লর্ড ডালহৌসির সংস্কার

লর্ড ডালহৌসির সংস্কার 

লর্ড ডালহৌসী ছিলেন গোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী শাসক । যে কোনো উপায়ে এদেশে ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা করাই ছিল তার ব্রত । সাম্রাজ্য বাড়াতে গিয়ে তিনি ন্যায়নীতির তোয়াক্কা করতেন না । নীতিহীন রাজনীতি দ্বারা তিনি ভারতের বহু অঞ্চলকে কোম্পানির সাম্রাজ্যভুক্ত করতে পেরেছিলেন । কিন্তু কেবল আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নয় , সংস্কারক হিসেবেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন । 

পাঞ্জাবের পুনর্গঠন 

নববিজিত পাঞ্জাবের পুনর্গঠনে ডালহৌসীর শাসন প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় । পাঞ্জাবের উন্নয়নের জন্য তিনি পাঞ্জাবের শাসনভার তিনজন কমিশনার নিয়ে গঠিত একটি বোর্ডের উপর ন্যস্ত করেন । হেনরি লরেন্স ছিলেন এই বোর্ডের সভাপতি । লরেন্সের পরিচালনায় পাঞ্জাবের শাসন ব্যবস্থা এত বেশি প্রশংসা অর্জন করে যে , কোম্পানির কর্মচারীদের কাজ শিখতে পাঞ্জাবে আনা হত । পাঞ্জাবের কৃষি , শিল্প , রাজস্ব ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও উন্নতি সাধিত হয় ।  

জায়গির প্রথা বাতিল করা হয় এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য ‘ রায়তওয়ারি ‘ বন্দোবস্ত প্রথা চালু করা হয় । অভ্যন্তরীণ শুল্ক তুলে দেওয়া হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি বিধান করা হয় । পাঞ্জাবে তিনি সরকারের সাথে সরাসরি জনগণের যোগাযোগ স্থাপন করেন । লরেন্সের নেতৃত্বে এবং ডালহৌসীর উদ্যোগে পাঞ্জাব দ্রুত আধুনিকতার পথে ধাবিত হয় । অল্প সময়ের মধ্যেই পাঞ্জাব ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হয় । এইজন্য কেউ কেউ ডালহৌসীকে “ আধুনিক পাঞ্জাবের জনক ” বলে অভিহিত করেছেন । 

লর্ড ডালহৌসির শাসন সংস্কার   

১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে চার্টার আইন অনুযায়ী ডালহৌসী বাংলার শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একজন ‘ লেফটেন্যান্ট গভর্নর ‘ বা ছোট লাট নিয়োগ করেন । ডালহৌসী কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে আইন সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাদেশিক সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের অধিকার প্রদান করেন । 

সিভিল সার্ভিস 

শাসন সংস্কারের ক্ষেত্রে ডালহৌসীর বিশেষ কৃতিত্ব হল ভারতীয় প্রশাসনে ‘ সিভিল সার্ভিস ’ প্রথার কার্যকরী প্রবর্তন । ইতিপূর্বে কোম্পানির কর্মচারীদের মনোনীত করা হত । এই ব্যবস্থায় যেমন স্বজনপোষণের সম্ভাবনা ছিল , তেমনি এতে অযোগ্য লোকদের হাতে শাসন দায়িত্ব চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল । ডালহৌসীর আমল থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগের নীতি গৃহীত হয় । ফলে অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা শাসনের দায়িত্ব পান ।  

লর্ড ডালহৌসির শিক্ষা সংস্কার 

এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও ডালহৌসীর অবদান উল্লেখযোগ্য । ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতের শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনামা প্রকাশ করেন । এতে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষা সংস্কারের কথা বলা হয় । এই নির্দেশনামা অনুযায়ী ডালহৌসী ভারতে শিক্ষা বিস্তার শুরু করেন । তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় , মাধ্যমিক বিদ্যালয় , মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় । শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তত্ত্বাবধানের জন্য প্রতিটি প্রেসিডেন্সীতে একজন করে ‘ শিক্ষা অধিকর্তা ’ ( Director of Public Instruction ) নিযুক্ত হন । ডালহৌসীর আমলেই কলকাতা , বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় । 

ডাক ও তার ব্যবস্থার প্রচলন 

ডালহৌসীর উদ্যোগে ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছিল । ডাক , তার ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি অক্ষয় হয়ে আছে । ডাকে খুব কম খরচে চিঠিপত্র প্রেরণের বন্দোবস্তু করে দিয়ে তিনি আমাদের ভাবের আদান প্রদানকে সহজসাধ্য করে দেন । যোগাযোগের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হল টেলিগ্রাফ । ডালহৌসী বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ লাইনের দ্বারা কলকাতার সাথে পেশোয়ার , বোম্বাই ও মাদ্রাজকে যুক্ত করেন । 

রেলপথ নির্মাণ 

রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে ডালহৌসী নীরব বিপ্লব সম্পন্ন করেছিলেন । তিনি সারা ভারতবর্ষকে রেলপথ দ্বারা যুক্ত করার পরিকল্পনা করেন । ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই থেকে থানের মধ্যে প্রথম রেলপথ নির্মিত হয় । পরবৎসর কলকাতার সাথে কয়লা খনি প্রধান রানীগঞ্জ অঞ্চলের মধ্যে রেল যোগাযোগ সম্পন্ন হয় । ১৮৫৬ -এর মধ্যে কয়েক হাজার মাইল রেলপথ নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় । 

লর্ড ডালহৌসির অন্যান্য সংস্কার 

ডালহৌসীর অপরাপর জনহিতকর কার্যাবলির মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হল , যথা— 

( ১ ) তিনি পূর্ত বিভাগ ( P. W.D ) গঠন করে এই দপ্তরের উপর রাস্তাঘাট , পুল পর্যন্ত নির্মিত গ্র্যান্ড ইত্যাদি নির্মাণের দায়িত্ব দেন । 

( ২ ) কলকাতা থেকে পেশোয়ার ট্রাঙ্ক রোড এর নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ করেন । 

( ৩ ) ভারতীয় বন্দরগুলির উন্নতি সাধন করেন এবং বহু নতুন খাল খনন করেন । এগুলির দ্বারা কৃষিজমিতে জলসেচ ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ সম্ভব হয় । 

( ৪ ) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবৃদ্ধির জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয় । 

( ৫ ) ধর্মান্তর গ্রহণের অপরাধে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রথা নিষিদ্ধ করেন এবং হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন প্রবর্তন করেন । তবে সাম্রাজ্যবাদী লর্ড ডালহৌসীর লক্ষ্য সংকীর্ণ হলেও , বাস্তবে তা ভারত ও ভারতবাসীর উন্নতির সহায়ক হয়েছিল । তাঁর সংস্কারের ফলে পাঞ্জাবের সর্বাত্মক উন্নতি সম্ভব হয় । যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রেলপথের প্রবর্তন নিঃসন্দেহে বিপ্লবের সমতূল্য ছিল ।

মূল্যায়ন 

ডালহৌসীর সংস্কারের মধ্যে জনহিতকর আদর্শ ছিল না । তার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে দৃঢ় ভিত্তি দেওয়া । অবশ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে ভারত বা ভারতবাসীর মঙ্গল বিধানের পরিবর্তে কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষা করাই ছিল ডালহৌসীর প্রধান উদ্দেশ্য । রেলপথ নির্মাণের নামে এদেশের কোটি কোটি টাকা ইংল্যান্ডে প্রেরিত হয়েছিল । এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত সৈন্যপ্রেরণের কাজেও রেলপথ ইংরেজদের প্রভূত সাহায্য করেছিল । টেলিগ্রাফ ব্যবস্থাও একইভাবে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল ।  

হান্টারের ( Hunter ) ভাষায় “ রেলপথ আর টেলিগ্রাফ দিয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনের দিক দিয়ে ভারতবর্ষকে বেঁধে রাখা সম্ভব হয়েছে । ” সিপাহি বিদ্রোহে যোগদানের অপরাধে শাস্তি প্রাপ্ত জনৈক সিপাহি ফাঁসির অব্যবহিত পূর্বে টেলিগ্রাফের তার দেখিয়ে বলেছিল “ ওই অভিশপ্ত দড়ি আমাদের গলার ফাঁস হয়েছে ” ( “ It is that accused string that telegraph , that strangled us . ” ) 

error: Content is protected !!