১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের কারণ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের কারণ 

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে যে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল , তার প্রধান ব্যক্তিরা ছিল ভারতীয় সিপাহিগণ । তাই অনেকে এই বিদ্রোহকে ‘ সিপাহি বিদ্রোহ ’ বলে অভিহিত করেছেন । কিন্তু এই বিদ্রোহ কেবলমাত্র সিপাহিদের দ্বারা পরিচালিত বা সিপাহিদের ক্ষোভ থেকে উদ্ভূত হয়নি । এর পেছনে ছিল বহুজনের বহুদিনের পুঞ্জীভূত একাধিক অসন্তোষ ।  

ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তাই বলেছেন , “ ভারতের সমস্ত শ্রেণির মানুষই ইংরেজের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল । সুতরাং সব শ্রেণির মানুষের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়াই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা । ” এককথায় বলা যেতে পারে , রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ , অর্থনৈতিক শোষণ , সামাজিক বৈষম্য ও অবিশ্বাস এবং ধর্মনৈতিক ভীতি থেকেই এই মহাবিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত হয়েছিল । 

মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ 

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজকে পরাজিত করে এদেশে শুরু হয় ইংরেজের রাজনৈতিক জয়যাত্রা । ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ – এই একশত বছরে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হল ব্রিটিশের ক্ষমতা দখল । আলোচ্য সময়ে ইংরেজগণ কখনো বা যুদ্ধ দ্বারা , কখনো বা অধনীতামূলক মিত্রতা নামক অদ্ভুত নীতি দ্বারা , কখনো বা কুশাসনের অজুহাতে একটি একটি করে ভারতের স্বাধীন রাজ্যগুলিকে গ্রাস করতে থাকে ।  

সেই সঙ্গে জারি করে নানা রকমের স্বৈরতান্ত্রিক আইন , যা শুষে নিতে থাকে ভারতবাসীর রাজনৈতিক অধিকারের শেষ তলানিটুকু । এইভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের নির্লজ্জতম বহিঃপ্রকাশ ঘটল লর্ড ডালহৌসীর রাজত্বকালে । তিনি ‘ স্বত্ববিলোপ আইন ’ জারি করে কেড়ে নিলেন ভারতীয় রাজন্যবর্গের ‘ দত্তকপুত্র ’ গ্রহণের মানবিক অধিকারটুকু ।  

এই কুখ্যাত আইনের ফাদে বাঁধা পড়ল সাতারা , নাগপুর , সম্বলপুর , ঝাসী প্রভৃতি রাজ্য । বন্ধ হল পেশোয়া দ্বিতীয় বাজারীও -এর দত্তকপুত্র নানা সাহেবের ভাতা । ক্ষুব্ধ , অপমানিত ঝাসির রানী এবং নানা সাহেব প্রত্যক্ষভাবে মদত দিলেন বিদ্রোহীদের । 

অমানবিক আচরণ :- শুধু রাজ্যগ্রাস নয় , রাজ্য দখল করতে গিয়েও ডালহৌসীর অনুচররা দেখালো চরম অমানবিকতা । নাগপুর ও অযোধ্যায় আইন প্রয়োগ করার নামে কোম্পানির কর্মচারীরা নির্বিচারে লুণ্ঠন করল প্রাসাদের ধন সম্পদ , রাস্তার ধুলোয় টেনে নামিয়ে দিল প্রাসাদের আসবাবপত্রাদি । ঐতিহাসিক জন কে. -এর মতে , নাগপুর প্রাসাদ লুণ্ঠন কেবলমাত্র বেরারের অধিবাসী নয় — পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলিতেও ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল । রাজপ্রসাদ অধিগ্রহণের থেকে তা লুণ্ঠনের নমুনা ছিল বেশি ক্ষোভের কারণ । অথচ এইসব রাজপরিবার ছিল ব্রিটিশের একান্ত অনুগত । 

এই নিরাপত্তার অভাববোধ ভারতের রাজন্যবর্গকে ব্রিটিশ বিরোধী জোটে আবদ্ধ হতে উৎসাহিত করল । দেশীয় রাজ্যগুলি ইংরেজের অধিকারে যাওয়ার ফলে কেবল রাজপরিবার নয় , ক্ষতিগ্রস্ত হল আরও শত শত পরিবার । এরা রাজপ্রাসাদের কর্মী রূপে জীবনযাপন করত । আশ্রয় চ্যুত , জীবিকা চ্যুত এইসব পরিবারের সদস্যরাও আন্তরিকভাবে ঝাপিয়ে পড়ল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে । সর্বোপরি ইংরেজ কর্মচারীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার , অশ্লীল সম্বোধন প্রভৃতিও এদেশের মানুষকে বিপ্লবমুখী করে তুলেছিল । 

মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ 

১৮৫৭ -র মহাবিদ্রোহের সবচেয়ে বড়ো কারণ ছিল ইংরেজের অর্থনৈতিক শোষণ । পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই কোম্পানির আর্থিক নীতি ছিল ভারতের সম্পদ শোষণ করে ইংল্যান্ডকে সম্পদশালী করে তোলা । তাদের নীতির অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের শিল্প বাণিজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল । এর ফলে কেবল শ্রমিক-কারিগর শ্রেণিই নয় , জমিদার ও বহু অভিজাত রাজাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন । ইংরেজের ভুমি রাজস্ব ব্যবস্থা , আইনবিধি ও শাসন পদ্ধতি কঠোরতাও বহু মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল । পুলিশ ও প্রশাসন ছিল বিভীষিকার বস্তু ।  

চড়া রাজস্ব :- ইংরেজের ভূমিনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থা ছোটো ছোটো চাষি , রায়তদার ও সৎ জমিদারদের দুর্দশা বয়ে এনেছিল । নতুন ব্যবস্থার ফলে সৎ জমিদারশ্রেণি জমিদারচ্যুত হয়ে যান । চাষি রায়তদের নিরাপত্তা পৌঁছায় শূন্যের অঙ্কে । যারা জমি পায় , দু-এক বছরের মধ্যেই অতিরিক্ত রাজস্বের চাপে তাদের নাভিশ্বাস ওঠে । অধিকাংশ জমিদারি চলে আসে ইংরেজের পদলেহী একদল শোষক মহাজনের হাতে । পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় এরা সাধারণ কৃষকের উপর অত্যাচার ও শোষণের স্টিম রোলার চালিয়ে দেয় । কৃষক-প্রজা ও জমিদারদের শোষণ করে অতি দ্রুত বড়োলোক হওয়া সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় । 

মহাজনদের প্রতাপ :- কোম্পানির একশত বছরের শাসনে সুদখোর মহাজন এবং নীলকর সাহেবদের অত্যাচার সহ্যের শেষ সীমায় এসে পড়েছিল । সাধারণ কৃষকেরা অতিরিক্ত রাজস্বের চাপে অত্যন্ত চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হত । একদিকে জমিদারের রাজস্ব , অন্যদিকে মহাজনের সুদ প্রদান করার পর চাষিদের নিজেদের জন্য কিছুই থাকত না । আবার নীলকর সাহেবরা জোর করে চাষিদের অলাভজনক নীলচাষে বাধ্য করত । অন্যথা করলে চাষিদের ধরে নিয়ে গিয়ে কুঠিবাড়িতে আটকে রাখত । চলত শারীরিক নির্যাতন । এই ব্যবস্থা তাদের প্রচণ্ডভাবে ব্রিটিশ বিরোধী করে তুলেছিল । 

অযোধ্যার দুর্দশা :- অযোধ্যা প্রদেশকে ব্রিটিশ শাসনভুক্ত করার একটি বড়ো যুক্তি ছিল যে , এই স্থানের জনগণকে নবাব তালুকদারদের উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করা হবে । কিন্তু বাস্তবে ব্রিটিশ শাসনাধীনে এসেই অযোধ্যাবাসীর দুর্দশা চরমে পৌঁছেছিল । ভূমি রাজস্বের হার বৃদ্ধি করা হয়েছিল । খাদ্যদ্রব্য , ঘরবাড়ি , খেয়াঘাট প্রভৃতি ক্ষেত্রে ধার্য হয়েছিল নতুন কর ।  

অযোধ্যাই ছিল ইংরেজের ‘ বেঙ্গল আর্মি ’ -র প্রধান সিপাহি নিয়োগ কেন্দ্র । এখানে বহু সিপাহির দেবোত্তর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল । বিদ্রোহের অব্যবহিত আগে কোম্পানির রাজস্ব নীতির প্রতিবাদ জানায় প্রায় ৭৫ হাজার সিপাহি ১৪ হাজার আবেনদপত্র পেশ করেছিল । অযোধ্যা নবাবের হস্তচ্যুত হবার ফলে কয়েক হাজার রাজকর্মচারী ও সৈনিক বৃত্তিচ্যুত হয়েছিল । এদের উপর নির্ভরশীল বিশাল সংখ্যক নারী পুরুষের জীবন হয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত ।  

এর প্রভাব গিয়ে পড়েছিল দেশের কৃষি ব্যবস্থা ও কুটির শিল্পের উপর । শুধু তাই নয় , ইংরেজের নীতির ফলে রাজপরিবারের লোকেদেরও চরম অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছিল । জন কে লিখেছেন : “ সামান্য খাদ্যসংগ্রহের জন্য অসূর্যস্পশ্য ৷ নারীদেরও রাতের অন্ধকারে অপরের দ্বারে ভিক্ষাপাত্র হাতে দাঁড়াতে হত । ” এই শোষণ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শামিল করেছিল । 

মহাবিদ্রোহের সামাজিক কারণ

সামাজিক অসন্তোষ ও বিভেদ মহাবিদ্রোহের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল । ইংরেজের এদেশে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ধনার্জন । তাই ভারতবর্ষ বা ভারতবাসীর প্রতি তাদের কণামাত্র সহানুভূতি ছিল না । সামাজিক ক্ষেত্রে শাসক ইংরেজ এবং শাসিত ভারতবাসীর মধ্যে এক দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিল । এরা ভারতীয়দের মনোরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেনি বা নিজেদের মনের দরজা এদেশবাসীর কাছে খুলে দেয়নি । ফলে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনোরূপ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি । ভারতীয়দের প্রতি এদের ব্যবহার ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ঘৃণাসূচক । 

ইংরেজরা ইচ্ছাপূর্বক ভারতবাসীর সংস্পর্শ বর্জন করে চলত । কেবল সাধারণ মানুষ নয় , অভিজাত ভারতবাসীকেও এরা ঘৃণার চক্ষে দেখত । ইংরেজগণ নিজেদের ভারতবাসীর থেকে শ্রেষ্ঠতর জাতি বলে মনে করত । প

ভারতবাসীও বুঝতে পেরেছিল যে , ইংরেজ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে । তাই ইংরেজ কর্তৃক গৃহীত প্রতিটি নীতি বা পরিবর্তনকে ভারতবাসী সন্দেহ করত । অবশ্য ভারতবাসীর এই ইংরেজ বিদ্বেষ খুব চাপা ছিল । 

ভারতবাসীর হতাশা :- ইংরেজ শাসনের গোড়ায় শাসন ব্যস্থার উঁচু পদগুলিতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ভারতবাসীর প্রাধান্য ছিল । কিন্তু ইংরেজ শাসন কায়েম হবার পর ওইসব পদ ভারতবাসীর হাতছাড়া হয়ে যায় । ফলে এইসব মানুষ জীবিকাচ্যুত হয়ে পড়ে । এই কারণে তাদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয় ।  

আবার দেশীয় রাজা বা নবাবেরা কবি , সাহিত্যিক , শিল্পী , ধর্মপ্রচারক প্রমুখের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । এঁদের আর্থিক সাহায্যের উপর নির্ভর করে দেশে সাহিত্য ও সুকুমার কলার চর্চা হত । কিন্তু দেশীয় রাজ্যগুলির অবলুপ্তি ঘটলে এইসব মানুষও পেশাচ্যুত হয়ে পড়েন । এঁরা বুঝতে পারেন যে , ব্রিটিশ শাসনে এঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত । তাই এই শ্রেণির মানুষেরাও ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে মদত জোগান ।  

মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ

১৮৫৭ -র বিদ্রোহে প্রধান ভূমিকা ছিল ভারতীয় সিপাহিদের । নানা কারণে সিপাহিরা ইংরেজ শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিল । 

( ১ ) ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ভারতীয় সিপাহীদের আত্মত্যাগের দ্বারা , কিন্তু সেই সিপাহিরা ছিল সর্বাধিক বঞ্চিত । অযোধ্যা রাজ্য থেকে সর্বাধিক সংখ্যক সিপাহি সংগৃহীত হত । সেই অযোধ্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হলে সিপাহিরা প্রচণ্ড ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে ওঠে । কারণ তখন তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত না হলেও আঞ্চলিকতাবোধ যথেষ্ট প্রবল ছিল । 

( ২ ) তা ছাড়া , ইংরেজের অর্থনৈতিক শোষণ সাধারণ ভারতবাসীর যে দুঃখ কষ্ট সৃষ্টি করেছিল , তারও প্রভাব পড়েছিল সিপাহিদের উপর । কারণ সিপাহিদের আত্মীয় স্বজনেরাই ইংরেজ শোষণের শিকার হয়েছিল । 

( ৩ ) সেনাবাহিনীর আইনকানুন সিপাহিদের ধর্মাচরণ ও জাতপাতের বিভেদ রক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল । ভারতবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সাগর অতিক্রম করা বা দাড়ি , টিকি ইত্যাদি না রাখতে পারা ধর্ম বিরোধী কাজ । অথচ ইংরেজরা আইন করে ভারতীয় সিপাহিদের এইসব কাজ করতে বাধ্য করেছিল । 

( ৪ ) সিপাহিদের চাকুরির শর্ত সংক্রান্ত ক্ষোভও ছিল বেশ গভীর । ইংরেজ সামরিক কর্মচারীরা ভারতীয় সিপাহিদের ঘৃণার চোখে দেখত । সমসাময়িক জনৈক ইংরেজ লিখেছেন যে , “ এদেশীয় সিপাহি ও ইংরেজ উচ্চ সামরিক কর্মীদের মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব বা সহমর্মিতা বোধ ছিল না । উভয়েই ছিল বিচ্ছিন্ন । সিপাহিদের নিকৃষ্ট জীব হিসাবে গণ্য করা হত । কারণে অকারণে ইংরেজ কর্মচারীরা সিপাহিদের শুয়োর , নিগার ইত্যাদি অশ্লীল ভাষায় সম্বোধন করত । ” 

( ৫ ) বেতন জনিত বৈষম্যও সিপাহিদের ক্ষোভের আরও একটি বড়ো কারণ ছিল । সমযোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজ সৈনিকের তুলনায় ভারতীয় সিপাহির বেতন ছিল কম । সিপাহিদের আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধাও কম ছিল । এদের পদোন্নতির সুযোগ ছিল না বললেই চলে । ত্রিশ বছর কাজ করেও তাদের পদমর্যাদা বাড়ত না । এমনকি তরুণ ইংরেজ কর্মচারীদের উদ্ধত ব্যবহারও তাদের নির্বিবাদে হজম করতে হত ।  

ইংরেজ ঐতিহাসিক হো ( Homes ) লিখেছেন যে , “ একজন সিপাহি হায়দার আলির মতো নৈপুণ্য দেখিয়েও একজন সাধারণ ইংরেজ সৈনিকের সমান মর্যাদা আশা করতে পারত না । ” 

( ৬ ) বিদেশে যুদ্ধ করতে গেলে সিপাহিদের কিছু অতিরিক্ত ভাতা ( বাট্টা ) দেওয়ার রীতি ছিল । কিন্তু বিদ্রোহের অব্যবহিত পূর্বে এক আদেশবলে কোম্পানি এই বাট্টা বন্ধ করে দেন । এতে সিপাহিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে । 

মহাবিদ্রোহের ধর্মীয় কারণ 

মহাবিদ্রোহের পশ্চাতে একটি ধর্মীয় কারণও ছিল । খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকদের ক্রিয়াকলাপ ধর্মপ্রাণ ভারতীয়দের আশঙ্কিত করে তুলেছিল । সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত এই আশঙ্কাকে আরও সুদৃঢ় করে । মিশনারিগণ স্বাধীনভাবে জেলখানা , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , হাসপাতাল প্রভৃতি স্থানে যেতে পারতেন । এঁরা ভারতবাসীর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে প্রলোভিত করতেন । এঁরা খ্রিস্টান ধর্মকে জনপ্রিয় করার জন্য হিন্দু বা ইসলাম সম্বন্ধে নানাপ্রকার কুৎসা রটনা করতেন । হিন্দু ও ইসলামের প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে এঁরা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতেন । ধর্মান্তরিতদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধার কথা ঘোষণা করে সরকারও এই কাজকে মদত দিত ।  

বস্তুত ইংরেজগণ ভারতবাসীর ধর্মনাশ করতে উদ্যত , —এই আশঙ্কার ফলেই ভারতীয়গণ ইংরেজ সরকারের সংস্কারমূলক কাজগুলিকে সরল মনে গ্রহণ করতে পারেনি । সতীদাহ নিবারণ , বিধবা বিবাহ প্রচলন প্রভৃতি আইন ইংরেজ কর্তৃক ভারতবাসীর ধর্মে হস্তক্ষেপের ষড়যন্ত্র বলেই বিবেচিত হয়েছিল । ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও তাদের সেবাইতদের উপর কর আরোপ ভারতবাসীর ধর্মীয় চেতনাতেই আঘাত করেছিল । এই কারণে মুসলমানরা ‘ ওয়াহাবি ’ নামক ধর্মযুদ্ধের ডাক দিয়েছিল । 

মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ

রাজনৈতিক , সামাজিক , অর্থনৈতিক , সামরিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে শোষণ , অত্যাচার , বৈষম্য ও বিভেদজনিত কারণে যখন ভারতবাসীরা ইংরেজ শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ , তখন একটি সামান্য ঘটনা মহাবিদ্রোহের সূচনা করে । তা হল ‘এন্ড ফিল্ড রাইফেল ’ নামক এক নতুন জাতীয় বন্দুকের প্রবর্তন । এই বন্দুকের টোটার ( কার্তুজ ) মুখ চর্বি মাখানো এক ধরনের মোড়ক দ্বারা আবৃত থাকত । মুখ দিয়ে এই মোড়কটি কেটে নিয়ে কার্তুজগুলি বন্দুকে ভরতে হত । সম্ভবত গোরু ও শুকরের চর্বি এই মোড়কে ব্যবহৃত হত । গোরু এবং শূকর যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল ।  

তাই এই কার্তুজের প্রবর্তন ইংরেজ কর্তৃক সিপাহিদের ধর্মনাশের এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত বলে বিবেচিত হয় । সরকারের এই নির্দেশ মানতে সিপাহিরা অস্বীকার করলে উচ্চপদস্থ ইংরেজ সামরিক অফিসাররা সিপাহিদের কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেন । তখন সিপাহিরা একে একে ছাউনি ছেড়ে পথে বেরিয়ে আসে । শুরু হয় ১৮৫৭ – র মহাবিদ্রোহ ।

error: Content is protected !!