের প্রভাবে সনাতন হিন্দুধর্মের বহু অনাচার দূর হয়েছিল । এরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা , সভা সমিতি , শিক্ষালয় , চিকিৎসালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে প্রগতিবাদী হতে সাহায্য করে । এদের সততা , আদর্শবোধ ও দেশপ্রেম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে । 

জাতীয় চেতনার বিকাশ

পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য ফল ছিল ভারতবাসীর রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ । এতকাল ভারতবাসী তাদের জাতিগত ঐতিহ্য ও অধিকার সম্পর্কে অচেতন ছিল । পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে ভারতবাসী আমেরিকা , ফ্রান্স , গ্রিস প্রভৃতি দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত হতে পারে । ওইসব দেশের দৃষ্টান্ত আমাদের উদ্বুদ্ধ করে ।  

আধুনিক ভারতের পথিকৃৎ রামমোহন রায় সর্বপ্রথম ভারতবাসীর রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন । পাশ্চাত্য শিক্ষা যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে , তাই পরবর্তীকালে ভারতবাসীকে জাতীয় স্বার্থে সংগ্রামমুখী করে তোলে । প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কংগ্রেস । ধীরে ধীরে শুরু হয় ভারতবাসীর জাতীয় সংগ্রাম । 

সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ 

পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সুযোগ গ্রহণ করে হিন্দু সম্প্রদায় । ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হবার ফলে একদিকে যেমন হিন্দু সমাজ কুসংস্কার মুক্ত হতে পারে , অন্যদিকে তেমনি এই শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে হিন্দুরা অধিকাংশ সরকারি চাকুরি লাভ করতে পারে । সরকারি চাকুরি পাবার ফলে হিন্দুদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায় ।  

পক্ষান্তরে , মুসলমান সম্প্রদায় পাশ্চাত্য শিক্ষাকে বর্জন করতে থাকে । মুসলমানগণ মুঘল শাসন তথা মুসলমান শাসনের পতনের জন্য ইংরেজদের দায়ী করত । তাদের মতে , মুসলমানদের দুরবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী বিদেশি ইংরেজগণ । তাই মুসলমানেরা সতর্কিতভাবে ইংরেজদের সংস্পর্শ বর্জন করার নীতি অনুসরণ করতে থাকে । এই ভ্রান্ত যুক্তির বশবর্তী হবার ফলে মুসলমানগণ অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে । সরকারি চাকুরি তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায় ।  

এই ঘটনার পরিণতিতে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হতে থাকে । কালক্রমে এই ব্যবধান দুই সম্প্রদায়কে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত করে তোলে । মুসলমানগণ হিন্দুদের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হতে থাকে । ইংরেজি শিক্ষা ও ইংরেজের চাকুরি গ্রহণ করার জন্য তাদের কাছে হিন্দুরা ইংরেজের দোসর বলে পরিগণিত হতে থাকে । প্রাথমিক পর্যায়ের এই ব্যবধান কালক্রমে সাম্প্রদায়িকতায় রূপান্তরিত হয় । এইভাবে নেমে আসে ভারত জীবনের সবথেকে বড়ো অভিশাপ । ইংরেজ শাসকগণও এই হিন্দু-মুসলমানের বিভেদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শাসন ও শোষণকে কায়েম রাখতে সচেষ্ট হয় । 

ভাবের আদান প্রদান 

পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ফলে দেশের এবং বিদেশের ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে ভারতবাসীর ভাবের আদান প্রদান সম্ভব হয় । বহু ভাষাভাষী মানুষ অধ্যুষিত ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাবের আদান প্রদান অসম্ভব ছিল । ভারতবাসী একটি জাতি হয়েও বিভিন্ন ভাষাভাষী গোষ্ঠী নিজ নিজ অঞ্চলের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল । ফলে সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সমন্বয়ী ভাবধারার প্রসার রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল ।  

কিন্তু ইংরেজি শিক্ষালাভ করার ফলে এই সীমাবদ্ধতা কেটে যায় । এমনকি বিদেশের ভাব ভাবনাও আমাদের গোচরীভূত হতে থাকে । ফলে এক বিশ্ব সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব হয় । এইভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন ও প্রসার ভারতবাসীর সামাজিক , ধর্মীয় , রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে বয়ে আনে নবজীবনের ফল্গুধারা ।

error: Content is protected !!