১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

বিরাট সম্ভাবনার সৃষ্টি করেও ১৮৫৭ -র মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল । মে মাসে সূচিত হয়ে সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লির পতনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের মুখ্য পটভূমিই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল । ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকেই বিদ্রোহের অধিকাংশ নেতা হয় বন্দি হয়েছিলেন , নতুবা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন । অবশ্য পলায়মান অবস্থাতেই কারও কারও মৃত্যু ঘটেছিল । বিদ্রোহের এই ব্যর্থতা ও পতনের জন্য অনেকগুলি কারণ নির্দিষ্ট করা যায় । 

আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা 

আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা প্রথম থেকেই বিদ্রোহকে পঙ্গু করে দিয়েছিল । কিছু কিছু অঞ্চলে বিদ্রোেহ যথেষ্ট প্রকট হলেও , সমগ্র ভারতে এর ব্যাপকতা ছিল না । বিদ্রোহী কার্যকলাপ মূলত উত্তর ভারত , রোহিলাখণ্ড , অযোধ্যা ও পশ্চিম বিহারে সীমাবদ্ধ ছিল । পাঞ্জাব , সিন্ধুদেশ , রাজপুতনা , বাংলা , নেপাল প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহের কোনো প্রভাব ছিল না । 

সংহতির অভাব 

বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রচণ্ড সংহতির অভাব ছিল । দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহ জেগে উঠলেও , বিভিন্ন স্থানের বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না । এই সংহতি-হীনতা একদিকে যেমন বিদ্রোহীদের দুর্বল করেছিল , অন্যদিকে তেমনি ইংরেজের সুবিধার সৃষ্টি করেছিল । একযোগে বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দিলে তা দম করা সহজসাধ্য হত না । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় , পাটনা শহরে ওয়াহাবিদের আন্দোলনের সঙ্গে গয়া ও শাহাবাদে কুমার সিংহের অভ্যুত্থানের কোনো যোগ ছিল না । তা থাকলে ইংরেজদের পক্ষে কলিকাতা থেকে উত্তর ভারতে দ্রুত সৈন্য ও রসদ পাঠানো সম্ভব হত না । 

নেতৃত্বের স্বার্থ দ্বন্দ্ব 

বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দের মধ্যে একতার যথেষ্ট অভাব ছিল । এঁরা আঞ্চলিক স্বার্থ ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে পারেননি । কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এঁরা বিদ্রোহী হননি । এঁদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন এবং বহুলাংশে পরস্পর বিরোধী । যেমন বাহাদুর শাহের মুঘল কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে নানা সাহেবের পেশোয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্যে সংঘাত ছিল অনিবার্য । নেতারা পরস্পরকে শুধু সন্দেহই করতেন না , এঁরা নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতী কলহেও লিপ্ত হয়েছিলেন । যেমন , অযোধ্যার বেগম এবং মৌলবি আহমদুল্লার মধ্যে কলহ ।  

ভিন্‌সেন্ট স্মিথ -এর মতে , “ হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ , মারাঠা পেশোয়া এবং মুঘল সম্রাটের রাজনৈতিক বিরোধী এবং অসংখ্য স্বার্থ সংঘাত বিদ্রোহীদের এতটাই বিচ্ছিন্ন রেখেছিল যে , তারা কখনোই যৌথভাবে সুপরিকল্পিত উপায়ে কোনো কাজ সম্পাদন করতে পারেনি ” । এইভাবে নেতাদের গোষ্ঠীতান্ত্রিক মনোবৃত্তি , আঞ্চলিক স্বার্থপরতা বিদ্রোহের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে তুলেছিল । 

দেশীয় রাজাদের বিরোধিতা 

ব্রিটিশ কূটনীতির সাফল্য বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল । কূটনৈতিক চাতুর্য দ্বারা ইংরেজগণ অধিকাংশ ভারতীয় রাজন্য ও জাতিকে বিদ্রোহ বিমুখ ও বিরোধী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল । ঝাঁসীর রানি , অযোধ্যার বেগম এবং অন্যান্য কয়েকজন ক্ষুদ্র নৃপতি ছাড়া কেউই এই বিদ্রোহে যোগদান করেননি । শিখ , মারাঠা প্রভৃতি জাতির সাথে খারাপ ব্যবহার করা সত্ত্বেও ইংরেজগণ তাদের সপক্ষে রাখতে সক্ষম হয়েছিল । শিখ , গোর্খা , রাজপুত প্রভৃতি যুদ্ধকুশলী জাতি বিদ্রোহ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল ।  

লর্ড ক্যানিং স্বীকার করেছেন , “ সিন্ধিয়া যদি বিদ্রোহী পক্ষে যোগ দেন , তাহলে কালই আমাদের ভারত ছেড়ে পালাতে হবে । ‘ জন লরেন্স কাশ্মীরের মহারাজা গুলাব সিং -এর সাহায্য সম্পর্কে বলেছিলেন যে , “ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে আমাদের অবস্থা যে অনেকটা মহারাজার দয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল , তা বললে অত্যুক্তি হবে না । ” আফগানিস্তানের আমির দোস্ত মহম্মদ , মারাঠা নেতা সিন্ধিয়া হোলকার , দিনকর রাও হায়দ্রাবাদের সলার জঙ্গ প্রমুখ ব্যক্তি এবং শিখ , গোর্খা , রাজপুত প্রভৃতি জাতি অসীম আত্মত্যাগ দ্বারা ইংরেজের সেবা করে বিদ্রোহ দমন করেছিল । এই গোষ্ঠীর সহায়তা পেলে বিদ্রোহ অনেক দৃপ্ত হতে পারত । 

অর্থ ও অস্ত্রের অভাব

বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্রের অপ্রতুলতা এর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল । দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য আবশ্যিক ছিল অর্থের প্রাচুর্য ও নিশ্চয়তা । কিন্তু বিদ্রোহীদের অর্থাগমের কোনো নির্দিষ্ট ও যুক্তিগ্রাহ্য পথ ছিল না । অধিকাংশ সচ্ছল রাজন্য বিদ্রোহ বিমুখ হবার ফলে অর্থাগমের পথ সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল । তা ছাড়া বিদ্রোহীদের লড়াই করতে হয়েছিল আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর সাথে । এদের হাতে ছিল বহু আধুনিক মারণাস্ত্র ।  

কিন্তু সিপাহিদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল সাধারণ দেশি বন্দুক , বর্শা ইত্যাদি স্বল্প কার্যকারী অস্ত্র নিয়ে । এই অসম যুদ্ধে সিপাহিদের ব্যর্থতা ছিল অবশ্যম্ভাবী । সিপাহিদের সাহস ও শৌর্যের অভাব ছিল না — অভাব ছিল শৃঙ্খলার । এরা সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে নয় , বরং একটা ‘ স্বতঃস্ফূর্ত হাঙ্গামাকারী জনতা ‘ রূপে লড়াইয়ে নেমেছিল ।  

ইতিবাচক লক্ষ্যের অভাব

বিদ্রোহীদের কোনো ইতিবাচক লক্ষ্য ছিল না । ক্ষমতা দখলের পরবর্তী কোনো সৃজনমুখী পরিকল্পনাই তাদের ছিল না । ড. মজুরদারের মতে , “ বিদ্রোহের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ছিল পরিকল্পনার অভাব । যার ফলে এটি শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল ”। একমাত্র ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বিদ্বেষই ছিল এই আন্দোলনের মূলধন । তাই নানা ক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা জমিদার , মহাজন ইত্যাদির প্রতি নৃশংস আচরণ করে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহের প্রতি বিরূপ করে তুলেছিল । 

শিক্ষিত শ্রেণির বিরূপতা 

শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ১৮৫৭ -র বিদ্রোহকে শৃঙ্খলাভঙ্গের নিদর্শন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্ররোচনা মাত্র বলে মনে করতেন । তাই শিক্ষিত শ্রেণি মহাবিদ্রোহ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখেন । ফলে বিদ্রোহের গভীরতা নষ্ট হয় । 

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব

বিদ্রোহীরা কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সন্ধান পায়নি । নানা সাহেব , লক্ষ্মীবাঈ , কুনওয়ার সিং প্রমুখ আঞ্চলিক নেতা হিসেবে দক্ষ ছিলেন ঠিকই , কিন্তু কোনো কেন্দ্রীয় আন্দোলন পরিচালনার মতো দক্ষতা বা যোগ্যতা এদের কারোরই ছিল না । এটি বিদ্রোহকে দানা বাঁধতে দেয়নি । 

মুসলমানদের একাংশর উদাসীনতা 

হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত শক্তিই ভারতের প্রকৃত শক্তি । কিন্তু ১৮৫৭ -র আন্দোলনে হিন্দু বা মুসলমান কোনো গোষ্ঠীই পূর্ণশক্তি নিয়ে যোগদান করেনি । বহু মুসলমান , বিশেষত সাধারণ মুসলমানগণ এই আন্দোলন সম্পর্কে উদাসীন ছিল ।  

ইংরেজদের রণনৈপুণ্য 

ইংরেজ সেনাপতিদের দক্ষতা ও রণনৈপুণ্য তাদের মূলধন বিশেষ ছিল । আউট্রাম , হ্যাভলক , লরেন্স প্রমুখ সেনাপতি বিদ্রোহী নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ ও কুশলী ছিলেন । স্বভাবতই বিদ্রোহীরা এদের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি ।

error: Content is protected !!