১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য 

সামগ্রিকভাবে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ একটি বহু বিতর্কিত বিষয় । কারও মতে , এটি কেবলমাত্র সিপাহিদের বিদ্রোহ ( Mutiny ) ; আবার কারও মতে , এটি ভারতের প্রথম ‘ স্বাধীনতার যুদ্ধ ’ আবার কারও মতে , এটি ছিল সমস্ত শ্রেণির ভারতবাসীর ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ । অবশ্য বিপ্লবের প্রকৃতি সম্পর্কে তীব্র মতভেদ থাকলেও এর কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রায় সবাই একমত হয়েছেন ।

অসংগঠিত আন্দোলন 

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ কোনো সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান ছিল না । এমন কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি যার ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে , এই বিদ্রোহ পূর্ব পরিকল্পিত ছিল । পূর্ব পরিকল্পিত হলে কিছু-না-কিছু সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হত । অবশ্য আক্ষরিক অর্থে পরিকল্পিত না হলেও বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনোরকম সমঝোতা ছিল না , একথাও বলা যায় না । কারণ বিদ্রোহের আগে বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে চাপাটি ও রক্তপদ্ম বিলি করা হয়েছিল । ভবঘুরে সন্ন্যাসী , ফকির ও মাদারীগণ বিদ্রোহের সপক্ষে প্রচারে নেমেছিলেন ।

সাম্প্রদায়িক ঐক্য 

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল হিন্দু মুসলমান ঐক্য । সমস্ত স্তরের হিন্দু মুসলমান হাতে হাত ধরে এই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন । এই হিন্দু মুসলমান সৌভ্রাতৃত্ব ছিল অভূতপূর্ব । প্রতিটি বিদ্রোহী মুসলমান বাহাদুর শাহকে ‘ সম্রাট ‘ বলে মেনে নিয়েছিল । মিরাটে হিন্দু সিপাহিরা অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরেই দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়েছিল । তাদের লক্ষ্য ছিল দিল্লির বাহাদুর শাহকে স্বমর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা । বিদ্রোহ চলাকালে দুই ধর্ম পরস্পরের প্রতি যথেষ্ট সহনশীলতার পরিচয় রেখেছিল ।  

হিন্দুরা ছিল গোহত্যা বিরোধী । তাই কোনো একটি অঞ্চল ইংরেজ কতৃত্ব মুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গোহত্যা নিষেধ করা হয়েছিল এবং এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল মুসলমান বিদ্রোহীরা । ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই হিন্দু-মুসলিম ঐক্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । এই ঐক্য যে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়েছিল , তা পরবর্তীকালে অ্যাচিসন ( Aitchison ) নামক জনৈক ইংরেজ কর্মচারীর বিবৃতি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তিনি দুঃখ করে লিখেছিলেন , “ এই একটা ক্ষেত্র , যেখানে আমরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লেলিয়ে দিতে পারিনি । ”  

বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদাসীনতা 

শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণি এই বিদ্রোহে তেমনভাবে লিপ্ত ছিল না । প্রথম থেকেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতশ্রেণি ১৮৫৭ – র বিদ্রোহের প্রতি নির্লিপ্ত মনোভাব পোষণ করেছিল । এর প্রধান কারণ ছিল বিদ্রোহীরা ইংরেজ প্রবর্তিত সমাজ সংস্কারমূলক আইনকানুনের প্রতিবাদ করছিল । তারা সরকারের প্রগতিমূলক সংস্কারগুলিকে ভারতবাসীর অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করছিল ।  

কিন্তু শিক্ষিত সম্প্রদায় এর বিরুদ্ধ মত পোষণ করত । তাদের ধারণ হয়েছিল যে , বিদ্রোহের একমাত্র লক্ষ্য হল পূর্বতন ব্যবস্থা ( old regime ) ফিরিয়ে আনা । শিক্ষিতশ্রেণি কুসংস্কার মুক্ত সমাজ কামনা করছিল । তাদের বিশ্বাস ছিল , ব্রিটিশ শাসন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম । কিন্তু বিপ্লবের নেতারা অধিকাংশই ছিলেন সামন্তশ্রেণিভুক্ত ।  

সামন্ত ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন দেশের অগ্রগতি রুদ্ধ করবে — এই ধারণার ফলে শিক্ষিতশ্রেণি এই বিদ্রোহে নির্লিপ্ত ছিল । তা ছাড়া এই বিপ্লব থেকে শিক্ষিতশ্রেণি বুঝেছিল যে , পরাধীনতার মূল কারণ হল আমাদের অশিক্ষা , কুশিক্ষা এবং তজ্জনিত অন্ধবিশ্বাস , অর্থহীন আচার সর্বস্ব জীবনযাত্রা ইত্যাদি । অবশ্য এই শিক্ষিতশ্রেণি যে ব্রিটিশের অন্ধ সমর্থক ছিল , তা-ও নয় । কারণ বিদ্রোহের অব্যবহিত পরে এই শ্রেণির কাছ থেকে প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল ।

error: Content is protected !!